
‘দিন যত গড়াবে বইমেলায় ভিড় ও বিক্রি বাড়বে, এমনটাই আশা ছিল প্রকাশকদের। কিন্তু আশায় আশায় মাসব্যাপী বইমেলার অর্ধেকের বেশি সময় পার হলেও প্রত্যাশানুযায়ী জমেনি মেলা। এতে হতাশ স্টল মালিক ও কর্মীরা। মেলায় দর্শনার্থী কিছু থাকলেও সে তুলনায় বিক্রি কম। শুধু বাবা মায়ের সঙ্গে আসা শিশু কিশোররাই মলাট থেকে কিছু বই পছন্দ করছে, আর অভিভাবকরা সন্তানদের বায়না পূরণ করছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মেলায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা। এতে অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল সোমবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি চত্তরে বইমেলায় এমন চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে বইমেলায় দর্শনার্থীরা যে শুধু বই কিনছেন তা নয়, এখানে মিলছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবাও। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বিআরবি হসপিটাল লিমিটেড, হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, সিওক হেলথকেয়ার, ম্যানেজমেন্ট নেটের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দর্শনার্থীদের সেবা দিচ্ছে। ধানমন্ডি থেকে মেলায় আসা সাবিহা, শোভা, প্রকাশ বেছে বেছে কিছু বই কিনেছেন। তারা বলেন, শুক্র ও শনিবার দেখেশুনে আরাম করে পছন্দমতো বই কিনতে পারি না। আজকে বেশ সময় নিয়ে কিছু বই কিনেছি। হাঁটাচলা করতেও বেশ আরাম।
মেলায় রেড ক্রিসেন্ট বাংলাদেশের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট খন্দকার রাকিব বলেন, মেলায় এই পর্যন্ত প্রায় ২০০ ব্যাগ ব্লাড সংগ্রহ করেছি। যারা বিনামূল্যে ব্লাড ডোনেট করছেন, তাদের বিনামূল্যে চারটি টেস্ট করিয়ে দিচ্ছি। যা বাইরে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ লাগে। টেস্টগুলো হলো, এইচআইভি টেস্ট, এইচবিএস টেস্ট, এইচসিভি টেস্ট, টিপি এইচএ/ভিডিআরএল টেস্ট এবং ইরেগুলার ব্লাড গ্রুপ টেস্ট। তবে সিউক হেলথকেয়ার নামের একটি স্টলে প্রতি শুক্রবার এবং শনিবার দুজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বসেন। তারা মেলার দর্শনার্থীদের ফ্রিতে চিকিৎসা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের ফ্রিতে ব্লাড প্রেসার চেকআপ, ডায়াবেটিস চেকআপ, কাউন্সেলিং করছে হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
বইমেলায় দেখা যায়, নামদামি কয়েকটি স্টলে নানান বইয়ের মলাট উল্টে দেখছিলেন কয়েকজন দর্শনার্থী। তবে কেনায় আগ্রহ নেই কারও। প্রকাশনা সংস্থার একজন কর্মচারী জানান, বই বিক্রি নেই বললেই চলে। বইয়ের মলাট উল্টিয়ে চলে যাচ্ছে বেশিরভাগই। আর অধিকাংশই সেলফি তুলে চলে যাচ্ছেন। একসময় গোয়েন্দা কাহিনী ও সায়েন্স ফিকশনের প্রতি কিশোরদের আগ্রহ থাকলেও এখন তা নেই।
পাঠাওয়ের ‘অগ্রযাত্রার অগ্রদূত’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন: বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পাঠাও’ এ বছর তাদের অগ্রযাত্রার দশম বছরে পদার্পণ করছে। এ উপলক্ষে পাঠাওয়ের সঙ্গে তৈরি হওয়া বিভিন্ন গল্প নিয়ে এবারের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘অগ্রযাত্রার অগ্রদূত’। বইটি প্রকাশ করেছে ‘স্টুডেন্ট ওয়েজ’। রোববার বিকেলে একুশে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ। সোমবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
এ সময় শফিকুল আলম বলেন, চব্বিশের জুলাইয়ে আমাদের যে অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানটি হয়েছে, সেখানে করপোরেট হাউস হিসেবে পাঠাওয়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আমি অগ্রযাত্রার অগ্রদূত বইটি পড়ছিলাম। গল্পগুলো খুবই ভালো। আমি মনে করি, সামনের বছরগুলোতে পাঠাওয়ের সঙ্গে যুক্ত সবার যদি প্রতিদিনের ডায়েরি এন্ট্রি নিতে এনকারেজ করা এবং সংগ্রহ করা হয়, তাহলে মনে হবে, পাঠাওয়ের প্রতিদিনের গল্পগুলোই লিপিবদ্ধ হচ্ছে।
