
* সীমান্তে বিজিবি বিএসএফ সতর্ক * আগরতলায় বাংলাদেশের কনস্যুলার সেবা বন্ধ * বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় আটক ৭, তিন পুলিশ বরখাস্ত * সিলেটের ৩ বন্দর স্টেশন দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ * ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদার
হাবিবুর রহমান ও জাহাঙ্গীর খান বাবু
বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায় চার মাস ধরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে আসছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া বইছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস নামের একজন পুরোহিতকে গ্রেফতারের পর উত্তাপ আরও ছড়ায়। চট্টগ্রামে সৃষ্ট উত্তাপ ঢাকা থেকে দিল্লি পর্যন্ত গড়ায়। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-দিল্লি রীতিমতো টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। সেই টানাপোড়েন থেকে এখন দুই দেশের মধ্যে তৈরি হয়েছে তিক্ততা। গত দু’দিনের ব্যবধানে কলকাতা ও আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলা, ভাংচুর ও পতাকা পোড়ানোর ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এতে করে দুই দেশের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার পর কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, নিরাপত্তার কারণে আপাতত আগরতলার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে কনস্যুলার সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে ওই মিশন থেকে বাংলাদেশের ভিসা সেবা বন্ধ থাকবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তাহীনতাজনিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে সকল প্রকার ভিসা ও কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
গত সোমবার দুপুরে আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা হয়। সেখানে হামলা, ভাঙচুর, ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ভেঙে বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক জাতীয় পতাকা খুলে নিয়ে পোড়ানোর নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় ৭ ভারতীয় নাগরিককে আটক করেছে ত্রিপুরা পুলিশ। এছাড়া হাইকমিশনে হামলার সময় দায়িত্বে অবহেলার দায়ে পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
আগরতলার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি নামের একটি সংগঠনের ব্যানারেই সেখানে হামলা ও তাণ্ডবের সময় এই ভাঙচুর ও হাইকমিশন অফিসের পতাকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভের নামে হাইকমিশনের সামনে জড়ো হওয়ার পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে একটি দল বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। তবে একপর্যায়ে ওই গ্রুপের কিছু সদস্য নিরাপত্তা বেষ্টনী ডিঙ্গিঁয়ে, হাইকমিশন চত্বরে প্রবেশ করে এবং ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অপমান করে।
পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) কিরণ কুমার বলেছেন, বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তিনি নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন। কিরণ কুমার আরও বলেছেন, আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়েছি এবং একজন ডিওয়াইএসপিকে পুলিশ সদর দফতরে স্থানান্তর করার পাশাপাশি তিনজন সাব-ইন্সপেক্টরকে বরখাস্ত করেছি। একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় আরও তদন্ত চলছে। এছাড়াও আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগরতলা সার্কিট হাউসে গান্ধী মূর্তির সামনে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিল। দুর্ভাগ্যবশত, কিছু ব্যক্তি জোরপূর্বক বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের প্রাঙ্গণে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য কিন্তু এ ধরনের আচরণ একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত।
এদিকে কোনো নির্দিষ্ট একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যাবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলবে সাড়া দিয়ে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ অভিমত ব্যক্ত করেন হাইকমিশনার। এসময় প্রণয় ভার্মা বলেন, কোনো নির্দিষ্ট একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যাবে না। আমরা আমাদের আলোচনা চলমান রাখব। আজকের বৈঠক তারই একটা অংশ। আমাদের বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে, পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আমরা একটি ইস্যু দিয়ে সেটি মূল্যায়ন করতে পারব না। আমাদের পরস্পর নির্ভরতার বিষয় রয়েছে। যেটি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ দুই মাসে আমাদের পারষ্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের অনেক ইতিবাচক বিষয় রয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করে যাব। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদে দেশটির হাইকমিশনারকে তলব করা হয়। ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে প্রায় আধা ঘন্টা বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। গতকাল বিকেল চারটার কিছু আগে প্রণয় ভার্মা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশের পর সেখানকার বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে গত সোমবার হামলা চালায় একদল উগ্র হিন্দু। তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নামিয়ে এনে ছিঁড়ে ফেলে এবং মিশনের সাইনবোর্ড ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় ভারত সরকার দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে সহকারী হাইকমিশনে ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছে বাংলাদেশ। সরকার বলেছে, এ ঘটনা পরিকল্পিত এবং ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অপরদিকে, ভারতের লোকজনের বাধা ও পণ্য পরিবহন জটিলতায় সিলেটের স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে শেওলা স্থলবন্দর ও জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে কোনো পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। এর আগে সোমবার জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে কিছু কমলা আমদানি হলেও আর কোনো পণ্য আমদানি বা রফতানির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, পাথরবাহী ট্রাকে কাদামাটি ও আবর্জনা এবং ‘ওয়েট স্কেলে’ ওজন জটিলতার কারণে ১৬ দিন ধরে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে পাথর-কয়লা আমদানি বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে সিলেটের দু’টি স্থলবন্দর ও একটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। তবে সিলেটের ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে পাথর আমদানি স্বাভাবিক আছে। তবে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি। ভারত থেকে পণ্য না আসায় বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে শেওলা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের ইনচার্জ ইমরান মাতব্বর বলেন, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু আমদানি-রফতানি বন্ধ। তবে গত সোমবার আমদানি-রফতানি অনেকটা স্বাভাবিক ছিল।
জকিগঞ্জ স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফুদ্দিন বলেন, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে এই স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে কোনো পণ্য আসেনি। গত সোমবার সকালে দুই দফায় ৬ টনের মতো পণ্য আসছিল। এরপরে আর কোনো পণ্য আসেনি। তিনি বলেন, এই স্টেশন দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পণ্য কম আসে। বন্দরের দাফতরিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। ওপার (ভারত) থেকে পণ্য এলে আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা শুল্কায়ন করবো।
তবে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি নামের এক সংগঠন। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে ভারতীয় দূতাবাসের আশপাশের বিভিন্ন রাস্তায় অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বিশেষ করে রাজধানীর শাহজাদপুর বাঁশতলায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে। বাঁশতলা থেকে ভারতীয় দূতাবাসগামী রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের পুলিশ সদস্যরা। তাদের পেছনে রয়েছে এপিবিএন সদস্যরা। এছাড়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশতলা থেকে ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখী রাস্তায় কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের যেতে দেয়া হলেও তাদের করা হচ্ছে তল্লাশি। এ বিষয়ে গুলশান বিভাগ পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগরতলায় ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনার প্রতিবাদে একটি সংগঠন ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এরপর পরবর্তীতে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তারেক মাহমুদ বলেন, গত সোমবার আগরতলায় যে হামলার ঘটনা ঘটেছে এর প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি নামে একটি সংগঠন মঙ্গলবার ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এই পেক্ষিতে দূতাবাস এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভারতের জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগ এনে ত্রিপুরার আগরতলায় হাসপাতাল, কলকাতার একটি হাসপাতাল ও দুই-একজন চিকিৎসক বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ত্রিপুরায় বাংলাদেশিদের কোন আবাসিক হোটেলে রুম ভাড়া দেয়া হবে না বলেও জানিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। এরফলে উভয় দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলে আসছিল, এরমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানান। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও অসন্তোষ জানিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চলে আসছিল। তবে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর গ্রেফতারের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে অস্বস্তি শুরু হয়। চিন্ময় দাসকে গ্রেফতারের পর প্রথমে ভারতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়া হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অপরাধীরা যেখানে ধরাছোঁয়ার বাইরে সেখানে একজন ধর্মীয় নেতা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন কথা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা বিবৃতি দিয়ে বলে, ভারতের এ ধরনের ভিত্তিহীন বিবৃতি শুধু ভুল তথ্য ছড়ানো নয় বরং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়ার চেতনার পরিপন্থি। এরপর ২৮ নভেম্বর কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনের সামনে বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশের ব্যারিকেড ভেঙে মিশনে হামলার