
* জাতীয়করণ দাবিতে সারা দেশে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা শিক্ষকদের
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে জামায়াতের একাত্মতা
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে সচিবালয়ের দিকে যেতে চাইলে জাতীয়করণ প্রত্যাশী ঐক্য জোটের নেতাদের পুলিশ বাধা দেয়। এর প্রতিবাদে সারা দেশে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে এ ঘোষণা দেন তারা।
শিক্ষক নেতারা বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, শতভাগ উৎসব ভাতা, সরকারি কর্মচারীদের মতো একই হারে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার ঘোষণা দিতে হবে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই শতভাগ উৎসব ভাতার ঘোষণা দিতে হবে। শতভাগ উৎসব ভাতার ঘোষণা না আসলে ঈদের নামাজ প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় পড়বেন তারা।
এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষকরা সচিবালয়ের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে তাতেও বাধা দেয়া হয়। এসময় পুলিশের সঙ্গে তাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে আবার প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। তারা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
আন্দোলনকারীদের একজন জানিয়েছে, আমাদের কর্মসূচিতে পুলিশ বিনা উসকানিতে ফ্যাসিবাদি কায়দায় আক্রমণ করে শিক্ষকদের পিটিয়েছে। আমিসহ তিন জনকে আটক করেছিলো। পরে শিক্ষকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ছেড়ে দিয়েছে। একজন শিক্ষককে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।
এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত শিক্ষকদের শিক্ষা ভবন অভিমুখে পদযাত্রায় বাধা দেয় পুলিশ। এর পর আট সদস্যের প্রতিনিধিদল আলোচনার জন্য সচিবালয়ে যান। পরে তারা ঘোষণা দেন শুক্র ও শনিবার প্রতীকী অনশনে বসবেন আর আগামী রোববার ফের সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা করা হবে। সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় এই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হয়।
শিক্ষকরা বলেছেন, সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া, মেডিক্যাল ভাতা, শতভাগ উৎসব ভাতা ও এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। প্রজ্ঞাপন ছাড়া ঘরে ফিরবেন না তারা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে জামায়াতের একাত্মতা: একযোগে সারা দেশের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘সম্মিলিত নন-এমপিও ঐক্য পরিষদ’ ব্যানারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে এসে এই একাত্মতা ঘোষণা করেন তিনি। নন-এমপিও শিক্ষকরা ১৪ দিন যাবত প্রেস ক্লাবের ফুটপাতে অবস্থান করছেন। একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মু. তাহের বলেন, নন-এমপিও শিক্ষকরা যে দাবি করছেন সেটা ন্যায্য দাবি। শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে এসে রাজপথে আন্দোলন করছেন। দিনের পর দিন আন্দোলন করলেও সরকারের কানে পানি ঢুকছে না এখন পর্যন্ত। এটা উচিত ছিল শিক্ষকরা দাবি করার আগেই সব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা। বাইরের দেশে শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য কোনো দাবির প্রয়োজন হয় না। এটা সরকারের নিজস্ব দায়িত্ব শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের গ্রহণ করা। তিনি বলেন, আমি আপনাদের এই দাবির সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একাত্মতা ঘোষণা করছি। আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাকে অনুরোধ করবো, আপনি তাদের কথা শুনেন এবং ন্যায্য দাবি মেনে নেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা সুন্দর কথায় ভালো কথায় ন্যায্য দাবির কথা বললে তা পূরণ হয় না এই দেশে। আমরা আশা করছি আপনাদের সেই পর্যায়ে যাওয়ার লাগবে না। তিনি আরও বলেন, আমি অনুরোধ করে বলবো আপনারা আসেন অথবা তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে কথা বলেন। তাদের সঙ্গে বসে তাদের দাবি গুলো পূরণ করেন। যদি না করেন তাহলে এই আন্দোলন শুধুমাত্র শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটাতে সব শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে হবে।
এর আগে অবস্থান কর্মসূচিতে সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়ক অধ্যক্ষ মো. দবিরুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিবছর এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেয়া হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় গত চার বছর কোনো আবেদন নেয়া হয়নি। ২০২৫ সালে যদি আবেদন না নেয়া হয় তাহলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ দীর্ঘ ২০-২৫ বছর ধরে বিনা বেতনে কেউ চাকরি করতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা মনে করি নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের সামাজিক মর্যাদা ও সীমাহীন কষ্টের কথা চিন্তা করা দরকার। সেজন্য, এমপিও নীতিমালা ২০২১ এর সব শর্ত বাতিল করে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্ত করে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দুঃখ দুর্দশার অবসান করতে হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোট ঘোষিত এই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকরা অবস্থান নিয়েছেন।
সংগঠনের সদস্য সচিব দেলাওয়ার হোসেন আজীজী বলেন, ‘আমরা আশ্বাসে বিশ্বাসী না, আন্দোলনস্থলে এসে ঘোষণা দিতে হবে, আমাদের দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। অন্যথায় শিক্ষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে।’
সংগঠনটির যুগ্ম সদস্য সচিব আবুল বাসার বলেন, মার্চ টু যমুনা কর্মসূচিতে পুলিশের বাধার প্রতিবাদে জাতীয়করণ শিক্ষকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিক্ষক সমাবেশ করা হবে, সেই সমাবেশে শিক্ষকরা তাদের নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেবেন এবং দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন এবং কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। শিক্ষকরা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেয়ার সুস্পষ্ট ঘোষণা ছাড়া প্রেস ক্লাব ছেড়ে যাবেন না তারা। সরকারকে দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে সব এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীকে প্রেসক্লাবের কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান তারা।