পবিত্র রমজানের তৃতীয় দিনে অসহনীয় যানজটের কবলে পড়েছে নগরবাসী। সারাদিন মোটামুটি স্বস্তি থাকলেও ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। এতে বিপাকে পড়েছেন অফিস ফেরত সাধারণ মানুষ। কেউ কেউ ইফতারের আগে ঘরে ফেরা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তবে প্রতি বছর রমজানে রাজধানী ঢাকার ভয়াবহ যানজটের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার কাজে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি থানা ও রিজার্ভ পুলিশকে যুক্ত করা হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতার জন্য মাঠে থাকছে শিক্ষার্থীরাও। এছাড়া, সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে একগুচ্ছ নতুন কৌশল। তবে এসব উদ্যোগের পরও যানজটের অসহনীয় ভোগান্তি নগরবাসীর পিছু ছাড়েনি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বেশ কয়েকটি সড়ক ঘুরে যানজটের এমন চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ি-শ্যামপুল, দয়াগঞ্জমোড়, সায়েদাবাদ-গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা-ফকিরের পুল, নয়াপল্টন-রাজারবাগ, খিলগাও, পল্টন-বিজয়নগর, মালিবাগ-মৌচাক, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট এলাকা, মৎস্য ভবন, শাহবাগ, বাংলামোটর, তেজগাঁও, সাতরাস্তা, বিজয় সরণি সিগন্যাল, রামপুরা, হাতিরঝিল, বাড্ডা, গুলশান, বনানী, নতুন বাজার, কাজী নজরুল ইসলাম সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও, শ্যামলীসহ বিভিন্ন স্থানে যানজট রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও ধীর গতিতে চলছে যানবাহন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বাস পয়েন্টগুলোতে গন্তব্যগামী মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। এককথায় বলতে গেলে রমজানের তৃতীয়দিনে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে! দুপুরের পর থেকে ঢাকার প্রতিটি সড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। যা সামলাতে ট্রাফিক ও থানা পুলিশের পাশাপাশি সহযোগী সবাইকে গলদঘর্ম প্রচেষ্টা চালিয়েও চরমভাবে ব্যর্থ হতে হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক এলাকা ও অফিসপাড়ায় প্রতিদিন বিকাল থেকে শত শত গাড়ি তীব্র যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। কথা হয় রাজধানীর পল্টন থেকে কলেজগেটগামী ওয়েলকাম পরিবহনের যাত্রী মাহবুব এর সঙ্গে। তিনি বলেন, পল্টন থেকে গাড়িতে উঠেছি। আধাঘণ্টা ধরে কেবল হাইকোর্ট পর্যন্ত এসেছি। কতসময় লাগবে কে জানে। ইফতারের আগে পৌঁছাতে পারলেই ভালো। না হলে রাস্তায় ইফতার করতে হবে। সোহানুর বলেন, প্রতিবছরই রোজার সময় যানজট সহ্য করতে হয়। সারা বছরতো থাকেই। অন্যান্য সময় যানজটে যতটানা সমস্যা মনে হয় তার থেকে অনেক বেশি সমস্যা মনে হয় রোজায়। সারাদিন না খেয়ে অফিস করে তারপর যানজটে থাকাটা কষ্টদায়ক। সরকারের উচিত যানজট নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া। সাভারগামী যাত্রী রোমান বলেন, আমিনবাজার পার হতে পারলে আর বেশি সময় লাগবে না। আমিনবাজারের পর আর কোনো জ্যাম নেই। কিন্তু আমিনবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে কত সময় লাগবে সেটা বলা কঠিন। রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ে মোটর সাইকেল চালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, বোনের বাসায় ইফতারসামগ্রী পৌঁছে দিতে মিরপুর যাচ্ছিলেন। কিন্তু রামপুরা থেকে এ পর্যন্ত আসতেই তার দেড় ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। পথে পথে যে ধরনের যানজট তাতে মিরপুর থেকে বাসায় ফিরতে ইফতারির সময় পেরিয়ে যাবে। তাই তিনি মিরপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন। একই সড়কে যানজটে আটকে থাকা সিএনজি অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান জানান, দুপুরের পর থেকে কোনো গন্তব্যেই যাত্রী নিয়ে সময়মতো পৌঁছতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে আধাঘণ্টায় যাওয়া যেত, এখন সেখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগছে। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকলে গাড়ি ভাড়া ও গ্যাস খরচ উঠবে কিনা তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন। নগরজুড়ে অসহনীয় এই যানজটের জন্য পর্যবেক্ষকরা ট্রাফিক পুলিশ ও চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, সড়কে গাড়ি পার্কিং, ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার একাংশ দখল করে হকারদের রাজত্ব ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকে দায়ী করলেও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এজন্য সড়ক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনাকেই দুষছেন। তাদের ভাষ্য, যুগের পর যুগ রমজানে যানজটের ভোগান্তিতে নগরজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলেও তা নিরসনে পরিকল্পিত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রতি বছর রমজানের শুরুতে এলোমেলো কিছু ছক তৈরি করে যানজট নিরসনের চেষ্টা করে জনগণকে উল্টো ভোগান্তিতে ফেলা হয়। যদিও এ সমস্যায় হাল ছাড়তে নারাজ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। তারা বলছে, পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এরই মধ্যে ফুটপাত খালি করাসহ কিছু কার্যক্রম তারা শুরু করেছে। রমজানে সড়কে যাতে ব্যবসায়িক কর্মকান্ড পরিচালিত না হয়, সে জন্য ট্রাফিক বিভাগ কঠোর অবস্থানে থাকবে। নির্ধারিত বাস স্টপেজ ছাড়া গণপরিবহনগুলো যাত্রী ওঠা-নামা করে। এতে পেছনে গাড়ির দীর্ঘ সারি পড়ে। তাই রাস্তায় যাতে গাড়ি না থামে সে জন্য ট্রাফিক বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ডিএমপি এলাকায় ভারী যানবাহন প্রবেশের নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। প্রায়ই এ সময়সীমা না মেনে চালকরা চলার চেষ্টা করে-যা যানজটের সৃষ্টি করে। নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টি মেনে চলতে হবে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কে গাড়ি মেরামতের কাজ করা হয়। জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে রমজানে এ ধরনের কাজ যাতে কেউ না করতে পারে, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে রাজধানীতে যানজটের বড় একটি কারণ যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা অপরিকল্পিত বিপণিবিতানগুলো। বিশেষ করে নিউমার্কেটের মতো বৃহৎ পরিসরের বিপণিবিতানে যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় পুরো নীলক্ষেত থেকে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। মূলত পার্কিং সংকটকে পুঁজি করেই বিপণিবিতানটির আশপাশে নিয়ম ভাঙার এক ধরনের উৎসব চলে। তাই রমজানে রাজধানীতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হলে অবশ্যই অফিস শুরুর ও শেষের সময়গুলোয় তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে মার্কেট মালিক সমিতির সহযোগিতা নিতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই যথাযথ পার্কিংবিহীন বিপণিবিতানগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
ট্রাফিক বিভাগ থেকে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ সময়ে রাজধানীতে দুই পালায় চার হাজারের বেশি ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। রমজানে যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করবে সংশ্লিষ্ট থানার মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স। এছাড়াও সড়কে ট্রাফিকব্যবস্থাপনায় পুলিশকে সহযোগিতার জন্য থাকা শিক্ষার্থীদের ডিউটি দুই পালার পরিবর্তে এক পালায় আনা হয়েছে। আগে ৬০০ শিক্ষার্থী সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই শিফটে পুলিশের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। রমজানে তারা সবাই বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এক শিফটে দায়িত্ব পালন করবেন। কথা হয় ডিএমপির মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এর সঙ্গে। তিনি বলেন, রমজানে দুপুরের পর রাস্তায় গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। বাসায় ফেরার তাড়া থাকে সবার। মানুষ যাতে নিরাপদে ইফতারের আগেই ঘরে ফিরতে পারে, সে জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নানা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দুপুরের পর থেকে ইফতার পর্যন্ত রাস্তায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োজিত থাকবে। কিছু জায়গায় ডাইভারশন দেয়া হবে। রাস্তায় কোনো হকার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসতে দেয়া হবে না। গাড়ি পার্কিং করতে দেয়া হবে না রাস্তায়।
এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, রমজান মাসে নিউমার্কেট-গাউছিয়া এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কেনাকাটা করতে আসবে। সেখানে যথাযথ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই এবং সড়ক বিভাজকে নেই কোনো প্রতিবন্ধক। ফলে, মানুষ ওভারব্রিজে না উঠে হেঁটে রাস্তা পার হয়। এতে গাড়ির গতি কমে যায়। ডিএমপি সদর দফতর থেকে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হবে। যারা গাড়িতে কেনাকাটা করতে আসবেন, তারা যেন রাস্তায় নেমে গাড়ি ছেড়ে দেন- এমন ক্যাম্পেইন করা হবে। বিশেষ করে বিকাল থেকে যেন যানজট তীব্র না হয়, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকব। একইকথা বলেছেন উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার সাঈদ। তিনি বলেন, উত্তরা এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশের সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করবে। বিভিন্ন শপিংমলের কমিটির সঙ্গে কথা হয়েছে। কমিটির লোকজন মার্কেটের সামনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করবে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ারকে একাধিকবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত রোববার প্রথম রোজার দিনে তিনি বলেন, অফিস শেষ করে মানুষ ইফতারের আগে বাসায় পৌঁছাতে চায়। যার ফলে বিকেল ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, আমরা যানজট নিরসনে চেষ্টা করছি। আমাদের এসপি, ডিসি, এডিসি, যুগ্ম কমিশনার সবাই রাস্তায় আছে। আমি নিজেও রাস্তায় আছি। সাধারণ সময়ের তুলনায় সড়কে ট্রাফিক মোতায়েনও বেশি করা হয়েছে। আশা করি, ইফতারের আগেই মানুষ বাসায় ফিরতে পারবেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানিয়েছিলেন, আসন্ন রমজান মাসে ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তা করতে শিক্ষার্থীরাও মাঠে নামবে। রোজার মাসে ঢাকার মানুষ যাতে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারে সেজন্য ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি স্কাউট এবং বিএনসিসির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। তাছাড়া, বর্তমানে ট্রাফিক সহায়তায় থাকা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হবে।
এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়কে গাড়ির চাপ সব সময়ই থাকে। কিন্তু রমজানে স্বল্প সময়ের মধ্যে সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ছুটি হওয়ার কারণে এই চাপ অনেক বেড়ে যায়। মানুষের কাজের প্রয়োজনে রাস্তায় যেতে হয়, তাই প্রথমত আমাদের পলিসির দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। তিনি বলেন, ফুটপাত দখল করে রমজানে ইফতারসামগ্রী বিক্রি বন্ধ করতে হবে। ফুটপাত দখল হয়ে গেলে মানুষ ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে না, সে কারণে রাস্তায় নেমে আসবে এবং যানজট বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
সরেজমিন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ি-শ্যামপুল, দয়াগঞ্জমোড়, সায়েদাবাদ-গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা-ফকিরের পুল, নয়াপল্টন-রাজারবাগ, খিলগাও, পল্টন-বিজয়নগর, মালিবাগ-মৌচাক, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট এলাকা, মৎস্য ভবন, শাহবাগ, বাংলামোটর, তেজগাঁও, সাতরাস্তা, বিজয় সরণি সিগন্যাল, রামপুরা, হাতিরঝিল, বাড্ডা, গুলশান, বনানী, নতুন বাজার, কাজী নজরুল ইসলাম সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও, শ্যামলীসহ বিভিন্ন স্থানে যানজট রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও ধীর গতিতে চলছে যানবাহন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বাস পয়েন্টগুলোতে গন্তব্যগামী মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। এককথায় বলতে গেলে রমজানের তৃতীয়দিনে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে! দুপুরের পর থেকে ঢাকার প্রতিটি সড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। যা সামলাতে ট্রাফিক ও থানা পুলিশের পাশাপাশি সহযোগী সবাইকে গলদঘর্ম প্রচেষ্টা চালিয়েও চরমভাবে ব্যর্থ হতে হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক এলাকা ও অফিসপাড়ায় প্রতিদিন বিকাল থেকে শত শত গাড়ি তীব্র যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। কথা হয় রাজধানীর পল্টন থেকে কলেজগেটগামী ওয়েলকাম পরিবহনের যাত্রী মাহবুব এর সঙ্গে। তিনি বলেন, পল্টন থেকে গাড়িতে উঠেছি। আধাঘণ্টা ধরে কেবল হাইকোর্ট পর্যন্ত এসেছি। কতসময় লাগবে কে জানে। ইফতারের আগে পৌঁছাতে পারলেই ভালো। না হলে রাস্তায় ইফতার করতে হবে। সোহানুর বলেন, প্রতিবছরই রোজার সময় যানজট সহ্য করতে হয়। সারা