
হিজবুল্লাহর হামলায় ২ ইসরায়েলি সেনা নিহত
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা
লেবাননে ঢুকেই পিছু হটেছে ইসরায়েলি সেনারা
সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলের বেশ কিছু সেনা। তবে তারা মাত্র ৪০০ মিটার যাওয়ার পরই আবার পিছু হটেছে
* হিজবুল্লাহর সুপরিকল্পিত হামলা
* ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বাড়ছে
* ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি
* হুতিদের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
* জাতিসংঘের আহ্বান উপেক্ষিত
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গতকাল বুধবার লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অতর্কিত হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৮ জন। হামলাটি লেবাননের সীমান্তবর্তী শহর ওদাইসেতে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে চালানো হয়। ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহর সুপরিকল্পিত আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলের বেশ কিছু সেনা। তবে তারা মাত্র ৪০০ মিটার যাওয়ার পরই আবার পিছু হটেছে।
ইসরায়েলি বাহিনী শহরটিতে প্রবেশের আগে ব্যাপক কামান হামলা চালায়। তবে হিজবুল্লাহর আক্রমণ এতই শক্তিশালী ছিল যে, ইসরায়েলি সেনারা দ্রুত আক্রমণ বন্ধ করে পিছু হটে যায়। আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল জানে যে লেবাননে স্থল হামলা চালানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। গাজায় তারা সহজেই প্রবেশ করতে পারলেও লেবাননের ভূখণ্ডে হামলা চালানো অনেক বেশি কঠিন। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক লেবাননে হামলার ঘোষণার পর হিজবুল্লাহর সঙ্গে এটিই তাদের প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো স্থল হামলা প্রতিহত করার জন্য ভালোভাবেই প্রস্তুত। তারা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের পক্ষে লড়াই করে যুদ্ধের ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই যোদ্ধারা সরাসরি সংঘর্ষে প্রশিক্ষিত এবং তাদের অঞ্চলে তারা নিজেদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। এ কারণেই ইসরায়েল লেবাননে স্থল হামলা চালাতে গেলে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে।
এদিকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনাও চরম আকার ধারণ করেছে। গত মঙ্গলবার ইরান ইসরায়েলের ডিমোনা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রসহ কৌশলগত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সমন্বয়ে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও ইসরায়েল এই হামলাকে বড় ধরনের উস্কানি হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে ইরান তাদের প্রতিপক্ষকে বোঝাতে চেয়েছে যে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ কার্যকর নয়।
ইরানের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি গতকাল বুধবার এক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইসরায়েল প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে ইরান আরও শক্তিশালী আক্রমণ করবে। তিনি জানান, ইসরায়েল জুড়ে সব স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইরান বড় ধরনের ভুল করেছে এবং তাদের এই ভুলের জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের শত্রুরা যেন ভালোভাবে বুঝতে পারে, প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েল কোনো প্রকার দ্বিধা করবে না।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এই উত্তেজনার মধ্যেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হুতিদের দাবি, তাদের ছোঁড়া কুদস-৫ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ইসরায়েলের ভেতরে আঘাত হেনেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হুতিদের এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও তীব্রতর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বন্দরে হামলা চালিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে হুতিরা এই আক্রমণ চালিয়েছে। এর আগেও তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে। হুতিরা ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইসরায়েল তার এই আহ্বানকে উপেক্ষা করে গুতেরেসকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জাতিসংঘের মহাসচিবের সমালোচনা করে বলেন, গুতেরেস ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এজন্য তাকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনা শুধু দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসরায়েল যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালায়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। ইরান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি তেল সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটবে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তা গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
অপরদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলের বেশ কিছু সেনা। তবে তারা মাত্র ৪০০ মিটার যাওয়ার পরই আবার পিছু হটেছে।
লেবাননের সেনাবাহিনী বুধবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে। তারা বলেছে, ইসরায়েলি শত্রুদের একটি দল খিরবেত ইয়ারুন এবং আয়েদেস এলাকা দিয়ে ব্লু লাইন পার হয়ে লেবাননের প্রায় ৪০০ মিটার ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু কিছুক্ষণ অবস্থানের পরই তারা আবার পিছু হটেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) কাছে এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তবে তারা কোনো বক্তব্য দেয়নি। আইডিএফ অবশ্য একটি ছবি প্রকাশ করেছে। ছবিটি যাচাই-বাছাই করে সিএনএন নিশ্চিত হয়েছে এটি দক্ষিণ লেবাননে তোলা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, লেবাননের ভেতর ঢোকার চেষ্টাকালে হিজবুল্লাহর ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল ইসরায়েলি সেনারা। এরমধ্যে ওদাইসে শহরে ২ সেনা নিহত ও ১৮ জন আহত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আহত সেনাদের সরিয়ে নেয়ার কাজ করা হচ্ছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, আহত ওই সেনাদের হেলিকপ্টারে হাইফার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছিল। এছাড়া একই সময় ওই এলাকার তিনটি হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েল জানে লেবাননে তাদের স্থল হামলা খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে। ফিলিস্তিনের গাজায় তারা সহজে ঢুকে পড়তে পারলেও লেবাননের ভেতরে প্রবেশ করতে তাদের সেনাদের বেগ পেতে হবে। কারণ হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের তৈরিই করা হয়েছে এমন স্থল হামলার জন্য। তারা এক্ষেত্রে বেশ প্রশিক্ষিত। এছাড়া হিজবুল্লাহর এসব যোদ্ধার সরাসরি যুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে। তারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের হয়ে সুন্নি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, ওদাইসেতে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহ যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে এটিকে তাদের একটি বিজয় হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ এই হামলার পর ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। অথচ শহরটিতে প্রবেশের আগে সেখানে ব্যাপক কামান হামলা চালিয়েছিল তারা।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতে গত মঙ্গলবার আরও শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের বিমানবাহিনী। হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ এই হামলা চালানোর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক্সে পোস্ট দিয়ে বৈরুতের বাসিন্দাদের সতর্ক করে দেয়। পোস্টটিতে বলা হয়, হামলার জন্য যে এলাকা লক্ষ্য করা হয়েছে সেখান থেকে বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। তবে মিসাইল হামলার জবাবে ইরানে যে কোনো সময় হামলা চালাবে দখলদার ইসরায়েল। আর এই হামলার পরিধি বড় হবে বলে জানিয়েছেন এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা। হামলায় ইরানের তেল উৎপাদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এক্সিওসকে এসব তথ্য জানিয়ে ইসরায়েলের এই কর্মকর্তা বলেছেন, হামলা হবে কয়েকদিনের মধ্যে। গত মঙ্গলবার দখলদার ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রায় ২০০টি মিসাইল ছোড়ে ইরান। হামাসের সাবেক প্রধান ইসমাইল হানিয়া, হিজবুল্লাহর সাবেক প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ এবং নিজেদের এক কমান্ডারকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এত বড় হামলা চালায় ইরান।
দখলদার ইসরায়েলের অপর এক কর্মকর্তা এক্সিওসকে জানিয়েছেন, তাদের হামলার পর ইরান যদি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে আবারও মিসাইল ছোড়ে তাহলে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলাসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে। তিনি বলেন, আমাদের হামলার জবাবে ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। আমরা বিবেচনায় রাখছি তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। তবে তখন এটি পুরোপুরি আলাদা বলের খেলা হবে। গত মঙ্গলবারের মিসাইল হামলায় দখলদার ইসরায়েলের একাধিক বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে ইরান। এরমধ্যে নেভাতিম বিমান ঘাঁটি প্রায় অচল করে দিয়েছে তেহরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, এই ঘাঁটিতে ইরানের কয়েক ডজন মিসাইল পড়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে তারা। এছাড়া ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হেডঅফিস লক্ষ্য করেও হামলা চালায় ইরান। তবে সরাসরি অফিসে মিসাইল না ছুড়ে পাশে সেগুলো