
রাজধানীসহ নরসিংদীর পলাশে গয়েশপুর পদ্মলোচন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আল মামুনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎসহ নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ এনে ক্লাস বর্জন এবং সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগ ও বিচার দাবি করছেন তারা। গত রোববার দুপুর দেড়টা থেকে শিক্ষার্থীরা জিনারদি ইউনিয়নের চরনগরদী বাজার এলাকায় নরসিংদী-পলাশ আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এর আগে সকালে বিদ্যালয় ভবনে তালা দেয় শিক্ষার্থীরা। একইদিন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। শুধু নরসিংদীর পলাশ-দিনাজপুরের খানসামা নয়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ এনে তাদের (প্রধানদের) পদত্যাগের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করছে নানা মহল। তবে প্রধান শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগের প্রতিবাদে কোথাও কোথাও বিক্ষোভ মিছিল করছেন শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় অবস্থিত নীলক্ষেত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সুরমান আলীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টা থেকে তার পদত্যাগের দাবিতে স্কুল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, এমনকি অভিভাবকদের সঙ্গেও। তিনি তুচ্ছ কারণেই যে কোনো সময়ে যে কাউকে বহিষ্কার করেন। স্কুলে খেলাধুলার সুযোগও দেন না তিনি। স্কুলের এক নারী শিক্ষার্থী জানায়, স্কুলের কম্পিউটার রুমের কম্পিউটারগুলো নষ্ট বহুদিন ধরেই, কোনো পদক্ষেপ নেননি প্রধান শিক্ষক। আন্দোলনের বিষয়ে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, আমাদের সন্তানদের নিয়ে স্কুলে আসার পর আমরা একটু বসতে পারি না, আমাদের বসার জায়গার ব্যবস্থা নেই। বাচ্চাদের ক্লাসরুমেও ফ্যান নেই, তারা বসে থাকতে পারে না। প্রধান শিক্ষক এগুলোকে গুরুত্বই দেন না। তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন না। আমরা তার পদত্যাগ চাই। একইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলা পরিষদ চত্বরে খানসামা সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) নজরুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে পক্ষে ও বিপক্ষে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা। একইদিন সুবর্ণখুলী সাবুদেরহাট দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রকাশ চন্দ্র রায়, আলোকঝাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খগেশ্বর রায়, টংগুয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সতিশ চন্দ্র রায়ের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়। একইদিন রোববার বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ বলইবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমির হোসেন দুলালের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম তারেক সুলতান বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের স্মারকলিপি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। গতকাল রোববার বেলা ১২টার দিকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে মানিকগঞ্জের জিকে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। একইদিন ঝালকাঠি সদর উপজেলার চারুখান দশগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজুল ইসলাম এর পদত্যাগের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা। পরে বিদ্যালয়ের সামনে ঘণ্টাব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ করে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের রুমে তালা ঝুলিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন করে। বিক্ষোভ সমাবেশে শতাধিক ছাত্র ও অভিভাবক অংশগ্রহণ করে। ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহের ত্রিশাল পোড়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককের অনিয়ম দুর্নীতি ও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরের পদত্যাগের দাবিতে স্কুলের মূল ফটকে গণজমায়েত ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ। একইদিন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় পঙ্গুয়াই উমেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুব হাসান কাজলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য নানান অনিয়ম-দুর্নীতি অপকর্মের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এদিন বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। ওই সময় বিক্ষোভকারীরা প্রধান শিক্ষক মাহাবুব হাসান কাজলের পদত্যাগ ও শাস্তির দাবি করেন।