বছরতো থাকেই। অন্যান্য সময় যানজটে যতটানা সমস্যা মনে হয় তার থেকে অনেক বেশি সমস্যা মনে হয় রোজায়। সারাদিন না খেয়ে অফিস করে তারপর যানজটে থাকাটা কষ্টদায়ক। সরকারের উচিত যানজট নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া। সাভারগামী যাত্রী রোমান বলেন, আমিনবাজার পার হতে পারলে আর বেশি সময় লাগবে না। আমিনবাজারের পর আর কোনো জ্যাম নেই। কিন্তু আমিনবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে কত সময় লাগবে সেটা বলা কঠিন। রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ে মোটর সাইকেল চালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, বোনের বাসায় ইফতারসামগ্রী পৌঁছে দিতে মিরপুর যাচ্ছিলেন। কিন্তু রামপুরা থেকে এ পর্যন্ত আসতেই তার দেড় ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। পথে পথে যে ধরনের যানজট তাতে মিরপুর থেকে বাসায় ফিরতে ইফতারির সময় পেরিয়ে যাবে। তাই তিনি মিরপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন। একই সড়কে যানজটে আটকে থাকা সিএনজি অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান জানান, দুপুরের পর থেকে কোনো গন্তব্যেই যাত্রী নিয়ে সময়মতো পৌঁছতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে আধাঘণ্টায় যাওয়া যেত, এখন সেখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগছে। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকলে গাড়ি ভাড়া ও গ্যাস খরচ উঠবে কিনা তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন। নগরজুড়ে অসহনীয় এই যানজটের জন্য পর্যবেক্ষকরা ট্রাফিক পুলিশ ও চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, সড়কে গাড়ি পার্কিং, ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার একাংশ দখল করে হকারদের রাজত্ব ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকে দায়ী করলেও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এজন্য সড়ক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনাকেই দুষছেন। তাদের ভাষ্য, যুগের পর যুগ রমজানে যানজটের ভোগান্তিতে নগরজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলেও তা নিরসনে পরিকল্পিত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রতি বছর রমজানের শুরুতে এলোমেলো কিছু ছক তৈরি করে যানজট নিরসনের চেষ্টা করে জনগণকে উল্টো ভোগান্তিতে ফেলা হয়। যদিও এ সমস্যায় হাল ছাড়তে নারাজ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। তারা বলছে, পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এরই মধ্যে ফুটপাত খালি করাসহ কিছু কার্যক্রম তারা শুরু করেছে। রমজানে সড়কে যাতে ব্যবসায়িক কর্মকান্ড পরিচালিত না হয়, সে জন্য ট্রাফিক বিভাগ কঠোর অবস্থানে থাকবে। নির্ধারিত বাস স্টপেজ ছাড়া গণপরিবহনগুলো যাত্রী ওঠা-নামা করে। এতে পেছনে গাড়ির দীর্ঘ সারি পড়ে। তাই রাস্তায় যাতে গাড়ি না থামে সে জন্য ট্রাফিক বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ডিএমপি এলাকায় ভারী যানবাহন প্রবেশের নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। প্রায়ই এ সময়সীমা না মেনে চালকরা চলার চেষ্টা করে-যা যানজটের সৃষ্টি করে। নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টি মেনে চলতে হবে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কে গাড়ি মেরামতের কাজ করা হয়। জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে রমজানে এ ধরনের কাজ যাতে কেউ না করতে পারে, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে রাজধানীতে যানজটের বড় একটি কারণ যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা অপরিকল্পিত বিপণিবিতানগুলো। বিশেষ করে নিউমার্কেটের মতো বৃহৎ পরিসরের বিপণিবিতানে যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় পুরো নীলক্ষেত থেকে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। মূলত পার্কিং সংকটকে পুঁজি করেই বিপণিবিতানটির আশপাশে নিয়ম ভাঙার এক ধরনের উৎসব চলে। তাই রমজানে রাজধানীতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হলে অবশ্যই অফিস শুরুর ও শেষের সময়গুলোয় তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে মার্কেট মালিক সমিতির সহযোগিতা নিতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই যথাযথ পার্কিংবিহীন বিপণিবিতানগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
