
* চারজন নিহতের পরও বাকযুদ্ধে লিপ্ত সাদ ও জুবায়েরপন্থি
* সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চাইলে কঠোরভাবে প্রতিহত করার ঘোষণা জুবায়েরপন্থিদের
* বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি সাদপন্থিদের
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে নির্দলীয় ধর্মচর্চার সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে তাবলীগ জামায়াত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নেতৃস্থানীয়দের ‘দোষারোপের রাজনীতির’ কারণে সংগঠনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন নিহতসহ শতাধিক আহত হয়েছেন। তবে চারজন নিহতের পর যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং অন্যান্য বাহিনীর একটি বড় চৌকস দল নিয়মিত পুলিশসহ টহল দিচ্ছে বলে জানা গেছে। সেখানে বর্তমানে বিশ্ব ইজতেমায় শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদে তাবলীগ জামায়াতের একাধিক পক্ষের মধ্যে একাধিকবার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, এমনকি মারামারিও হয়েছে। এসবের কারণে গত বুধবার গাজীপুরে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের দখল নিয়ে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিশ্ব ইজতেমায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লির জমায়েত নিয়েও খানিকটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাবলীগ জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন বাংলাদেশে তাবলীগ জামায়াতকে একাধিক ভাগে ভাগ করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এর ফলে ছোটখাটো ঘটনায় কয়েকটি কুচক্রী মহল বিভেদ তথা সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষের ভালোবাসার কারণে এত দিনেও কেউ এই জামায়াতের মধ্যে প্রকাশ্যে বড় ধরনের কোনো সংঘাত না দেখলেও এবার ভয়াবহ সংঘর্ষের পর চার জন নিহত হওয়ায় আবারও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করারশর্তে তাবলীগ জামায়াতের একজন আলেম বলেন, যারা দুনিয়াবি সুবিধা পেতে চায় তারাই ঝামেলা পাকাচ্ছে। আদতে তাবলীগ জামায়াতের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। নিরহংকার হয়ে ধর্মের জন্য জানমাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়ার নামই তাবলীগ জামায়াত বা ধর্ম প্রচার করা হয়। কিন্তু যারা এই আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারাই সংঘাতের পথে যাচ্ছে।
জানা গেছে, আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়ে বিশ্ব ইজতেমা পালন করার ঘোষণা দিয়েছে তাবলীগ জামায়াতের জুবায়েরপন্থিরা। সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চাইলে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। তবে তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন সাদপন্থি মুফতী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মাক্কী। এইভাবে একে অপরকে ঘায়েল করতে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, তাবলীগ জামায়াতের দু’টি গ্রুপের পাল্টিপাল্টি হুশিয়ারি অনিবার্য সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা।
তাবলীগের সংঘাত মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য কামনা করছে। বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা পূরণের ব্যবস্থা যেন আল্লাহ করে দেন এ দোয়াই করি। গত বুধবার বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এ কথা বলেন। শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা এই
সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এখনো তারা ইসলামী আদর্শের উপর অটল ও অবিচল আছেন এবং সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি সবসময়েই পরস্পরের কাছাকাছি থেকে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি যার যার জায়গা থেকে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে আকাক্সক্ষা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা পূরণ করার জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। তবে তাবলীগ জামায়াতের দুই পক্ষের সংঘাত মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। গতকাল বৃহস্পতিবার পুরানা পল্টনের দলীয় কার্যালয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেন, তাবলীগ জামায়াত বিশ্বের শান্তিপূর্ণ ও প্রেমময় ধারার একটি দাওয়াতি কাফেলা। মানুষের কল্যাণ কামনা করে বিনীত ও মাধুর্যময় ভাষায় দাওয়াত উপস্থাপন করার মাধ্যমে তাবলীগ জামায়াত সারা বিশ্বের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি কার্যক্রম হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। কিন্তু, মাওলানা