ফেলে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। দখলদার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বুধবার এই ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, গুতেরেসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে কারণ তিনি ইরানের মিসাইল হামলার নিন্দা জানাননি। তিনি বলেছেন, গত মঙ্গলবার ইরান ইসরায়েলে যে হামলা চালিয়েছে সেটির পর্যাপ্ত নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। এ কারণে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ইসরায়েলে প্রবেশ করতে পারবেন না। দখলদার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আরও বলেছেন, গুতেরেস একজন ‘ইসরায়েল বিদ্বেষী’, তিনি ‘সন্ত্রাসী, ধর্ষক এবং হত্যাকারীদের’ সমর্থন করেন। গুতেরসকে আগামী কয়েক প্রজন্ম জাতিসংঘের কলঙ্ক হিসেবে মনে রাখবে। যদিও মঙ্গলবার রাতে ইরান ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে এর নিন্দা জানান জাতিসংঘের মহাসচিব। এছাড়া আবারও যুদ্ধবিরতির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এক রাতে ১৮১টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় ইরানের প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, যদি সত্যিই ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বেঁধে যায়, তাহলে ইসরায়েলের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার রাতের হামলার পর বুধবার সকালে এক বিবৃতিতে লয়েড অস্টিন বলেন, আমরা ইরানের এই ভয়াবহ আগ্রাসী হামলার নিন্দা জানাচ্ছি এবং ইরান এবং তার সমর্থনপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েলে আর কোনো হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ হলে সাধারণ পরিষদের উচিত হবে ১৯৫০ সালে পাস হওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী ইসরায়েলের ওপর বলপ্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এমন মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। ১৯৫০ সালে পাস হওয়া ইউনাইটিং ফর পিস রেজুলেশনে বলা আছে, নিজেদের মধ্যে মতভেদের কারণে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যদি বিশ্বশান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এগিয়ে আসতে পারে। আঙ্কারায় মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এরদোয়ান এই রেজুলেশনের কথা উল্লেখ করে বলেন, সাধারণ পরিষদের উচিত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলোর ব্যর্থতা দেখে দুঃখ পেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা
লেবাননে ঢুকেই পিছু হটেছে ইসরায়েলি সেনারা
সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলের বেশ কিছু সেনা। তবে তারা মাত্র ৪০০ মিটার যাওয়ার পরই আবার পিছু হটেছে
* হিজবুল্লাহর সুপরিকল্পিত হামলা
* ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বাড়ছে
* ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি
* হুতিদের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
* জাতিসংঘের আহ্বান উপেক্ষিত
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গতকাল বুধবার লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অতর্কিত হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৮ জন। হামলাটি লেবাননের সীমান্তবর্তী শহর ওদাইসেতে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে চালানো হয়। ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহর সুপরিকল্পিত আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলের বেশ কিছু সেনা। তবে তারা মাত্র ৪০০ মিটার যাওয়ার পরই আবার পিছু হটেছে।
ইসরায়েলি বাহিনী শহরটিতে প্রবেশের আগে ব্যাপক কামান হামলা চালায়। তবে হিজবুল্লাহর আক্রমণ এতই শক্তিশালী ছিল যে, ইসরায়েলি সেনারা দ্রুত আক্রমণ বন্ধ করে পিছু হটে যায়। আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল জানে যে লেবাননে স্থল হামলা চালানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। গাজায় তারা সহজেই প্রবেশ করতে পারলেও লেবাননের ভূখণ্ডে হামলা চালানো অনেক বেশি কঠিন। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক লেবাননে হামলার ঘোষণার পর হিজবুল্লাহর সঙ্গে এটিই তাদের প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো স্থল হামলা প্রতিহত করার জন্য ভালোভাবেই প্রস্তুত। তারা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের পক্ষে লড়াই করে যুদ্ধের ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই যোদ্ধারা সরাসরি সংঘর্ষে প্রশিক্ষিত এবং তাদের অঞ্চলে তারা নিজেদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। এ কারণেই ইসরায়েল লেবাননে স্থল হামলা চালাতে গেলে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে।
এদিকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনাও চরম আকার ধারণ করেছে। গত মঙ্গলবার ইরান ইসরায়েলের ডিমোনা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রসহ কৌশলগত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সমন্বয়ে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও ইসরায়েল এই হামলাকে বড় ধরনের উস্কানি হিসেবে দেখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে ইরান তাদের প্রতিপক্ষকে বোঝাতে চেয়েছে যে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ কার্যকর নয়।
ইরানের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি গতকাল বুধবার এক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইসরায়েল প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে ইরান আরও শক্তিশালী আক্রমণ করবে। তিনি জানান, ইসরায়েল জুড়ে সব স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইরান বড় ধরনের ভুল করেছে এবং তাদের এই ভুলের জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের শত্রুরা যেন ভালোভাবে বুঝতে পারে, প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েল কোনো প্রকার দ্বিধা করবে না।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এই উত্তেজনার মধ্যেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হুতিদের দাবি, তাদের ছোঁড়া কুদস-৫ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ইসরায়েলের ভেতরে আঘাত হেনেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হুতিদের এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও তীব্রতর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বন্দরে হামলা চালিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে হুতিরা এই আক্রমণ চালিয়েছে। এর আগেও তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে। হুতিরা ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইসরায়েল তার এই আহ্বানকে উপেক্ষা করে গুতেরেসকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জাতিসংঘের মহাসচিবের সমালোচনা করে বলেন, গুতেরেস ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এজন্য তাকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনা শুধু দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসরায়েল যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালায়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। ইরান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি তেল সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটবে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তা গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
অপরদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে লেবাননে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েলের বেশ কিছু সেনা। তবে তারা মাত্র ৪০০ মিটার যাওয়ার পরই আবার পিছু হটেছে।
লেবাননের সেনাবাহিনী বুধবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে। তারা বলেছে, ইসরায়েলি শত্রুদের একটি দল খিরবেত ইয়ারুন এবং আয়েদেস এলাকা দিয়ে ব্লু লাইন পার হয়ে লেবাননের প্রায় ৪০০ মিটার ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু কিছুক্ষণ অবস্থানের পরই তারা আবার পিছু হটেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) কাছে এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তবে তারা কোনো বক্তব্য দেয়নি। আইডিএফ অবশ্য একটি ছবি প্রকাশ করেছে। ছবিটি যাচাই-বাছাই করে সিএনএন নিশ্চিত হয়েছে এটি দক্ষিণ লেবাননে তোলা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, লেবাননের ভেতর ঢোকার চেষ্টাকালে হিজবুল্লাহর ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল ইসরায়েলি সেনারা। এরমধ্যে ওদাইসে শহরে ২ সেনা নিহত ও ১৮ জন আহত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আহত সেনাদের সরিয়ে নেয়ার কাজ করা হচ্ছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, আহত ওই সেনাদের হেলিকপ্টারে হাইফার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছিল। এছাড়া একই সময় ওই এলাকার তিনটি হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েল জানে লেবাননে তাদের স্থল হামলা খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে। ফিলিস্তিনের গাজায় তারা সহজে ঢুকে পড়তে পারলেও লেবাননের ভেতরে প্রবেশ করতে তাদের সেনাদের বেগ পেতে হবে। কারণ হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের তৈরিই করা হয়েছে এমন স্থল হামলার জন্য। তারা এক্ষেত্রে বেশ প্রশিক্ষিত। এছাড়া হিজবুল্লাহর এসব যোদ্ধার সরাসরি যুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে। তারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের হয়ে সুন্নি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, ওদাইসেতে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহ যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে এটিকে তাদের একটি বিজয় হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ এই হামলার পর ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। অথচ শহরটিতে প্রবেশের আগে সেখানে ব্যাপক কামান হামলা চালিয়েছিল তারা।