
* ফের হাজার কোটি টাকায় নলকূপ বসাতে চায় ওয়াসা
* গত বছর কাজ শেষ হলেও বাস্তবায়ন হয়নি আগের পরিকল্পনা
* ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ঢাকা শহরের মাটির অভ্যন্তর
* নেমে আসতে পারে যে কোনো ধরনের বিপর্যয়
অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছে রাজধানীবাসী। ঢাকা শহর খনন করে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াসা। রাজধানীবাসীকে ঝুঁকিমুক্ত করতে ভূগর্ভের পরিবর্তে নদীর পানি পরিশোধন করে পান করানোর উদ্যোগ নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। এরই মধ্যে ঢাকা ওয়াসা এক হাজার ৫২ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে তারা। ২০০৯ সালে ঘোষণা দিয়েছিল, ২০২১ সালের মধ্যে চাহিদার ৭০ শতাংশ পানি ভূ-উপরিভাগের উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। ২০২৪ সাল শেষ হলেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। কয়েকটি প্রকল্প নেয়া হলেও পুরোপুরি সুফল মেলেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ থেকে প্রতিদিন ২৬৫ থেকে ২৯৭ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে ঢাকা ওয়াসা। এর মধ্যে ভূগর্ভ থেকে আসে ৭০ শতাংশ, ভূ-উপরিভাগ থেকে আসে ৩০ শতাংশ। ২০১৪ সালে প্রণীত ঢাকা ওয়াসার মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা মহানগরীতে সম্ভাব্য পানির চাহিদা হবে ৩০৫ দশমিক ৮ কোটি লিটার ও ২০২৯ সালে ৩৫৫ দশমিক ৩ কোটি লিটার। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গভীর নলকূপের উৎপাদনও কমছে। ২০২৯ সালে ঢাকা মহানগরীতে জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। জনগণের জীবনযাত্রার মান ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটায় মাথাপিছু পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসা বর্তমানে যে পরিমাণে পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে তার মধ্যে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-এক ও ফেজ-দুই থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার এবং মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার থেকে ২৮ কোটি লিটার ভূ-উপরিভাগের পানি সরবরাহ করে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি ২০২৬ সাল নাগাদ সরবরাহ লাইনে সংযুক্ত হবে। একইভাবে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেজ-তিন) থেকে ৪৫ কোটি লিটার পানি ২০২৯ সাল নাগাদ সরবরাহ লাইনে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার দাবি, ২০২৯ সাল নাগাদ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে প্রতিদিন আরও ৮১ দশমিক পাঁচ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়বে। সেজন্যই নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ঢাকা শহরে জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ খনন করা হবে। চলতি সময় থেকে ৩০ জুন ২০২৯ নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ৬২টি নতুন গভীর নলকূপ খনন করা হবে। ৩৮৮টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপন, ২৮০টি রি-জেনারেশন, ৬০টি পুনর্বাসন, ৪৪টি গভীর নলকূপে আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট, ৫০টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ও ১২৪টি স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপন করা হবে। পুরো ঢাকা মহানগরীতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদার বিপরীতে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা এবং বিদ্যমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত ৫৭ দশমিক ছয় কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হবে প্রকল্পের আওতায়।
ভূ-উপরিভাগের পরিবর্তে ভূগর্ভস্থ পানি সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুর রহমান বলেন, দিন দিন ঢাকার লোকসংখ্যা বাড়ছে। যে কারণে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বর্তমানে ঢাকা শহরে যে পরিমাণ পানি সরবরাহ করা হয় তার মধ্যে ৩০ শতাংশ ভূ-উপরিভাগের ও ৭০ শতাংশ ভূগর্ভের। আমাদের লক্ষ্য, ২০৩০ সাল থেকে ৭০ শতাংশ ভূ-উপরিভাগের পানি ঢাকায় সরবরাহ করা। পদ্মা ও শীতলক্ষ্যার পানি ঢাকায় আসছে। সামনে মেঘনা নদীর পানিও ঢাকায় আসবে।