সাদের কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাবলীগ জামায়াতে দু’টি ধারা তৈরি হয়েছে; যা দুঃখজনক হলেও একে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের। তিনি বলেন, আসন্ন বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে যে সব ঘটনা ঘটছে, তা কল্পনাতীত। ইসলামের দাওয়াতি মেজাজ, তাবলীগের ইতিহাস ও চরিত্র বিবেচনায় এমন হানাহানি ও মৃত্যুর কথা চিন্তাও করা যায় না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং তার করুণ পরিণতি বিবেচনায় উম্মাহর যে কোনো সদস্যের ন্যায় আমরাও ব্যথিত। উভয় পক্ষের নেতাদের উদ্দেশে সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করুন। দেশের সর্বজন স্বীকৃত উলামায়ে কেরাম এবং প্রয়োজনবোধে দেওবন্দ, করাচি ও আরবের সর্বজন স্বীকৃত উলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। যেভাবেই হোক এ ধরনের হানাহানি পরিহার করুন।
আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ইজতেমা পালনের ঘোষণা দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেছেন জুবায়েরপন্থিদের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবউল্লাহ রায়হান। তিনি বলেন, সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চাইলে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হাবিবউল্লাহ রায়হান। তিনি জানান, গত বুধবারের সংঘর্ষে তাদের তিনজন সাথি মারা গেছেন। এ ঘটনায় হত্যা মামলা করা হবে। মাওলানা সাদের অনুসারীরা প্রশাসনের আদেশ অমান্য করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপরও সাদপন্থিরা যদি ইজতেমা মাঠ দখলের চেষ্টা করে তাহলে সাধারণ মুসল্লীরা তাদের প্রতিহত করবে। এই বিভক্তি ইজতেমার সাধারণ মুসল্লীদের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন সাদপন্থি মুফতী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মাক্কী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর এক নম্বরে মাওলানা সাদপন্থিদের সংবাদ সম্মেলন তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, গত ১৭ ডিসেম্বর টঙ্গীতে জোড়ের কাজ করতে আসার পথে সাদপন্থি তাবলীগের সাথীরা জুবায়েরপন্থিদের পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে টঙ্গী কামারপাড়ায় ইজতেমা ময়দানের পাশে গাড়িবহরে নৃশংস হামলায় বগুড়ার সাথী বেলাল আহমদ (৬৫) নিহত হন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সাদপন্থি তাবলীগ জামায়াতের মুরুব্বিরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। তাবলীগে মামুনুল হক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পক্ষগুলোর হস্তক্ষেপ ও বিভক্তি সৃষ্টির অপচেষ্টায় দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, জুবায়েরপন্থিদের সহিংস কর্মকাণ্ড এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের পর থেকে সারা দেশে সাদপন্থিদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে। গত বুধবার রাতে ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদে হামলা চালানো হয়। নিকুঞ্জ মাদ্রাসায় হামলা করে হেফাজত ও জুবায়েরপন্থিরা। অনেক সাথী এখনো হাসপাতালে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তা ছাড়া, ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আহত সাথীদের সেবা গ্রহণেও বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। মুফতী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মাক্কী বলেন, আমরা তাবলীগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টির চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। দাবিগুলো হচ্ছে-১. আগামী বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ২. কাকরাইল মসজিদে সাদপন্থিদের স্বাভাবিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে দিতে হবে। ৩. টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান সরকার নিয়ন্ত্রণে রেখে সাদপন্থিদের ইজতেমার আগে বুঝিয়ে দিতে হবে। ৪. আগামী বিশ্ব ইজতেমা সুন্দরভাবে আয়োজনের জন্য সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. সারাদেশে সাদপন্থিদের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। মসজিদে-মসজিদে বাধা সৃষ্টি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৬. তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
এদিকে মাওলানা সাদ তার মতবাদ থেকে ফিরে এসে ক্ষমা চাইলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মনে করেন জুবায়েরপন্থিরা। এর আগে গত বুধবার গাজীপুরে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের দখল নিয়ে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
* সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চাইলে কঠোরভাবে প্রতিহত করার ঘোষণা জুবায়েরপন্থিদের
* বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি সাদপন্থিদের
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে নির্দলীয় ধর্মচর্চার সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে তাবলীগ জামায়াত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নেতৃস্থানীয়দের ‘দোষারোপের রাজনীতির’ কারণে সংগঠনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন নিহতসহ শতাধিক আহত হয়েছেন। তবে চারজন নিহতের পর যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং অন্যান্য বাহিনীর একটি বড় চৌকস দল নিয়মিত পুলিশসহ টহল দিচ্ছে বলে জানা গেছে। সেখানে বর্তমানে বিশ্ব ইজতেমায় শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদে তাবলীগ জামায়াতের একাধিক পক্ষের মধ্যে একাধিকবার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, এমনকি মারামারিও হয়েছে। এসবের কারণে গত বুধবার গাজীপুরে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের দখল নিয়ে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিশ্ব ইজতেমায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লির জমায়েত নিয়েও খানিকটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাবলীগ জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন বাংলাদেশে তাবলীগ জামায়াতকে একাধিক ভাগে ভাগ করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এর ফলে ছোটখাটো ঘটনায় কয়েকটি কুচক্রী মহল বিভেদ তথা সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষের ভালোবাসার কারণে এত দিনেও কেউ এই জামায়াতের মধ্যে প্রকাশ্যে বড় ধরনের কোনো সংঘাত না দেখলেও এবার ভয়াবহ সংঘর্ষের পর চার জন নিহত হওয়ায় আবারও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করারশর্তে তাবলীগ জামায়াতের একজন আলেম বলেন, যারা দুনিয়াবি সুবিধা পেতে চায় তারাই ঝামেলা পাকাচ্ছে। আদতে তাবলীগ জামায়াতের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। নিরহংকার হয়ে ধর্মের জন্য জানমাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়ার নামই তাবলীগ জামায়াত বা ধর্ম প্রচার করা হয়। কিন্তু যারা এই আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারাই সংঘাতের পথে যাচ্ছে।
জানা গেছে, আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়ে বিশ্ব ইজতেমা পালন করার ঘোষণা দিয়েছে তাবলীগ জামায়াতের জুবায়েরপন্থিরা। সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চাইলে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। তবে তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন সাদপন্থি মুফতী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মাক্কী। এইভাবে একে অপরকে ঘায়েল করতে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, তাবলীগ জামায়াতের দু’টি গ্রুপের পাল্টিপাল্টি হুশিয়ারি অনিবার্য সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা।
তাবলীগের সংঘাত মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য কামনা করছে। বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা পূরণের ব্যবস্থা যেন আল্লাহ করে দেন এ দোয়াই করি। গত বুধবার বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এ কথা বলেন। শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা এই
সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এখনো তারা ইসলামী আদর্শের উপর অটল ও অবিচল আছেন এবং সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি সবসময়েই পরস্পরের কাছাকাছি থেকে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি যার যার জায়গা থেকে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে আকাক্সক্ষা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা পূরণ করার জন্য আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। তবে তাবলীগ জামায়াতের দুই পক্ষের সংঘাত মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। গতকাল বৃহস্পতিবার পুরানা পল্টনের দলীয় কার্যালয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেন, তাবলীগ জামায়াত বিশ্বের শান্তিপূর্ণ ও প্রেমময় ধারার একটি দাওয়াতি কাফেলা। মানুষের কল্যাণ কামনা করে বিনীত ও মাধুর্যময় ভাষায় দাওয়াত উপস্থাপন করার মাধ্যমে তাবলীগ জামায়াত সারা বিশ্বের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি কার্যক্রম হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। কিন্তু, মাওলানা