
গত বছরের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে নির্বিচারে দমন পীড়ন চালায় শেখ হাসিনা সরকার। এতে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো দাবি ওঠে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়েও। কিন্তু শপথ গ্রহণের সাড়ে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক মতানৈক্য ও কূটনৈতিক চাপে দলটিকে নিষিদ্ধ করতে পারেনি।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে দলের যেসব নেতার বিরুদ্ধে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাংলাদেশের আদালতে বিচার করা হবে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সম্ভাব্য অপরাধের অভিযোগ থাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), হেগ-এ মামলা করার বিষয়টি সরকার বাতিল করেনি। এটি এখনও আলোচনার টেবিলে রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে সীমিতসংখ্যক সংস্কার চায়, তাহলে নির্বাচন এ বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে। আর যদি বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের কোনো কারণ নেই। পাশাপাশি, তিনি জোর দিয়ে বলেন আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কোনো দাবির কারণে ভোট পিছিয়ে দেয়া হবে না।
সম্প্রতি সরকারের একজন উপদেষ্টা দাবি করেন, শিগগিরই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে। সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’-তে পরিণত হয়। দলটি নিষিদ্ধের পুরনো দাবি আবারও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু সরকার ও রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সরকারের দুয়েকজন উপদেষ্টা নিষিদ্ধের পক্ষে কথা বলেছেন। তবে তাদের অনেকে আবার এটি করা সমীচীন হবে না বলেও মন্তব্য করছেন।
এদিকে বৃহত্তম দল বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝেও এ নিয়ে রয়েছে মতানৈক্য। তাদের কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতির মাঠে তারা দেখতে চান না। আবার অনেকে দল নিষিদ্ধ করে দেয়ার পক্ষপাতি নন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি কী অমীমাংসিতই থেকে যাবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় শুধু অপরাধের বিচার নয়, বরং এর সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় জড়িত। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাংস্কৃতিক মূলধন। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের অনেক মহারথী ও মতামত প্রভাবক আওয়ামী লীগের শক্তি। তাই দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া দলটিকে নিষিদ্ধ করলে তা কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আওয়ামী লীগকে স্বল্পমেয়াদি নিষিদ্ধ করলে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে সুষ্ঠু ভোট না হওয়া, জুলাই হত্যাকাণ্ড এবং অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পলায়ন-এ তিনটি কারণে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কতটুকু কমেছে, তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের আচরণ ও বক্তব্যে নিয়ে কোনো অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায় না। যদি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে কোটি মানুষের পরিণতি এর সঙ্গে জড়িত। তাই এ বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত হঠকারিতা নয়, বরং কার্যকর আলোচনা ও চিন্তার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার শিগগিরই পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, প্রথমত এটা অত্যন্ত ইতিবাচক যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও একধরনের ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে। দেশের মানুষ তৎকালীন ক্ষমতাসীন ওই দলের অগণতান্ত্রিক এবং একগুঁয়েমি মনোভাব ও কার্যকলাপ মেনে নিতে পারেনি বলেই গত ৫ আগস্টের আগে ও পরে তাদের মধ্যে দলটি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন ঐকমত্য তৈরি হলে সরকারের জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
এদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে জুলাই আন্দোলনে আহতদের সংগঠন ওয়ারিয়র্স অফ জুলাই। অন্যথায় ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গত ২২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল শেষে এ ঘোষণা দেন সংগঠনটির নেতারা। তারা বলেন, আমাদের পঙ্গুত্বের থেকে বের করে সাধারণ জীবন ফিরিয়ে না দিয়ে ও আমাদের শহিদদের জীবন ফিরিয়ে না দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এ দেশে করতে দেয়া হবে না। এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে সংগঠনের নেতারা বলেন, সতর্ক হয়ে যান, নইলে আরও একটি জুলাই দেখতে হবে। শুধরে যান, নইলে আপনাদের অবস্থাও আওয়ামী লীগের মতোই হবে। তারা বলেন, জুলাই আন্দোলন কেবল নির্বাচনের জন্য হয়নি। মানুষের বাকস্বাধীনতা এবং সমতা, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছে। যা বাংলাদেশ স্বাধীনতার এত বছরেও পায়নি। নেতারা বলেন, আমরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছি আমাদের ভয় দেখাবেন না। খুনি হাসিনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।
আওয়ামী লীগকে এ দেশের জনগণ গত ৫ আগস্টেই নিষিদ্ধ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছর দেশে গুম খুন চালিয়েছে, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। দেশের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। যার ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের মানুষ রাজপথে নেমেছিল। আর আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, অফিসিয়ালি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত গণঅধিকার পরিষদ রাজপথে থাকবে। গণঅধিকার পরিষদ এই দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রতির রাজনীতি করতে চায়। আমরা সমাজে কোনো বিভেদ চাই না। সমাজের সব মতের মানুষ নিয়ে একসঙ্গে সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই। আপনাদের প্রতি আহ্বান তরুণদের এই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিয়ে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেছেন, গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবে। ফেসবুকে নিজের আইডিতে সারজিস আলম লেখেন, লড়াইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের জন্য আমরা প্রস্তুত। গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবে।