
রাজধানীর পূর্বাচলে গাড়িচাপায় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় মামলা নিতে পুলিশের অসহয়োগিতার অভিযোগ করেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে আসামিপক্ষের আইনজীবীর বিভ্রান্তিকর মন্তব্য ও গণমাধ্যমে হতকাণ্ডকে দুর্ঘটনা বলে প্রচারেরও অভিযোগ করেন তারা। গতকাল শনিবার বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্রিফিংয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেণ।
তারা জানান, বিকাল সাড়ে ৪টায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিতের দাবিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি জমা দেবেন তারা। ব্রিফিংয়ে ঘটনার শুরু থেকে বর্ণনা দিয়ে তারা বলেন, গত ২০ ডিসেম্বর রাতে বুয়েটে একটা প্রোগ্রাম চলাকালীন সময়ে আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থী একত্রে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলাম। এমতাবস্থায় আনুমানিক রাত ৩টার পরে পূর্বাচল নীলা মার্কেটের সামনে ৩০০ ফিট রাস্তায় আমাদের তিন বন্ধু— মোহতাসিম মাসুদ (নজরুল হল), অমিত সাহা এবং মেহেদি হাসান খাঁনের দুর্ঘটনার খবর জানতে পারি।
খবর জানতে পেরে আমরা বারবার তাদের ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে থাকি এবং কিছুক্ষণ পর একজন পথচারী অমিতের ফোন রিসিভ করেন। তার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, আমাদের তিন বন্ধু গুরুতর আহত এবং একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা তৎক্ষণাৎ সেই পথচারীর কাছ থেকে ঘটনাস্থলের লোকেশন নিয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হই। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার ব্রিগেডের সাহায্যে আমরা তাদের তিনজনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাসুদকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাকি দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। একই সময়ে বাকি শিক্ষার্থীরা কুর্মিটোলা হাসপাতালে পৌঁছায়। সেখানে তারা দেখতে পায়, দুর্ঘটনায় জড়িত প্রাইভেট কারটির চালক এবং তার সহযাত্রীদের প্রত্যক্ষদর্শী এবং পথচারীরা ঘিরে রেখেছে। উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে তারা জানান, তাদের কথা শুনে এবং ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করে আমরা যা জানতে পারি, তা হলো— অমিত, মাসুদ এবং মেহেদিকে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নীলা মার্কেট মোড়ে ডিউটিরত পুলিশ দাঁড় করায়। এ সময় পেছন থেকে একটি প্রাইভেট কার বেপরোয়া গতিতে এসে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল-সহ তিনজনকে আঘাত করে। এর ফলে ভারা তিনজন সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ছিটকে পড়ে। প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিলেন মুবিন আল মামুন (সাদমান) এবং তার সঙ্গে ছিলেন মিরাজুল করিম এবং আসিফ চৌধুরী বলে তারা জানান। চালকের পরিচয় দিয়ে তারা বলেন, চালক সাদমান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মামুনের সন্তান। শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে চালকের বাবাকেও সেখানে উপস্থিত দেখতে পায়। পরে তাদের প্রাইভেট কার পর্যবেক্ষণ করে আমরা অ্যালকোহল এবং মাদক জাতীয় নেশাদ্রব্যের উপস্থিতি পাই।
মামলা নিতে অনীহা প্রকাশের অভিযোগ: থানায় দায়িত্বরত এসআই মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পৌঁছায়। পুলিশ প্রাইভেট কারের চালকসহ তিনজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে রূপগঞ্জ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায় এবং পরে তাদেরকে রূপগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। এসময় শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে থানায় পৌঁছায়। থানায় ঘটনার বিবরণ জানার পরেকর্তব্যরত এসআই মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসহয়োগিতামূলক আচরণ করতে থাকেন। সকাল আটটায় আরও একদল শিক্ষার্থী বুয়েটের কতিপয় শিক্ষক, চিফ সিকিউরিটি অফিসার এবং হেড গার্ডসহ থানায় উপস্থিত হন। তখন থানায় কোনও ওসি উপস্থিত ছিলেন না এবং তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিলম্ব করতে থাকেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ওসি থানায় উপস্থিত হন এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। অভিযুক্তদের পরিবার মামলার ঘটনাপ্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন অভিযোগ করে বুয়েট শিক্ষার্থীরা বলেন, এ সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং চালকের পরিবারের লোকজন বিভিন্নভাবে মামলার ঘটনাপ্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এর প্রেক্ষিতে অভিযুক্তের মা নানাভাবে শিক্ষার্থীদের মামলা থেকে দূরে থাকতে ক্ষতিপূরণ প্রদানের কথা জানান। এক পর্যায়ে তার সন্তান মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল শুনে তিনি বলেন, তার সন্তান ড্রাঙ্ক হলেও ওরা অত রাতে ওখানে কী করছিল! এরকম অনভিপ্রেত মন্তব্য এবং প্রভাব খাটানোর চেষ্টায় বুয়েটের আপামর শিক্ষার্থী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়।
পাঁচ দফা দাবি: শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে বলেন, আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি— সড়কের নিরাপত্তা আইন জোরদার করুণ, দেশের বিচারব্যবস্থাকে একটি গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করুণ। আর কোনও প্রাণ যেনো এভাবে সড়কে কোনও মাতাল, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির হাতে না ঝড়ে, আর কোনও পরিবার যেনো নিজেদের সন্তানকে না হারান, কোনও মায়ের কোল যেন আর খালি না হয়— এই ব্যাপারে দৃষ্টি প্রদানের দায়িত্ব সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সরকারেরও। এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দেশে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করুণ। অপরাধী যে পরিবারেরই সদস্য হোক না কেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন, এই ব্যাপারটি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হোক। তাদের দাবি হলো- ১. যেকোনও মূল্যে এই হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণ। ২. আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার অবশ্যই বিবাদীপক্ষকে বহন করতে হবে। ৩. নিহত মাসুদের পরিবারকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বিবাদীপক্ষকে বাধ্য করতে হবে। ৪. তদন্ত কার্যক্রমে বাধাপ্রদানের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. সড়ক দুর্ঘটনার কারণে আর কারও প্রাণ যেন না যায় এবং সড়কে নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত হয়, সেই ব্যাপারে যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।