
* দলটির শীর্ষ পদ থাকছে ছয়টি
* দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ থেকে ১৫০ জন
* উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম
* এই কমিটি নিয়েই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে দলটি
* নতুন দলের শীর্ষ ছয়টি পদ নিয়ে ‘সমঝোতা’
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারছেন না ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা। নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের দিন ঠিক হয়ে গেছে বলে একটি অসমর্থীত সূত্রে জানা গেছে।
নতুন দলের নামে নাগরিক, ছাত্রজনতা কিংবা রেভ্যুলেশন- এর মতো শব্দ থাকতে পারে। জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করবে ২৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার)। সেদিন বেলা তিনটায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ হবে। এ লক্ষ্যে গতকাল উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
দলটির শীর্ষ পদ থাকছে ছয়টি। যাত্রার শুরুতে আহ্বায়কের নেতৃত্বে ছয়টি শীর্ষ পদসহ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ থেকে ১৫০ জন। দলের আত্মপ্রকাশের দিনে এই কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। পরে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ জন করা হতে পারে। আর এই কমিটি নিয়েই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে দলটি। দল গঠন এবং আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে জড়িত জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ২৭ কিংবা ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশের তারিখ হতে পারে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক, কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন উপকমিটির প্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির বেশি সময় আমরা নিতে চাই না। কারণ মার্চের ১ তারিখ থেকে পবিত্র রমজান শুরু হবে। আপাতত গত বুধবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারিকে টার্গেট করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ওইদিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান হতে পারে। সব কিছু চূড়ান্ত হয়ে গেলে সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হবে। সূত্র জানায়, শীর্ষ কয়েকটি পদের নেতৃত্ব নিয়ে সমাধান মিললেও বাকি পদগুলোতে কে কোন পদে আসবেন তার সুরাহা না হওয়ায় তৈরি হয়েছে এই সিদ্ধান্তহীনতার পরিস্থিতি। পাশাপাশি কেমন হবে দলের সাংগঠনিক কাঠামো, কী হবে নাম ও প্রতীক, কেমন হবে গঠনতন্ত্র- এসব প্রশ্নের জবাব মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তরুণরা। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটবে তরুণদের রাজনৈতিক দলের। পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত হবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আহ্বায়ক কমিটির আকার সব মিলিয়ে ১৫০-২০০ সদস্যবিশিষ্ট হতে পারে। আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখপাত্র হাসনাত আবদুল্লাহর নাম শোনা যাচ্ছে।
এ ছাড়া সাংগঠনিক কাঠামোতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদের তালিকায় থাকবেন জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, তাসনিম জারা ও আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম সদস্যসচিব অনিক রায়, মাহবুব আলম ও অলিক মৃ। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদকেও দেখা যাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে। সব প্রশ্নের জবাব নিয়ে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে চান তরুণরা। রাজনৈতিক শক্তিমত্তার জানান দিতে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তিন লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতির টার্গেট নিয়েছে কর্মসূচি বাস্তবায়ন বিষয়ক উপ-কমিটি। ওই দিন সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসবেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা। জাতীয় নাগরিক কমিটির সহ-মুখপাত্র ও মিডিয়া সেল সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পাঁচ মাসে দেশের ৪ শতাধিক থানা ও উপজেলায় প্রতিনিধি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তাদের ঢাকায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
নতুন দলের বিষয়ে জনমত জরিপ করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। এ লক্ষ্যে গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘আপনার চোখে নতুন বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি কর্মসূচি চলছে। এ কর্মসূচির আওতায় জনমত জরিপ করা হচ্ছে। অনলাইনের পাশাপাশি জেলায় জেলায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত (প্রশ্নোত্তর) সংগ্রহ করা হচ্ছে। জরিপে গত রোববার বিকেল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষ মতামত দিয়েছেন বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা।
জাতীয় নাগরিক কমিটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, নতুন রাজনৈতিক দলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিতে অন্তর্র্বতী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন নাহিদ ইসলাম। আর দলের সদস্যসচিবের পদে আখতার হোসেনের নাম অনেকটাই চূড়ান্ত। তিনি এখন জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের দিনেই দলটির নাম, নেতৃত্ব ও কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। তবে দলের নির্বাচনি প্রতীক কি হবে, সেটি এখন অপ্রকাশিত রাখা হতে পারে। আগামী ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুক্রবার আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে নতুন এই দল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর দলের কাউন্সিল করতে সময় লাগতে পারে দুই বছর। সেজন্য আহ্বায়ক কমিটিই দলকে এগিয়ে নিয়ে নির্বাচনে যাবে। কাউন্সিল করার পর সেখানে যে সাংগঠনিক কাঠামো আসবে, সেটি দলের মূল কাঠামো হিসেবে থাকবে এবং নির্বাচনের আগে কাউন্সিল করা সম্ভব না বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র। ফলে এই কমিটি নিয়েই দলটির নির্বাচনের দিকে এগোনোর কৌশল এক্ষেত্রে অনেকটাই স্পষ্ট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আসন্ন রাজনৈতিক দলটির সম্ভাব্য শীর্ষ পদের একজন নেতা গনমাধ্যমকে বলেন, নতুন দলের নামে নাগরিক, ছাত্রজনতা কিংবা রেভ্যুলেশন- এর মতো শব্দ থাকতে পারে। এই মুহূর্তেই দলীয় প্রতীক ঘোষণা করা না হলেও কলম ও শাপলার মতো প্রতীক আলোচনার টেবিলে আছে বলেও জানা যাচ্ছে। এরইমধ্যে জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় নির্বাচন করার যে আলোচনা শোনা যাচ্ছে, তা মাথায় রেখে নিজেদের তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোও গুছিয়ে নিচ্ছে দলটি। বিশেষ করে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যেসব কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেখান থেকে অনেকেই দলটিতে যোগ দেবেন। এর মাধ্যমে নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রতিনিধি তৈরির অভ্যন্তরীণ কাজও এগিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে সারা দেশ থেকে তৃণমূলের গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শুরুতে ঘোষণা করা কেন্দ্রীয় কমিটির পরিধি পরে বাড়ানো হবে। দল ঘোষণার পরপরই দ্রুততম সময়ে জেলা, উপজেলা কমিটি গঠন করা হবে।