
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্যে সমন্বয়হীনতায় একে একে দ্বন্দ্ব সংঘাত বাড়ছে। সমন্বয়করা নিজদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের জেরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এসব সহিংস ঘটনায় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ছাত্র সমাজের অধিকার আদায়ের বদলে নেতৃত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এতে দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যে নানাধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এসব ঘটনায় সমন্বয়কদের নিয়ে নানা সমালোচনায় মেতে উঠেন নাগরিকরা।
জানা গেছে, সর্বশেষ ২৫ জানুয়ারি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক কর্মীকে আটক করে পুলিশে দেয়ার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়কের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ওই ছাত্রলীগ কর্মীকে ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্যাম্পাসের কয়েকজন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। তবে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের কর্মী শরিফুল ইসলাম (সোহাগ) হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাকে আটকে পুলিশে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার সহপাঠী বন্ধুরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে বের করে দেয়। তারা কোনো হামলা করেনি। তবে এ ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার দাবি করে ছাত্রলীগের ১১ কর্মীর বিরুদ্ধে প্রক্টরের দফতরে লিখিত অভিযোগ করেছেন সমন্বয়ক পরিচয় দেয়া ওমর শরীফ। জানতে চাইলে প্রক্টর আরিফুজ্জামান রাজীব বলেন, এ বিষয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে একটা মিটিং ডেকেছি। সবার সঙ্গে বসে কী করা যায় শুনে, তারপর আমি মন্তব্য করতে পারব। গত ২১ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সাত শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পর আহত শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমরান সরকার (২১), তেজগাঁও কলেজের জান্নাতুল মিম (২২), আবরার (২২), আল আমিন (২৫), আফসার উদ্দিন (২৫), কবি নজরুল কলেজের আসিফ (২৪)। এবং ডেমরা বড় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মাসুদ (২৪)। তারা সবাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে আহত আল আমিন বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী জোনের সমন্বয়কদের একটি মতবিনিময় সভা ছিল। এ সময় সমন্বয়কদের উপস্থিতিতে তাদের সামনে আমাদের একজন সহযোদ্ধার উপর হামলা হয়। এতে আমাদের বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধা গুরুতর আহত হয় বর্তমানে জরুরি বিভাগে তারা চিকিৎসা নিচ্ছে। গত ১৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে হলের সিট নবায়নকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয়ক-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দ’ুপক্ষের প্রায় ১০ জন আহত হয়েছেন। এর আগে ১২ জানুয়ারি বিকেল পাঁচটা থেকে ক্যাম্পাসে হামলা ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয় চলে ৭টা পর্যন্ত। আহতরা হলেন-মেহেদী হাসান শিমুল, আল আমিন, সবুজ, রিফাত, তানভীরসহ অজ্ঞাত প্রায় ১০ জন। তবে আকরাম হোসাইন অপু নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের আশপাশে যতগুলো কলেজ রয়েছে, হলে তাদের সিট চার্জ পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু আমাদের দিতে হচ্ছে সাত হাজার টাকা। তা কমানোর জন্য আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। এ বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষ স্যারের সঙ্গে গত ১২ জানুয়ারি দুপুর আড়াইটার দিকে বসার কথা ছিল। কিন্তু আমরা যথাসময়ে গেলেও স্যার আমাদের সঙ্গে না বসে ছাত্রদল ও সমন্বয়কদের সঙ্গে বসেন। তিনি বলেন, পরে স্যার বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলে ছাত্রদল ও সমন্বয়করা ক্ষেপে গিয়ে আমাদের ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে বহিরাগতদের নিয়ে হামলা করেন। এতে আমাদের অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছে।
আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী হাজ্জাতুল হাসান মুন বলেন, হোস্টেলে এখনো ছাত্রলীগের পদধারী নেতাকর্মী রয়েছে। তারা অন্যায়ভাবে অধ্যক্ষ স্যারকে সরি বলাতে বাধ্য করেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে তারা আমাদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। আমাদের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সমন্বয়করা রয়েছে।