ফের গভীর নলকূপ খনন প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার এমডি বলেন, আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি, বর্তমানে বাড়তি জনসংখ্যার জন্য পানি সরবরাহ করতে হবে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা শহরে জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকাবাসীর প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, ১৯৭০ সালেও ঢাকা শহরে ছয় মিটার বা প্রায় ২০ ফুট মাটির নিচেই পানি পাওয়া যেতো। অথচ ২০২৩ সালে ৭৩ মিটার বা প্রায় ২৪০ ফুটের আগে পানি পাওয়া যায়নি। সারাদেশে এক হাজার ২৭২টি পর্যবেক্ষণ কূপের মাধ্যমে ৬০ বছর ধরে পানির পরিমাণ ও গুণমান পর্যবেক্ষণ করছে পাউবো। তাদের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর দুই মিটার বা প্রায় সাড়ে ছয় ফুট করে নেমে যাচ্ছে। ঢাকার মাটির নিচে বড় বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। মাটির নিচে হচ্ছে বলে সেটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিপর্যয়ের ধারণা পেয়েছেন গবেষকরা। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ঢাকা শহরের অভ্যন্তর ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ফলে যে কোনো ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে। এই বিপর্যয় থেকে ঢাকা শহর বাঁচাতে আশপাশের নদীর পানি ঢাকাবাসীকে খাওয়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার একটি আদর্শ নিয়ম হলো, পানি উত্তোলনের পরিমাণ কখনই রিচার্জের পানির চেয়ে বেশি হতে পারবে না। ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ অসীম নয়। সরকারকে অবশ্যই জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় এর বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। অথচ বিকল্প ব্যবস্থা না করে ফের ঢাকার বুকে গভীর নলকূপ খননে ঝুঁকি বাড়বে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, ঢাকা শহরের একটু গভীরে এখন কালো পানি। তবে অনেক গভীরে ভূগর্ভস্থ পানি ভালো পাওয়া যায়। যমুনার পানি ঢাকার উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে যায়। এ কারণে ঢাকা শহর বেঁচে যাচ্ছে। সারফেস ওয়াটারের জন্য প্রকল্প নেয়া হচ্ছে মিডিয়ায় প্রচারের জন্য। এটার কিছুটা কাজ হলেও ঢাকা শহরের মানুষ অনেক লাভবান হতো। কিন্তু আমরা দেখেছি শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কী পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বিদেশে বসে অফিস করে কাড়ি কাড়ি অর্থ নিয়ে গেছেন। ঢাকাবাসীকে ভূ-উপরিভাগের পানি খাওয়ানোর প্রকল্প মিডিয়ায় প্রচার ও লোক দেখানোর জন্য নেয়া। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘পরিবেশের ক্ষতি না করে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই ভূ-পৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো হবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কোনো ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই নদীর পানি পান করানোর উদ্যোগ নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। অথচ এখন কেন এসব উদ্যোগ থেকে সরে এসে ঢাকা শহরে গভীর নলকূপ খনন করতে চাইছে তার ব্যাখ্যা চাওয়া দরকার। ঢাকা শহরের পাশে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা কিন্তু দূষণে পরিপূর্ণ। তাহলে কীভাবে ঢাকা শহরে নদীর পানি সরবরাহ করবে ওয়াসা? আসলে প্রকল্প নিতে হয় তাই নিয়েছে। প্রকল্পের নামে কীভাবে ছয়নয় হয়েছে তা আমরা দেখেছি।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, ঢাকা ওয়াসা কিন্তু একা এসব কাজ করতে পারবে না। একটা সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারের থাকতে হবে, যেটা দেখছি না। একদিকে নদীর পানি সরবরাহের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ঢাকার পাশের নদীগুলো দূষণে ভরা। আগে নদীদূষণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এটার পক্ষে কোনো উদ্যোগ দেখছি না। ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে অথচ বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। যে কারণে ঢাকা শহরে গভীর নলকূপ খনন করে পুনরায় ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। এসবের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। আগে কেনইবা নদীর পানি সরবরাহের কথা বলে মাস্টারপ্ল্যান করা হলো আর এখন কেন-ই-বা সফল হচ্ছে না। বর্তমানে যে ড্যাপ (বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা) করা হয়েছে তা ঢাকায় বসবাসের জন্য উপযোগী নয়। বসবাসযোগ্য একটা ড্যাপ ঢাকাবাসীকে উপহার না দিতে পারলে কোনো পরিকল্পনায় সফল হওয়া যাবে না।