সাদের কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাবলীগ জামায়াতে দু’টি ধারা তৈরি হয়েছে; যা দুঃখজনক হলেও একে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া মুসলিম উম্মাহর জন্য উদ্বেগের। তিনি বলেন, আসন্ন বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে যে সব ঘটনা ঘটছে, তা কল্পনাতীত। ইসলামের দাওয়াতি মেজাজ, তাবলীগের ইতিহাস ও চরিত্র বিবেচনায় এমন হানাহানি ও মৃত্যুর কথা চিন্তাও করা যায় না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং তার করুণ পরিণতি বিবেচনায় উম্মাহর যে কোনো সদস্যের ন্যায় আমরাও ব্যথিত। উভয় পক্ষের নেতাদের উদ্দেশে সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করুন। দেশের সর্বজন স্বীকৃত উলামায়ে কেরাম এবং প্রয়োজনবোধে দেওবন্দ, করাচি ও আরবের সর্বজন স্বীকৃত উলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। যেভাবেই হোক এ ধরনের হানাহানি পরিহার করুন।
আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ইজতেমা পালনের ঘোষণা দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেছেন জুবায়েরপন্থিদের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবউল্লাহ রায়হান। তিনি বলেন, সাদপন্থিরা ইজতেমা করতে চাইলে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হাবিবউল্লাহ রায়হান। তিনি জানান, গত বুধবারের সংঘর্ষে তাদের তিনজন সাথি মারা গেছেন। এ ঘটনায় হত্যা মামলা করা হবে। মাওলানা সাদের অনুসারীরা প্রশাসনের আদেশ অমান্য করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপরও সাদপন্থিরা যদি ইজতেমা মাঠ দখলের চেষ্টা করে তাহলে সাধারণ মুসল্লীরা তাদের প্রতিহত করবে। এই বিভক্তি ইজতেমার সাধারণ মুসল্লীদের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন সাদপন্থি মুফতী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মাক্কী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর এক নম্বরে মাওলানা সাদপন্থিদের সংবাদ সম্মেলন তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, গত ১৭ ডিসেম্বর টঙ্গীতে জোড়ের কাজ করতে আসার পথে সাদপন্থি তাবলীগের সাথীরা জুবায়েরপন্থিদের পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে টঙ্গী কামারপাড়ায় ইজতেমা ময়দানের পাশে গাড়িবহরে নৃশংস হামলায় বগুড়ার সাথী বেলাল আহমদ (৬৫) নিহত হন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সাদপন্থি তাবলীগ জামায়াতের মুরুব্বিরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। তাবলীগে মামুনুল হক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পক্ষগুলোর হস্তক্ষেপ ও বিভক্তি সৃষ্টির অপচেষ্টায় দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, জুবায়েরপন্থিদের সহিংস কর্মকাণ্ড এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের পর থেকে সারা দেশে সাদপন্থিদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে। গত বুধবার রাতে ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মসজিদে হামলা চালানো হয়। নিকুঞ্জ মাদ্রাসায় হামলা করে হেফাজত ও জুবায়েরপন্থিরা। অনেক সাথী এখনো হাসপাতালে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তা ছাড়া, ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আহত সাথীদের সেবা গ্রহণেও বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। মুফতী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ মাক্কী বলেন, আমরা তাবলীগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টির চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। দাবিগুলো হচ্ছে-১. আগামী বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ২. কাকরাইল মসজিদে সাদপন্থিদের স্বাভাবিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে দিতে হবে। ৩. টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান সরকার নিয়ন্ত্রণে রেখে সাদপন্থিদের ইজতেমার আগে বুঝিয়ে দিতে হবে। ৪. আগামী বিশ্ব ইজতেমা সুন্দরভাবে আয়োজনের জন্য সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. সারাদেশে সাদপন্থিদের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। মসজিদে-মসজিদে বাধা সৃষ্টি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৬. তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
এদিকে মাওলানা সাদ তার মতবাদ থেকে ফিরে এসে ক্ষমা চাইলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মনে করেন জুবায়েরপন্থিরা। এর আগে গত বুধবার গাজীপুরে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের দখল নিয়ে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।