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতে গত মঙ্গলবার আরও শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের বিমানবাহিনী। হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ এই হামলা চালানোর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক্সে পোস্ট দিয়ে বৈরুতের বাসিন্দাদের সতর্ক করে দেয়। পোস্টটিতে বলা হয়, হামলার জন্য যে এলাকা লক্ষ্য করা হয়েছে সেখান থেকে বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। তবে মিসাইল হামলার জবাবে ইরানে যে কোনো সময় হামলা চালাবে দখলদার ইসরায়েল। আর এই হামলার পরিধি বড় হবে বলে জানিয়েছেন এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা। হামলায় ইরানের তেল উৎপাদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এক্সিওসকে এসব তথ্য জানিয়ে ইসরায়েলের এই কর্মকর্তা বলেছেন, হামলা হবে কয়েকদিনের মধ্যে। গত মঙ্গলবার দখলদার ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রায় ২০০টি মিসাইল ছোড়ে ইরান। হামাসের সাবেক প্রধান ইসমাইল হানিয়া, হিজবুল্লাহর সাবেক প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ এবং নিজেদের এক কমান্ডারকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এত বড় হামলা চালায় ইরান।
দখলদার ইসরায়েলের অপর এক কর্মকর্তা এক্সিওসকে জানিয়েছেন, তাদের হামলার পর ইরান যদি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে আবারও মিসাইল ছোড়ে তাহলে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলাসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে। তিনি বলেন, আমাদের হামলার জবাবে ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। আমরা বিবেচনায় রাখছি তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। তবে তখন এটি পুরোপুরি আলাদা বলের খেলা হবে। গত মঙ্গলবারের মিসাইল হামলায় দখলদার ইসরায়েলের একাধিক বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে ইরান। এরমধ্যে নেভাতিম বিমান ঘাঁটি প্রায় অচল করে দিয়েছে তেহরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, এই ঘাঁটিতে ইরানের কয়েক ডজন মিসাইল পড়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে তারা। এছাড়া ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হেডঅফিস লক্ষ্য করেও হামলা চালায় ইরান। তবে সরাসরি অফিসে মিসাইল না ছুড়ে পাশে সেগুলো ফেলে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। দখলদার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বুধবার এই ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, গুতেরেসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে কারণ তিনি ইরানের মিসাইল হামলার নিন্দা জানাননি। তিনি বলেছেন, গত মঙ্গলবার ইরান ইসরায়েলে যে হামলা চালিয়েছে সেটির পর্যাপ্ত নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। এ কারণে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি ইসরায়েলে প্রবেশ করতে পারবেন না। দখলদার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আরও বলেছেন, গুতেরেস একজন ‘ইসরায়েল বিদ্বেষী’, তিনি ‘সন্ত্রাসী, ধর্ষক এবং হত্যাকারীদের’ সমর্থন করেন। গুতেরসকে আগামী কয়েক প্রজন্ম জাতিসংঘের কলঙ্ক হিসেবে মনে রাখবে। যদিও মঙ্গলবার রাতে ইরান ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে এর নিন্দা জানান জাতিসংঘের মহাসচিব। এছাড়া আবারও যুদ্ধবিরতির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এক রাতে ১৮১টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় ইরানের প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, যদি সত্যিই ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বেঁধে যায়, তাহলে ইসরায়েলের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার রাতের হামলার পর বুধবার সকালে এক বিবৃতিতে লয়েড অস্টিন বলেন, আমরা ইরানের এই ভয়াবহ আগ্রাসী হামলার নিন্দা জানাচ্ছি এবং ইরান এবং তার সমর্থনপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েলে আর কোনো হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদ ব্যর্থ হলে সাধারণ পরিষদের উচিত হবে ১৯৫০ সালে পাস হওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী ইসরায়েলের ওপর বলপ্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এমন মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। ১৯৫০ সালে পাস হওয়া ইউনাইটিং ফর পিস রেজুলেশনে বলা আছে, নিজেদের মধ্যে মতভেদের কারণে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যদি বিশ্বশান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এগিয়ে আসতে পারে। আঙ্কারায় মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এরদোয়ান এই রেজুলেশনের কথা উল্লেখ করে বলেন, সাধারণ পরিষদের উচিত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলোর ব্যর্থতা দেখে দুঃখ পেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।