চেষ্টা চালায় ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা পোড়ায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার পরদিন ২৯ নভেম্বর ঢাকা বিবৃতি দিয়ে কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে ভারতের সব বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তার আহ্বান জানানো হয়। এরপর ২ ডিসেম্বর আগরতলার বাংলাদেশ মিশনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকে উগ্রবাদী সংগঠন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি। সংগঠনের সদস্যরা ব্যারিকেড ভেঙে মিশনে হামলা চালায় এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অবমাননা করে। ঘটনার প্রেক্ষিতে ভারত সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে যথাযথ তদন্ত দাবি করেছে। এ ছাড়া চলমান ঘটনার প্রেক্ষিতে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন সময়ে বলে আসছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সংখ্যালঘুদের নিয়ে যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্তি না ছড়ায়, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে ২ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে ব্রিফ করেন তিনি। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যখন ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফ করছিলেন, ঠিক তখনই আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনা ঘটছিল। চলতি ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারত ফরেন অফিস কনসালটেশনের (এফওসি) আয়োজন চলছে। এতে যোগ দিতে আসার কথা রয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের। তবে চলমান পরিস্থিতিতে এফওসি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে প্রকৃতপক্ষেই দুই দেশের সম্পর্কে সমস্যা চলছে। এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তবে আমরা স্বাভাবিক, ভালো ও সুসম্পর্ক চাই। এই সম্পর্ক অন্তরের চেয়ে স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক স্বার্থের মধ্য দিয়েই দেখতে হবে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি কিংবা অপতৎপরতা রোধে বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সতর্ক রয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, কোনো এক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। এখন যদি সেই সম্পর্ক উন্নত হয়, তবে আমাদের সবাইকে খুশি হওয়া উচিত। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। পাকিস্তানের সঙ্গে শত্রুতা করে কোনো লাভ নেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যদি কেউ মনে করে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে, তবে তা দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টায় মিটিয়ে নেয়া উচিত। সম্পর্ক মানুষকেন্দ্রিক হতে হবে এবং এমনভাবে গড়ে উঠতে হবে যেন জনগণও তা অনুভব করে।
হাবিবুর রহমান ও জাহাঙ্গীর খান বাবু
বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায় চার মাস ধরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে আসছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া বইছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস নামের একজন পুরোহিতকে গ্রেফতারের পর উত্তাপ আরও ছড়ায়। চট্টগ্রামে সৃষ্ট উত্তাপ ঢাকা থেকে দিল্লি পর্যন্ত গড়ায়। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-দিল্লি রীতিমতো টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। সেই টানাপোড়েন থেকে এখন দুই দেশের মধ্যে তৈরি হয়েছে তিক্ততা। গত দু’দিনের ব্যবধানে কলকাতা ও আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলা, ভাংচুর ও পতাকা পোড়ানোর ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এতে করে দুই দেশের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার পর কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, নিরাপত্তার কারণে আপাতত আগরতলার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে কনস্যুলার সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে ওই মিশন থেকে বাংলাদেশের ভিসা সেবা বন্ধ থাকবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তাহীনতাজনিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে সকল প্রকার ভিসা ও কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
গত সোমবার দুপুরে আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা হয়। সেখানে হামলা, ভাঙচুর, ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ভেঙে বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক জাতীয় পতাকা খুলে নিয়ে পোড়ানোর নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় ৭ ভারতীয় নাগরিককে আটক করেছে ত্রিপুরা পুলিশ। এছাড়া হাইকমিশনে হামলার সময় দায়িত্বে অবহেলার দায়ে পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
আগরতলার বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি নামের একটি সংগঠনের ব্যানারেই সেখানে হামলা ও তাণ্ডবের সময় এই ভাঙচুর ও হাইকমিশন অফিসের পতাকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভের নামে হাইকমিশনের সামনে জড়ো হওয়ার পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে একটি দল বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। তবে একপর্যায়ে ওই গ্রুপের কিছু সদস্য নিরাপত্তা বেষ্টনী ডিঙ্গিঁয়ে, হাইকমিশন চত্বরে প্রবেশ করে এবং ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অপমান করে।
পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) কিরণ কুমার বলেছেন, বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তিনি নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন। কিরণ কুমার আরও বলেছেন, আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়েছি এবং একজন ডিওয়াইএসপিকে পুলিশ সদর দফতরে স্থানান্তর করার পাশাপাশি তিনজন সাব-ইন্সপেক্টরকে বরখাস্ত করেছি। একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় আরও তদন্ত চলছে। এছাড়াও আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগরতলা সার্কিট হাউসে গান্ধী মূর্তির সামনে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিল। দুর্ভাগ্যবশত, কিছু ব্যক্তি জোরপূর্বক বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের প্রাঙ্গণে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য কিন্তু এ ধরনের আচরণ একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত।
এদিকে কোনো নির্দিষ্ট একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যাবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলবে সাড়া দিয়ে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ অভিমত ব্যক্ত করেন হাইকমিশনার। এসময় প্রণয় ভার্মা বলেন, কোনো নির্দিষ্ট একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যাবে না। আমরা আমাদের আলোচনা চলমান রাখব। আজকের বৈঠক তারই একটা অংশ। আমাদের বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে, পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আমরা একটি ইস্যু দিয়ে সেটি মূল্যায়ন করতে পারব না। আমাদের পরস্পর নির্ভরতার বিষয় রয়েছে। যেটি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ দুই মাসে আমাদের পারষ্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের অনেক ইতিবাচক বিষয় রয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করে যাব। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদে দেশটির হাইকমিশনারকে তলব করা হয়। ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে প্রায় আধা ঘন্টা বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। গতকাল বিকেল চারটার কিছু আগে প্রণয় ভার্মা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশের পর সেখানকার বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে গত সোমবার হামলা চালায় একদল উগ্র হিন্দু। তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নামিয়ে এনে ছিঁড়ে ফেলে এবং মিশনের সাইনবোর্ড ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় ভারত সরকার দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে সহকারী হাইকমিশনে ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছে বাংলাদেশ। সরকার বলেছে, এ ঘটনা পরিকল্পিত এবং ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অপরদিকে, ভারতের লোকজনের বাধা ও পণ্য পরিবহন জটিলতায় সিলেটের স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে শেওলা স্থলবন্দর ও জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে কোনো পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। এর আগে সোমবার জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে কিছু কমলা আমদানি হলেও আর কোনো পণ্য আমদানি বা রফতানির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, পাথরবাহী ট্রাকে কাদামাটি ও আবর্জনা এবং ‘ওয়েট স্কেলে’ ওজন জটিলতার কারণে ১৬ দিন ধরে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে পাথর-কয়লা আমদানি বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে সিলেটের দু’টি স্থলবন্দর ও একটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। তবে সিলেটের ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে পাথর আমদানি স্বাভাবিক আছে। তবে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি। ভারত থেকে পণ্য না আসায় বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে শেওলা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের ইনচার্জ ইমরান মাতব্বর বলেন, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু আমদানি-রফতানি বন্ধ। তবে গত সোমবার আমদানি-রফতানি অনেকটা স্বাভাবিক ছিল।
জকিগঞ্জ স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফুদ্দিন বলেন, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে এই স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে কোনো পণ্য আসেনি। গত সোমবার সকালে দুই দফায় ৬ টনের মতো পণ্য আসছিল। এরপরে আর কোনো পণ্য আসেনি। তিনি বলেন, এই স্টেশন দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পণ্য কম আসে। বন্দরের দাফতরিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। ওপার (ভারত) থেকে পণ্য এলে আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা শুল্কায়ন করবো।
