
সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিদ্যুৎগতির আক্রমণের মুখে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের অবসান হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অবহিত করেছেন তাদের কমান্ডাররা, এ বিষয়ে জ্ঞাত এক সিরীয় কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
বিদ্রোহীরা দাবি করেছেন, রাজধানী দামেস্ক ‘এখন আসাদ মুক্ত’।
এর আগে প্রেসিডেন্ট আসাদ রোববার একটি উড়োজাহাজে করে অজ্ঞাত গন্তব্যের উদ্দেশে দামেস্ক ত্যাগ করেছেন বলে সিরীয় সেনাবাহিনীর দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
বিদ্রোহীরা বলেছে, তারা রাজধানীতে প্রবেশ করেছে আর সেখানে সেনাবাহিনী ‘মোতায়েনের কোনো চিহ্ন’ দেখা যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কয়েক হাজার মানুষ গাড়ি যোগে ও পায়ে হেঁটে দামেস্কের প্রধান স্কয়ারে জমায়েত হয়ে ‘স্বাধীনতা’ বলে শ্লোগান দিচ্ছেন।
বিদ্রোহীরা বলেছে, আমরা সিরীয় লোকজনের সঙ্গে আমাদের বন্দিদের মুক্তির ও তাদের শিকল মুক্ত হওয়ার খবর উদযাপন করছি। (আমরা) সেইদিনায়া কারাগারের অন্যায়ের যুগের অবসান ঘোষণা করছি।
সেইদিনায়া দামেস্কের প্রান্তে অবস্থিত বড় একটি সামরিক কারাগার। সিরীয় সরকার এখানে কয়েক হাজার মানুষকে বন্দি করে রেখেছিল।
ফ্লাইটরাডার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দামেস্ক থেকে সিরীয় একটি উড়োজাহাজ উড়াল দেয় প্রায় ওই সময়ে যখন বিদ্রোহীরা দামেস্কের দখল নিচ্ছে বলে খবর আসছিল।
এই উড়োজাহাজটি প্রথমে সিরিয়ার উপকূলীয় এলাকায় দিকে উড়ে যায়, এই এলাকাটি আসাদের শিয়া আলিউইতি সম্প্রদায়ের নিজেদের এলাকা যেখানে তাদের শক্ত অবস্থান আছে। কিন্তু ওই দিকে যাওয়ার পর উড়োজাহাজটি আকস্মিকভাবে পুরোপুরি বিপরীত দিকে ঘুরে গিয়ে কয়েক মিনিট ধরে উড়ে চলে, তারপর মানচিত্র থেকে উধাও হয়ে যায়। সিরিয়ার এই উপকূলীয় এলাকায় আসাদের মিত্র রাশিয়ার একটি নৌ ও বিমান ঘাঁটি আছে।
ওই উড়োজাহাজে কে ছিল তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স।
বিদেশে সিরিয়ার প্রধান বিরোধীদলের প্রধান হাদি আল-বাহরা সিরীয় রোববার ঘোষণা করেছেন, দামেস্ক এখন ‘বাশার আল-আসাদ ছাড়া’ আছে।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বিদ্রোহীরা ঘোষণা করেছিল, তারা মাত্র একদিনের লড়াইয়ের পরে গুরুত্বপূর্ণ শহর হমসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে আর এর মাধ্যমে আসাদের ২৪ বছরের শাসনকে সরু সুতার ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে।
সিরিয়ার মধ্যাঞ্চলীয় এই শহরটি থেকে সেনাবাহিনী সরে যাওয়ার পর হমসের হাজার হাজার বাসিন্দা রাস্তায় নেমে এসে নেচে নেচে ‘আসাদ চলে গেছে, হমস মুক্ত হয়েছে’ বলে শ্লোগান দেওয়া শুরু করে। তারা বলে, সিরিয়া দীর্ঘজীবী হোক! বাশার আল আসাদের পতন হোক!
এই বিজয় উদযাপন করতে বিদ্রোহীরা আকাশের দিকে গুলি ছোড়ে। যুবকরা প্রেসিডেন্ট আসাদের পোস্টারগুলো ছিঁড়ে ফেলে। বিদ্রোহীদের অগ্রগতির মুখে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো থেকে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী পিছু হটে আর এর মাধ্যমে আসাদের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ধসে পড়ে।
হমসের দখল বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাওয়ার পর তারা সিরিয়ার কৌশলগত মধ্যাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে আর দেশটির মহাসড়ক নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি তাদের অধিকারে যায়। এর ফলে দামেস্ক আসাদের আলাউইতি সম্প্রদায়ের শক্তিকেন্দ্র সিরিয়ার উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিদ্রোহীদের প্রধান উপদল জঙ্গি গোষ্ঠী তাহরির আল-শামের কমান্ডার আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি হমসের দখলকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন। বিদ্রোহীদের এই প্রধান নেতা যোদ্ধাদের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা অস্ত্র ফেলে দিয়েছে তাদের আঘাত করবেন না।
পরে দামেস্কের উপকণ্ঠে আসাদের প্রয়াত বাবা দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের একটি মূর্তি ফেলে দিয়ে সেটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিদ্রোহীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিরিয়ার পুরো দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।