
দেশে বিগত ১১ বছরে ৬০ হাজার ৯৮০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৩৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে ‘সড়ক সেক্টরে সীমাহীন অব্যবস্থাপনা: দায়িত্ব নেবে কে?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিগত সরকারের ১১ বছরের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত প্রতিবেদনে আহত ও নিহতের তথ্য উঠে আসে। ওই সভায় সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, সড়ক সেক্টরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, চরম অব্যবস্থাপনা, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে বিগত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই দুর্ঘটনা এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে ২০ হাজার ১২৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৫৩ জন, যা মোট নিহতের ৩৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৬ হাজার ১৬৭ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ বছরে সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৮৫ জনের মধ্যে ৭৫ হাজার ৮৮৪ জনের পরিচয় মিলেছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৯২৮ জন চালক, ১৭ হাজার ১৫০ জন পথচারী, ৭ হাজার ৩৩২ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮ হাজার ৮০১ জন শিক্ষার্থী, ১ হাজার ৫৯৩ জন শিক্ষক, ৫১৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১২ হাজার ১০৯ জন নারী, ৮ হাজার ৬৭ জন শিশু, ৫৫৯ জন সাংবাদিক, ৪৩০ জন চিকিৎসক, ২৯৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৫৫ জন শিল্পী, ৩৬১ জন আইনজীবী, ৩৩০ জন প্রকৌশলী এবং ৩ হাজার ৪১৬ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। ১১ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৮ হাজার ১২৭টি যানবাহনের পরিচয় গণমাধ্যমে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫৪৯টি ট্রাক, পিকআপ, লরি ও কাভার্ডভ্যান, ২০ হাজার ১২৪টি মোটরসাইকেল, ১৫ হাজার ৩০১টি বাস, ৮ হাজার ২১৫টি নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা, ৯ হাজার ৪৪টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ৯ হাজার ৩১২টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক, ৫ হাজার ৫৮২টি কার-জিপ-মাইক্রোবাস সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২২ দশমিক ৫৪ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এছাড়াও সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ৮২ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে। মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দেশের ইতিহাসে সড়ক মন্ত্রণালয়ের এক যুগেরও বেশি সময়ের মন্ত্রী হিসেবে ওবায়দুল কাদের পরিবহনে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য, সড়কে চাঁদাবাজি, মানসম্মত গণপরিবহন নামানো, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে চরমভাবে ব্যর্থতার কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পরিবর্তনের পরও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএতে ওবায়দুল কাদেরের প্রেতাত্মারা পদে পদে বসে আছে। এখনও তারা সড়কে গণহত্যা বন্ধ, যানজট ও দুর্ঘটনা কমানো, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সড়কের চাঁদাবাজরা পালিয়েছে, জ¦ালানি তেলের দাম কমেছে কিন্তু পরিবহন ভাড়া কমছে না। পণ্যমূল্য কমছে না। তিনি বলেন, সড়ক মন্ত্রণালয়, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাবেক সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরেরর আশীর্বাদপুষ্ট কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তারা মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে পকেটে নিয়ে ঘোরেন। এখানও সেই ধারা অব্যহত রয়েছে। তারা বিগত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর। মোজাম্মেল হক বলেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে ভয়াবহ যানজট ও বিশৃঙ্খলা থামাতে না পারলে বর্তমান সরকারকে ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে। পরিবহন খাত জঞ্জালমুক্ত করতে হলে এই খাতের আপদমস্তক সংস্কার প্রয়োজন। অন্যান্য জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ খাতের মতো পরিবহন খাত সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি। বছরভিত্তিক যাত্রী কল্যাণ সমিতির এই প্রতিবেদনগুলো নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের জেল-জুলুম, মামলা-হামলাসহ নানামুখী হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। কখনও কখনও যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধের জন্য নানাভাবে চাপ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বন্ধে তৎকালীন সড়ক মন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া কার্যকর অর্থে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে আলোচনা সভায় উঠে আসে। এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন- গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণপরিবহন বিশ্লেষক আবদুল হক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, যাত্রী কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি তাওহিদুল হক লিটন, প্রচার সম্পাদক মাহামুদুল হাসান রাসেল প্রমুখ।