রাজশাহীর ৭৮ শিক্ষক আতঙ্ক উৎকন্ঠায়: রাজশাহীর পুঠিয়ায় ৭৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগকৃত শিক্ষক-কর্মচারী এবং দলবাজরা ভীষণ আতঙ্ক উৎকন্ঠার ভিতরে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে উপজেলার দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসী অভিভাবকরা মিলে আন্দোলন করছে। হয়তো তাদের আন্দোলনের মুখে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হতে পারে। এই আতঙ্কে অনেক শিক্ষক-কর্মচারীদের রয়েছে। অবশ্য যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও শিক্ষা বাণিজ্যে আওয়ামী লীগের দলবাজগিরি করেছেন তাদের মাঝে উৎকণ্ঠা বেশি কাজ করছে। তাই দুর্নীতিবাজদের চোখের ঘুম হারাম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আবার অনেকে ঠিকমতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। অপরদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকের শিক্ষা সনদপত্র নকল বলে গুঞ্জন উঠেছে। অনেকে আবার বেসরকারি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সনদপত্র দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করছেন। এদিকে ২০টি কলেজ রয়েছে সব বিষয়ে শিক্ষক আছে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী নেই। তবুও শিক্ষকরা বেতন ভাতা উঠানোরও নজির রয়েছে।
শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে উদ্বেগ জন্মাষ্টমী পরিষদের: সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠনসহ ১০দফা দাবি জানিয়েছে শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদ। এছাড়া ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করানোর ঘটনা বন্ধের দাবি জানানো হয়। ২৪ আগস্ট দুপুরে নগরের রহমতগঞ্জে পরিষদের প্রধান কার্যালয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার সেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে অসম্মান ও জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যেটি জাতির বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। পরিষদ এসব অপরাধের তীব্র নিন্দা এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।
শিক্ষকদের হয়রানি ও পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ঢাবির: গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জিনাত হুদা। গত বুধবার অধ্যাপক জিনাত হুদা শিক্ষকদের এই অবস্থার প্রতিকার চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। জিনাত হুদা বলেন, অধ্যাপক আসিফ নজরুল আমাদের সহকর্মী। তিনি সরকারের উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। তাই উনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অবগত করেছি। আমাদের বেশকিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হয়রানির শিকার হচ্ছেন, পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সদস্য জিনাত হুদা চিঠিতে লিখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু সংখ্যক শিক্ষক নাজুক অবস্থায় রয়েছেন। চেয়ারম্যান, পরিচালক, ডিনশিপ এবং চাকরি থেকে পদত্যাগ করার জন্য তাদের হুমকি ও আক্রমণ করা হচ্ছে। এখন প্রায় সব বিভাগেই ঘটছে। কোটাবিরোধীতার নাম করে কিছু শিক্ষার্থী এভাবে বিভাগ ও অনুষদের শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা ব্যানার তৈরি করছে, তাদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাচ্ছে এবং তাদের মান ক্ষুণ্ন করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের সড়কে বিক্ষোভ: কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে গত বুধবার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীরা ফের অবস্থান নেয় কুষ্টিয়া-প্রাগপুর আঞ্চলিক সড়কের হোসেনাবাদ বাজার এলাকায়। গতকাল রোববার দুপুর ১২টা থেকে সড়কে অবস্থান নিয়ে প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমের বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করতে দেখা যায় হোসেনাবাদ আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এসময় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন জনসাধারণ। এর আগে গেল ২১ আগস্ট আন্দলোনের মুখে বিকেল ৩টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের দাবি ও আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলে প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমকে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের সাবেক পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি জরুরি সভা করে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘরে ফেরান। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুসারে আশানুরূপ কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জানানো হয়নি বলে তারা আবার সড়কে অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিশ্রুতিতে আমরা বুধবার ঘরে ফিরেছিলাম তবে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সমাধানের কথা আমাদের জানাননি। গত বৃহস্পতিবার আমাদের কয়েকজন শিক্ষককে ডেকে তিনি আলোচনা করেন। তবে কোনো সমাধান দেননি।