ট্রাফিক বিভাগ থেকে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ সময়ে রাজধানীতে দুই পালায় চার হাজারের বেশি ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। রমজানে যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করবে সংশ্লিষ্ট থানার মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স। এছাড়াও সড়কে ট্রাফিকব্যবস্থাপনায় পুলিশকে সহযোগিতার জন্য থাকা শিক্ষার্থীদের ডিউটি দুই পালার পরিবর্তে এক পালায় আনা হয়েছে। আগে ৬০০ শিক্ষার্থী সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই শিফটে পুলিশের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। রমজানে তারা সবাই বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এক শিফটে দায়িত্ব পালন করবেন। কথা হয় ডিএমপির মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এর সঙ্গে। তিনি বলেন, রমজানে দুপুরের পর রাস্তায় গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। বাসায় ফেরার তাড়া থাকে সবার। মানুষ যাতে নিরাপদে ইফতারের আগেই ঘরে ফিরতে পারে, সে জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নানা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দুপুরের পর থেকে ইফতার পর্যন্ত রাস্তায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োজিত থাকবে। কিছু জায়গায় ডাইভারশন দেয়া হবে। রাস্তায় কোনো হকার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসতে দেয়া হবে না। গাড়ি পার্কিং করতে দেয়া হবে না রাস্তায়।
এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, রমজান মাসে নিউমার্কেট-গাউছিয়া এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কেনাকাটা করতে আসবে। সেখানে যথাযথ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই এবং সড়ক বিভাজকে নেই কোনো প্রতিবন্ধক। ফলে, মানুষ ওভারব্রিজে না উঠে হেঁটে রাস্তা পার হয়। এতে গাড়ির গতি কমে যায়। ডিএমপি সদর দফতর থেকে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হবে। যারা গাড়িতে কেনাকাটা করতে আসবেন, তারা যেন রাস্তায় নেমে গাড়ি ছেড়ে দেন- এমন ক্যাম্পেইন করা হবে। বিশেষ করে বিকাল থেকে যেন যানজট তীব্র না হয়, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকব। একইকথা বলেছেন উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার সাঈদ। তিনি বলেন, উত্তরা এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশের সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করবে। বিভিন্ন শপিংমলের কমিটির সঙ্গে কথা হয়েছে। কমিটির লোকজন মার্কেটের সামনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করবে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ারকে একাধিকবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত রোববার প্রথম রোজার দিনে তিনি বলেন, অফিস শেষ করে মানুষ ইফতারের আগে বাসায় পৌঁছাতে চায়। যার ফলে বিকেল ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, আমরা যানজট নিরসনে চেষ্টা করছি। আমাদের এসপি, ডিসি, এডিসি, যুগ্ম কমিশনার সবাই রাস্তায় আছে। আমি নিজেও রাস্তায় আছি। সাধারণ সময়ের তুলনায় সড়কে ট্রাফিক মোতায়েনও বেশি করা হয়েছে। আশা করি, ইফতারের আগেই মানুষ বাসায় ফিরতে পারবেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানিয়েছিলেন, আসন্ন রমজান মাসে ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তা করতে শিক্ষার্থীরাও মাঠে নামবে। রোজার মাসে ঢাকার মানুষ যাতে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারে সেজন্য ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি স্কাউট এবং বিএনসিসির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। তাছাড়া, বর্তমানে ট্রাফিক সহায়তায় থাকা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হবে।
এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়কে গাড়ির চাপ সব সময়ই থাকে। কিন্তু রমজানে স্বল্প সময়ের মধ্যে সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ছুটি হওয়ার কারণে এই চাপ অনেক বেড়ে যায়। মানুষের কাজের প্রয়োজনে রাস্তায় যেতে হয়, তাই প্রথমত আমাদের পলিসির দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। তিনি বলেন, ফুটপাত দখল করে রমজানে ইফতারসামগ্রী বিক্রি বন্ধ করতে হবে। ফুটপাত দখল হয়ে গেলে মানুষ ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে না, সে কারণে রাস্তায় নেমে আসবে এবং যানজট বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।