ফাহিম আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১০ বছরে আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশব্যাপী ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। পাঠাওয়ের গল্প শুধু আমাদের সেবার গল্পই না, আমাদের সঙ্গে যুক্ত সব মানুষ, যাঁরা সেবা গ্রহণ করছেন এবং একই সঙ্গে সেবা প্রদান করার মাধ্যমে জীবনকে এগিয়ে নিচ্ছেন এবং জীবনের মান উন্নত করছেন, তাঁদের কথা। অগ্রযাত্রার অগ্রদূত বইয়ের গল্পগুলো পাঠাওয়ের সঙ্গে যুক্ত সবার গল্প। ১০ বছরের পথচলায় পাঠাওয়ের সঙ্গে অনেকের জীবনেই তৈরি হয়েছে দারুণ কিছু গল্প। কখনো ফুডম্যান কিংবা রেস্টুরেন্টকে কেন্দ্র করে, কখনো আবার একজন ব্যবসায়ী এবং একজন ডেলিভারি এজেন্টকে কেন্দ্র করে। এতসব গল্পের ভিড়েও থেকে যায় কিছু এগিয়ে যাওয়ার, ভিন্ন কিছু করার, সবার সামনে একটি উদাহরণ তৈরি করার মতো গল্প। পাঠাওয়ের সঙ্গে কাজ করাদের অনেকেই এই প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিনিয়ত তৈরি করছেন দারুণ কিছু বলার মতো গল্প। একুশে বইমেলায় স্টুডেন্ট ওয়েজ প্রকাশনীর ১০ নম্বর স্টল ছাড়াও পাঠাও শপ, বুকওর্ম, রকমারি, বাতিঘর, পিবিএসসহ বেশ কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে ‘অগ্রযাত্রার অগ্রদূত’ বইটি।
গতকাল সোমবার বইমেলার ১৭ তম দিনে নতুন বই এসেছে নতুন বই এসেছে ১১৩টি।
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানা যায়, অমর একুশে বইমেলার ১৬তম দিনে নতুন গল্প এসেছে-২১টি, উপন্যাস-১৪ টি, প্রবন্ধ-৬ টি, কবিতা-৪১ টি,গবেষণা-২ টি, ছড়া-২টি, শিশুসাহিত্য-৫টি, জীবনী-৪৩টি,ইতিহাস-৪টি এবং অন্যান্য-১৮টি।
আলোচনা অনুষ্ঠান: গতকাল সোমবার বিকেল ৪ টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আল মাহমুদ : জীবন ও কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মজিদ মাহমুদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মুসা আল হাফিজ এবং কাজী নাসির মামুন। সভাপতিত্ব করেন মাহবুব সাদিক।
প্রাবন্ধিক বলেন, আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কবি, যখন বাঙালি তথা পূর্ববঙ্গের মানুষের আত্ম-পরিচয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। একজন চারণ কবির মতো প্রেরণায় ভর করে তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির কথা বর্ণনা করে গেছেন। কৃষকের কাছে যেমন তার ভূমি, কৃষি উৎপাদন, স্ত্রী, সন্তান, গবাদিপশু জীবনের অবিচ্ছেদ্য উপকরণ, তেমনি আল মাহমুদের কাছে তাঁর স্বদেশ চেতনা জীবনের অপরিহার্য সহায়। তিনি কবিতায় শহর ও নগর জীবনের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কাব্যভাষায় একটি জাতির হাজার বছরের ক্রিয়াভিত্তিক শব্দরাজি পরম সফলতার সঙ্গে ধরা দিয়েছে।
আলোচকদ্বয় বলেন, কবি আল মাহমুদ তাঁর সমকালীন বাস্তবতা, আবহমান জীবন ও ঐতিহ্য থেকেই উঠে এসেছেন। তাঁর কবিতার প্রকৃতি, নারী, লোকায়ত জীবন, আধুনিকতা, সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রবণতা নিজস্ব রূপে হাজির হয়েছে। মানবজীবনের পটভূমিতে তিনি প্রকৃতিকে জীবন্তরূপে তুলে ধরেছেন। তিনি শব্দের প্রচলিত অর্থকে অতিক্রম করেছেন এবং নতুন অর্থ নির্মাণ করেছেন। রাজনৈতিক চেতনা চোরাস্রোতের মতো তাঁর কবিতায় প্রবাহিত হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে মাহবুব সাদিক বলেন, কবি আল মাহমুদ ছিলেন ঐতিহ্য ও ইতিহাস সচেতন আপাদমস্তক একজন কবি। তাঁর কবিতা আমাদের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলা সাহিত্যে আল মাহমুদ উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে টিকে থাকবেন। এদিন লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেনÑ কবি মতিন বৈরাগী এবং কবি ফজলুল হক তুহিন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: গতকাল সোমবার ছিল ঝর্ণা আলমগীরের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং রূপশ্রী চক্রবর্তী’র পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিল্প বাংলা’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী এ টি এম আশরাফ হোসেন, ওয়াদুদুর রহমান রাহুল, সোমা সরকার, নিপা আক্তার, সানজিদা ইয়াসমিন লাভলী, মাসুদুল হক, মো. আলী হোসাইন, মমতা দাসী এবং মোখলেসুর রহমান মিন্টু। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন আব্দুল আজিজ (তবলা), মো. বজরুল ইসলাম বিজু (কী-বোর্ড), মো. আতিকুল ইসলাম (বাঁশি) আকাশ আহমেদ কবির (বাংলা ঢোল) এবং বিশ্বজিৎ সেন (মন্দিরা)।
আজকের অনুষ্ঠান: আজ মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলার ১৮তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩ টায় এবং চলবে রাত ৯ টায় পর্যন্ত। এদিন বিকেল ৪ টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জীবন ও কর্ম : শহীদ কাদরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তারানা নূপুর। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন শামস আল মমীন এবং আহমাদ মাযহার। এতে সভাপতিত্ব করবেন হাসান হাফিজ।