
পূর্বাঞ্চলে বন্যার পানি কমে গেলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনীর বেশ কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দারা এখনও পানির সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকে বাড়ি ফিরেছে খালি হাতে। গিয়ে দেখতে পাচ্ছে, সব ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। দুর্গম এলাকাগুলোয় ত্রাণের সংকট রয়েছে। পানির তোড়ে অনেকে এলাকায় সড়ক ধসে গেছে। এতে যান চলাচল করতে পারছে না অনেক এলাকায়।
পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষতির চিত্র উঠে আসতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুসারে শুধু সাত জেলা-ফেনী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, মৌলভীবাজারে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হিসাব পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় এখনো ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া যেসব জেলা থেকে ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে, সেগুলোর কিছু এলাকায় এখনো বন্যার পানি রয়ে গেছে। ফলে পুরো ক্ষতি আরও বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রশাসন এবং এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও কসবায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বাসাবাড়ি থেকে পানি নেমে গেছে। তবে পানি কমলেও এখনো তলিয়ে আছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। সেই সঙ্গে ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। শুধু কৃষি খাতেই ২০৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এ ছাড়া মৎস্য খাতে ক্ষতি ১৯ কোটি টাকার বেশি। তবে প্রাণিসম্পদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
ফেনীর আরও বেশ কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দারা এখনও পানির সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। এর মধ্যে দাগনভূঞা, সোনাগাজী ও সদরের কিছু উপজেলার গ্রামীণ রাস্তাঘাটের পাশাপাশি বাড়িঘরে পানি রয়েছে।
স্থানীয় জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এখনও প্রায় ২০ হাজার লোক আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে দাগনভূঞা উপজেলায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর, মোহরবাগ, নেকান্তরপুর, চন্দ্রপুরসহ ৪-৫টি, রাজাপুর ইউনিয়নের নন্দিরগাঁও, সমাসপুর, সাপুয়া, এতিমখানা, মেহেদীপুরসহ ৬-৭টি, পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গজারিয়া, ওমরাবাদ, বৈঠারপাড়া, চন্দ্রদ্বীপ, কেরোনীয়াসহ ৯-১০টি, রামনগর ইউনিয়নের ৩-৪টি ও ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের করমুল্লাহপু, উত্তর করিমপুরসহ ৬-৭টি, সদর ইউনিয়নের ৩-৪টি, মাতুভূঞা ইউনিয়নের মোমারিজপুর, সালাম নগরসহ ৩-৪টি, জায়লস্কর ইউনিয়নের খুশিপুর, নেয়াজপুর,আহমদপুর ওমরপুর, সোনাপুর, এনায়েতপুরসহ ৮-৯টি গ্রাম ও সোনাগাজী উপজেলা বেশকিছু এবং সদর উপজেলার কিছু এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবেদিতা চাকমা বলেন, গত রোববার ১১ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন। পানি কমছে ধীরে ধীরে। আজ হয়তো আরও একটু কমবে। তবে এখনও বিভিন্ন এলাকায় পানি রয়েছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এ উপজেলার গজারিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি ফুলকলি মডেল কিন্ডারগার্টেন এন্ড জুনিয়র হাইস্কুল থেকে পানি নেমেছে। তবে প্রধান সড়কের বেশকিছু অংশে পানি রয়েছে। কিছু বাড়ি-ঘর থেকে পানি নামলেও এখনও অধিকাংশতেই পানি দেখা গেছে।
একই উপজেলার উত্তর করিমপুর এলাকায় গতকাল সোমবার পর্যন্ত চলাচলের সড়কটি হাঁটুপানিতে নিমজ্জিত ছিল। ওই পানি মাড়িয়ে তিনশ গজ গেলেই উত্তর করিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির নিচতলা থেকে এখনো পানি নেমেছে। স্কুলের নিচতলা ও দোতলায় এখনও শ’খানেক ক্ষতিগ্রস্ত লোক অবস্থান করছেন।
জানতে চাইলে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, এখনও কিছু এলাকায় পানি রয়েছে। ঘরবাড়িতেও পানি আছে। পানি নামার পর ঘর পরিষ্কার করতেও সময় লাগে। তাই এখনও প্রায় তিন হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।
ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফাহমিদা হক বলেন, এখনও কিছু লোক আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিজিবিসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রচুর ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেনী। জেলার ছয় উপজেলায় বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৯০০ কোটি টাকা নিরূপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষিতে ৪৫১ কোটি ২০ লাখ, প্রাণিসম্পদে ৪০০ কোটি, মৎস্যে ২৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ নিয়ে কথা হয় ফুলগাজীর খামারি আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বন্যার ১৫ দিন আগে খামারে মুরগি নিয়েছিলাম। কোনো কিছুই সরাতে পারিনি। দেড় হাজার মুরগি, সঙ্গে খাবারসহ অন্য সব জিনিসপত্র পানিতে ভেসে গেছে। আমার এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখন যদি স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে অনেকে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
ফুলগাজীর কৃষক আবদুর রাজ্জাক বলেন, তিনটি গরু লালন-পালন করে কোনোমতে অভাবের সংসার সামলে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ এ বন্যা সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পারলেও গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি বন্যার পানিতেই রেখে যেতে হয়েছে। পানি নামার পর বাড়ি ফিরে এগুলোর আর কিছুই পাইনি।
কুমিল্লায় শুধু কৃষিতে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকতথ্য জানিয়েছে কৃষি অধিদফতর। তবে বন্যা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার বলেন, কুমিল্লায় বন্যায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার এবং তাদের খাবার বিনষ্ট হয়েছে। আমরা ৩০৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছি, যা আরও বাড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিল্লায় বন্যায় পুরো ৭০ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রোপা আমন ও সবজিখেত। তলিয়ে গেছে ধানের বীজতলা। মৎস্য খাতে প্রাথমিক সমীক্ষায় ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা।
নোয়াখালীতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, বন্যায় জেলা রোপা আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ৫৩৬ হেক্টর, রোপা আমনের ক্ষতি হয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ হেক্টর, ৪ হাজার ৫২১ হেক্টর আউশ, ৩ হাজার ২১৬ হেক্টর শরৎকালীন সবজি, ৪৩৬ হেক্টর কলাবাগান, ৫৭ হেক্টর বরজ, আখখেতের ক্ষতি হয়েছে ১৩ হেক্টর, আদা ২০ ও হলুদ ৫৫ হেক্টরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, বন্যার পানিতে ১ হাজার ২৯৩টি খামারের গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ ২৫ হাজার ৩৭৬টি গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে মৎস্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে জেলার ৫৪ হাজার পুকুর বা ঘেরের মধ্যে ৫০ হাজারের মাছ ভেসে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। নিজের ক্ষতির হিসাব দিতে গিয়ে সদরের উপজেলার বশিকপুরের বালাইশপুর এলাকার আদর্শ মৎস্য খামারের মালিক ফারুকুর রহমান বলেন, তাঁর ৬টি পুকুর ও জলাশয় ছিল। সেখানে প্রায় কোটি টাকার মাছ ছিল। বন্যায় সব মাছ ভেসে যায়। অন্যদের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সব খামারির অবস্থা একই। সবাই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
মৌলভীবাজারে কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও সদর উপজেলায় বন্যার পানিতে আউশ পাকা ধান, আমনের ফসলের মাঠসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিখেত তলিয়ে পচে গেছে। প্রায় ৪৪ হাজার হেক্টর ফসল এবং ৩ হাজার ১টি মাছের ঘের ভেসে গেছে। বন্যায় জেলায় আমন, আউশ ও সবজি তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে মাছ। এই জেলায় ১২৭ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি।
চাঁদপুরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে শাহরাস্তি, কচুয়া ও হাজীগঞ্জ। এসব জেলায় মৎস্য খাতে ১৭ কোটিসহ ২৫ কোটি টাকার ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা। চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাফায়েত আহম্মদ সিদ্দিকী বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে চাঁদপুরে রোপা আমন ব্যাহত হচ্ছে। বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত এবং রোপা আমন লাগানো বিলম্বিত হচ্ছে। এভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বরজ থেকে পান সংগ্রহ করছেন এক নারী। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় বরজের অধিকাংশ গাছের গোড়া পচে গেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো মরে যাবে। সম্প্রতি চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মহজমপুর গ্রামে।
পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষতির চিত্র উঠে আসতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুসারে শুধু সাত জেলা-ফেনী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, মৌলভীবাজারে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হিসাব পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় এখনো ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া যেসব জেলা থেকে ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে, সেগুলোর কিছু এলাকায় এখনো বন্যার পানি রয়ে গেছে। ফলে পুরো ক্ষতি আরও বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রশাসন এবং এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও কসবায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বাসাবাড়ি থেকে পানি নেমে গেছে। তবে পানি কমলেও এখনো তলিয়ে আছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। সেই সঙ্গে ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। শুধু কৃষি খাতেই ২০৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এ ছাড়া মৎস্য খাতে ক্ষতি ১৯ কোটি টাকার বেশি। তবে প্রাণিসম্পদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
ফেনীর আরও বেশ কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দারা এখনও পানির সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। এর মধ্যে দাগনভূঞা, সোনাগাজী ও সদরের কিছু উপজেলার গ্রামীণ রাস্তাঘাটের পাশাপাশি বাড়িঘরে পানি রয়েছে।
স্থানীয় জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এখনও প্রায় ২০ হাজার লোক আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে দাগনভূঞা উপজেলায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর, মোহরবাগ, নেকান্তরপুর, চন্দ্রপুরসহ ৪-৫টি, রাজাপুর ইউনিয়নের নন্দিরগাঁও, সমাসপুর, সাপুয়া, এতিমখানা, মেহেদীপুরসহ ৬-৭টি, পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গজারিয়া, ওমরাবাদ, বৈঠারপাড়া, চন্দ্রদ্বীপ, কেরোনীয়াসহ ৯-১০টি, রামনগর ইউনিয়নের ৩-৪টি ও ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের করমুল্লাহপু, উত্তর করিমপুরসহ ৬-৭টি, সদর ইউনিয়নের ৩-৪টি, মাতুভূঞা ইউনিয়নের মোমারিজপুর, সালাম নগরসহ ৩-৪টি, জায়লস্কর ইউনিয়নের খুশিপুর, নেয়াজপুর,আহমদপুর ওমরপুর, সোনাপুর, এনায়েতপুরসহ ৮-৯টি গ্রাম ও সোনাগাজী উপজেলা বেশকিছু এবং সদর উপজেলার কিছু এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবেদিতা চাকমা বলেন, গত রোববার ১১ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন। পানি কমছে ধীরে ধীরে। আজ হয়তো আরও একটু কমবে। তবে এখনও বিভিন্ন এলাকায় পানি রয়েছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এ উপজেলার গজারিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি ফুলকলি মডেল কিন্ডারগার্টেন এন্ড জুনিয়র হাইস্কুল থেকে পানি নেমেছে। তবে প্রধান সড়কের বেশকিছু অংশে পানি রয়েছে। কিছু বাড়ি-ঘর থেকে পানি নামলেও এখনও অধিকাংশতেই পানি দেখা গেছে।
একই উপজেলার উত্তর করিমপুর এলাকায় গতকাল সোমবার পর্যন্ত চলাচলের সড়কটি হাঁটুপানিতে নিমজ্জিত ছিল। ওই পানি মাড়িয়ে তিনশ গজ গেলেই উত্তর করিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির নিচতলা থেকে এখনো পানি নেমেছে। স্কুলের নিচতলা ও দোতলায় এখনও শ’খানেক ক্ষতিগ্রস্ত লোক অবস্থান করছেন।
জানতে চাইলে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, এখনও কিছু এলাকায় পানি রয়েছে। ঘরবাড়িতেও পানি আছে। পানি নামার পর ঘর পরিষ্কার করতেও সময় লাগে। তাই এখনও প্রায় তিন হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।
ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফাহমিদা হক বলেন, এখনও কিছু লোক আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিজিবিসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রচুর ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেনী। জেলার ছয় উপজেলায় বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৯০০ কোটি টাকা নিরূপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষিতে ৪৫১ কোটি ২০ লাখ, প্রাণিসম্পদে ৪০০ কোটি, মৎস্যে ২৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ নিয়ে কথা হয় ফুলগাজীর খামারি আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বন্যার ১৫ দিন আগে খামারে মুরগি নিয়েছিলাম। কোনো কিছুই সরাতে পারিনি। দেড় হাজার মুরগি, সঙ্গে খাবারসহ অন্য সব জিনিসপত্র পানিতে ভেসে গেছে। আমার এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখন যদি স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে অনেকে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
ফুলগাজীর কৃষক আবদুর রাজ্জাক বলেন, তিনটি গরু লালন-পালন করে কোনোমতে অভাবের সংসার সামলে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ এ বন্যা সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পারলেও গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি বন্যার পানিতেই রেখে যেতে হয়েছে। পানি নামার পর বাড়ি ফিরে এগুলোর আর কিছুই পাইনি।
কুমিল্লায় শুধু কৃষিতে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকতথ্য জানিয়েছে কৃষি অধিদফতর। তবে বন্যা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার বলেন, কুমিল্লায় বন্যায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার এবং তাদের খাবার বিনষ্ট হয়েছে। আমরা ৩০৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছি, যা আরও বাড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিল্লায় বন্যায় পুরো ৭০ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রোপা আমন ও সবজিখেত। তলিয়ে গেছে ধানের বীজতলা। মৎস্য খাতে প্রাথমিক সমীক্ষায় ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা।
নোয়াখালীতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, বন্যায় জেলা রোপা আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ৫৩৬ হেক্টর, রোপা আমনের ক্ষতি হয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ হেক্টর, ৪ হাজার ৫২১ হেক্টর আউশ, ৩ হাজার ২১৬ হেক্টর শরৎকালীন সবজি, ৪৩৬ হেক্টর কলাবাগান, ৫৭ হেক্টর বরজ, আখখেতের ক্ষতি হয়েছে ১৩ হেক্টর, আদা ২০ ও হলুদ ৫৫ হেক্টরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, বন্যার পানিতে ১ হাজার ২৯৩টি খামারের গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ ২৫ হাজার ৩৭৬টি গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে মৎস্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে জেলার ৫৪ হাজার পুকুর বা ঘেরের মধ্যে ৫০ হাজারের মাছ ভেসে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। নিজের ক্ষতির হিসাব দিতে গিয়ে সদরের উপজেলার বশিকপুরের বালাইশপুর এলাকার আদর্শ মৎস্য খামারের মালিক ফারুকুর রহমান বলেন, তাঁর ৬টি পুকুর ও জলাশয় ছিল। সেখানে প্রায় কোটি টাকার মাছ ছিল। বন্যায় সব মাছ ভেসে যায়। অন্যদের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সব খামারির অবস্থা একই। সবাই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
মৌলভীবাজারে কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও সদর উপজেলায় বন্যার পানিতে আউশ পাকা ধান, আমনের ফসলের মাঠসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিখেত তলিয়ে পচে গেছে। প্রায় ৪৪ হাজার হেক্টর ফসল এবং ৩ হাজার ১টি মাছের ঘের ভেসে গেছে। বন্যায় জেলায় আমন, আউশ ও সবজি তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে মাছ। এই জেলায় ১২৭ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি।
চাঁদপুরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে শাহরাস্তি, কচুয়া ও হাজীগঞ্জ। এসব জেলায় মৎস্য খাতে ১৭ কোটিসহ ২৫ কোটি টাকার ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা। চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাফায়েত আহম্মদ সিদ্দিকী বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে চাঁদপুরে রোপা আমন ব্যাহত হচ্ছে। বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত এবং রোপা আমন লাগানো বিলম্বিত হচ্ছে। এভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বরজ থেকে পান সংগ্রহ করছেন এক নারী। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় বরজের অধিকাংশ গাছের গোড়া পচে গেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো মরে যাবে। সম্প্রতি চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মহজমপুর গ্রামে।