আনন্দ মোহন কলেজের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আশিকুর রহমান বলেন, যা হচ্ছে, নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণেই হচ্ছে। এ বিষয়ে আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমান উল্লাহ বলেন, ‘হলের সিট নবায়ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে গণ্ডগোলের সূত্রপাত। গত ১১ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় তিন জন আহত হয়েছে। পরে আহতদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হলেন- মিরপুর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিয়ান (১৬), রনি (২১) ও সাফরান (২২)। এর আগে ১০ জানুয়ারি শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় ঢাকার বাংলামোটর রূপায়ণ সেন্টারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদক জাহিদ আহসান বলেন, গত শুক্রবার রাতে আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কিছু লোক এসে কমিটিতে যুক্ত হতে নেতাকর্মীদের চাপ সৃষ্টি করে। তারা জোর করে কমিটিতে যুক্ত হতে চেয়েছে। তবে আমাদের মতাদর্শের সঙ্গে তাদের কমিটিতে নেয়া যাচ্ছে না। পরে আমাদের কেন্দ্রীয় কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডায় একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একইদিন ১১ জানুয়ারি মানিকগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র প্রতিনিধিদের দুই গ্রুপের মারামারি ঘটনা ঘটেছে। এতে মেহেরাব খান ও মিরাজ নামে দুই ছাত্র প্রতিনিধি আহত হন। মেহেরাব মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আর মিরাজ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে ছাত্র প্রতিনিধি ওমর ফারুক জানান, ১৩ জানুয়ারি মানিকগঞ্জে ‘জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচির জন্য প্রতিটি উপজেলা থেকে আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রাখে তাদের মানিকগঞ্জে ডাকা আলোচনা সভায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সমন্বয়ক ইসমাইল হোসেন রুদ্র ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে পৌরসভার বেউথা এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে আলোচনা সভা করেন। সভার শেষ পর্যায়ে দুই গ্রুপের মাঝে কথা কাটাকাটি হলে তা মারামারির পর্যায়ে পৌঁছায়। এতে দুই গ্রুপের মেহেরাব খান ও মিরাজ আহত হন। গত ৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার মিরপুরের সাত থানা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে কমিটি নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। পদপ্রত্যাশীদের অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকায় পদ দেয়া হয়নি। পদ না পাওয়ায় আগেই ঝামেলা করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল তারা। সেই সূত্র ধরে পদবঞ্চিতরা ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করে। বেশ কিছুক্ষণ তর্কবিতর্ক ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময় মিরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটির পদপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরে প্রায় ২০ মিনিট সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আহতদের বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত তিন জানুয়ারি খুলনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৯ জন আহত হয়েছেন। তার মধ্যে দু’জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নগরের শিববাড়ি মোড়ের জিয়া হলের সামনে ওই ঘটনা ঘটে। গত ২৩ নভেম্বর কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সদস্য মোহাম্মদ রাকিব বলেন, ‘কিছু ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে। তবে এখানে যারা আছেন সবাই আমাদের সহযোদ্ধা, বাইরের কেউ নেই। আশা করছি-এগুলো সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে আমরা সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের কাজ করছি। যেখানে আন্দোলন হচ্ছে সেখানেই ছুটে যাচ্ছি। সুতরাং আমরা মনে করছি এগুলো আহামরি কোনো বড় ধরনের সমস্যা না। আমরা এগুলো ঠিক করে ফেলতে পারব।
কমিটি গঠন নিয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়ার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে মোহাম্মদ রাকিব বলেন, ‘সংঘর্ষ-সহিংসতা কোনোভাবে কাম্য নয়, যে ঘটনাগুলো ঘটছে তারাও আন্দোলনকারী। যেহেতু নিজেদের মধ্যে এসব ঘটছে, এটা কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করে কী করা যায়। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।