তবে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি নামের এক সংগঠন। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে ভারতীয় দূতাবাসের আশপাশের বিভিন্ন রাস্তায় অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বিশেষ করে রাজধানীর শাহজাদপুর বাঁশতলায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে। বাঁশতলা থেকে ভারতীয় দূতাবাসগামী রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের পুলিশ সদস্যরা। তাদের পেছনে রয়েছে এপিবিএন সদস্যরা। এছাড়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশতলা থেকে ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখী রাস্তায় কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের যেতে দেয়া হলেও তাদের করা হচ্ছে তল্লাশি। এ বিষয়ে গুলশান বিভাগ পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগরতলায় ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনার প্রতিবাদে একটি সংগঠন ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এরপর পরবর্তীতে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তারেক মাহমুদ বলেন, গত সোমবার আগরতলায় যে হামলার ঘটনা ঘটেছে এর প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি নামে একটি সংগঠন মঙ্গলবার ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এই পেক্ষিতে দূতাবাস এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভারতের জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগ এনে ত্রিপুরার আগরতলায় হাসপাতাল, কলকাতার একটি হাসপাতাল ও দুই-একজন চিকিৎসক বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ত্রিপুরায় বাংলাদেশিদের কোন আবাসিক হোটেলে রুম ভাড়া দেয়া হবে না বলেও জানিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। এরফলে উভয় দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলে আসছিল, এরমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানান। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও অসন্তোষ জানিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চলে আসছিল। তবে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর গ্রেফতারের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে অস্বস্তি শুরু হয়। চিন্ময় দাসকে গ্রেফতারের পর প্রথমে ভারতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়া হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অপরাধীরা যেখানে ধরাছোঁয়ার বাইরে সেখানে একজন ধর্মীয় নেতা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন কথা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টা বিবৃতি দিয়ে বলে, ভারতের এ ধরনের ভিত্তিহীন বিবৃতি শুধু ভুল তথ্য ছড়ানো নয় বরং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়ার চেতনার পরিপন্থি। এরপর ২৮ নভেম্বর কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনের সামনে বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশের ব্যারিকেড ভেঙে মিশনে হামলার চেষ্টা চালায় ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা পোড়ায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার পরদিন ২৯ নভেম্বর ঢাকা বিবৃতি দিয়ে কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে ভারতের সব বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তার আহ্বান জানানো হয়। এরপর ২ ডিসেম্বর আগরতলার বাংলাদেশ মিশনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকে উগ্রবাদী সংগঠন হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি। সংগঠনের সদস্যরা ব্যারিকেড ভেঙে মিশনে হামলা চালায় এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অবমাননা করে। ঘটনার প্রেক্ষিতে ভারত সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে যথাযথ তদন্ত দাবি করেছে। এ ছাড়া চলমান ঘটনার প্রেক্ষিতে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন সময়ে বলে আসছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সংখ্যালঘুদের নিয়ে যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্তি না ছড়ায়, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে ২ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে ব্রিফ করেন তিনি। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যখন ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফ করছিলেন, ঠিক তখনই আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনা ঘটছিল। চলতি ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারত ফরেন অফিস কনসালটেশনের (এফওসি) আয়োজন চলছে। এতে যোগ দিতে আসার কথা রয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের। তবে চলমান পরিস্থিতিতে এফওসি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে প্রকৃতপক্ষেই দুই দেশের সম্পর্কে সমস্যা চলছে। এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তবে আমরা স্বাভাবিক, ভালো ও সুসম্পর্ক চাই। এই সম্পর্ক অন্তরের চেয়ে স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক স্বার্থের মধ্য দিয়েই দেখতে হবে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি কিংবা অপতৎপরতা রোধে বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সতর্ক রয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, কোনো এক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। এখন যদি সেই সম্পর্ক উন্নত হয়, তবে আমাদের সবাইকে খুশি হওয়া উচিত। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। পাকিস্তানের সঙ্গে শত্রুতা করে কোনো লাভ নেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যদি কেউ মনে করে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে, তবে তা দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টায় মিটিয়ে নেয়া উচিত। সম্পর্ক মানুষকেন্দ্রিক হতে হবে এবং এমনভাবে গড়ে উঠতে হবে যেন জনগণও তা অনুভব করে।