শিক্ষককে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগের অভিযোগ: গত ২৩ আগস্ট লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মাহমুদা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিন মো: বাবরকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বুধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দেয়া এক অভিযোগ সূত্রে একথা জানা যায়। বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল মতিন বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। একজন শিক্ষকের সাথে এমন আচরণ মেনে নেয়া যায় না। রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আমজাদ হোসেন বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত ১৯ আগস্ট ঢাকা জেলার ঐতিহ্যবাহী সাভার মডেল কলেজে শিক্ষার্থীদের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করলেন অধ্যক্ষসহ আরো ২ শিক্ষক। ১৮ আগস্ট দুপুরে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করেন তারা। এর আগে, সকাল থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেন প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী।
পদত্যাকৃতরা হলেন জোরপূর্বক অধ্যক্ষের পদে থাকা ভূগোল বিভাগের প্রভাষক আলী হোসেন, দর্শন বিভাগের হোসাইন মোহাম্মদ রানা এবং সমকামিতায় অভিযুক্ত ইসলাম শিক্ষা বিভাগের রমজান আলী। এছাড়া বিতর্কিত কর্মকান্ডের সহযোগিতার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন ক্রীড়া শিক্ষক ফিরোজ আলম ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আমিনুল ইসলাম।
ভিকারুননিসায় আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই: ১১ আগস্ট রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় ও সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম অভিযোগ করে বলেন, আমাকে চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই নিয়েছে। সাদা কাগজে বাংলা ও ইংরেজিতে সই নিয়েছে। অধ্যক্ষ কেকা রায়কেও জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়েছে। অধ্যক্ষ সাধারণ শিক্ষক হিসেবে থাকতে চেয়েছিলেন, সে সুযোগও দেয়া হয়নি। যারা অধ্যক্ষসহ দুই শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন তাদের মধ্যে বর্তমান ছাত্রীদের চেয়ে সাবেক ছাত্রী বেশি ছিল বলে জানান তিনি। ড. ফারহানাকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। ভিকারুননিসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায়ের বিরুদ্ধে অবৈধ ছাত্র ভর্তির অভিযোগ রযেছে।
জোরপূর্বক পদত্যাগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: গত ২৩ আগস্ট সাভারের শুকুরজান জিন্নত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নওশের আলীকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে বিদ্যালয়টির বর্তমান ও প্রাক্তন শতাধিক শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। এদিন বিকালে বিদ্যালয়ের সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জামসিং-ভাটপাড়া সংযোগ সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এসময় তারা জোর করে প্রধান শিক্ষককের পদত্যাগ মানিনা মানবোনা, শিক্ষকদের হুমকি কেন জবাব চাই, স্কুলে দালালী চলবেনা, আমাদের স্কুলে আমরাই থাকবোসহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। মানববন্ধন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বলেন, নওশের স্যার দুইযুগ ধরে আমাদের এখানে দায়িত্ব পালন করে আসছেন কখনো তিনি কোন অনিয়ম ও দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের সকলের প্রিয় শিক্ষককে অপমান ও হেনস্থার মাধ্যমে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নিয়েছে। যেটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তাই আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই এবং আমাদের প্রিয় শিক্ষককে আবারো বিদ্যালয়ে ফিরে পাওয়ার দাবি জানাচ্ছি। এসময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবী তুলে ধরেন।
শিক্ষকদের হেনস্তায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্বেগ: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের অপমান-হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। গত বৃহস্পতিবার (২২আগস্ট) সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা উপাচার্যকে শিক্ষার্থীরা জোরপূর্বক পদত্যাগ করাতে বাধ্য করছে। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করছে না। এই হেনস্তা থেকে নারী শিক্ষকরাও রেহাই পাচ্ছেন না।
পদত্যাগে বাধ্য করার প্রতিবাদে শিক্ষক সমাবেশ: ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ধ্বংসের চক্রান্ত বন্ধ করা, দেশব্যাপী শিক্ষক নির্যাতন, আইন বহির্ভূতভাবে শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রতিবাদে রংপুরে শিক্ষক সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) রংপুরের আহ্বানে এই কর্মসূচি পালিত হয়। রংপুর মহানগর বাকবিশিস সভাপতি অধ্যাপক নবীব হোসেন লাভলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন রংপুর জেলা বাকবিশিস সভাপতি অধ্যক্ষ মো. আব্দুল ওয়াহেদ মিঞা, অধ্যক্ষ শাহ মো. রেজাউল ইসলাম প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত বক্তারা বলেন, বিগত সরকার পতনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অন্যায়ভাবে সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনসহ পদত্যাগে বাধ্য করছে। যা দেশের প্রচলিত আইন পরিপন্থি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদত্যাগ নিয়ে যা বললেন শিক্ষা উপদেষ্টা: শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের কারও বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নতুন করে পদায়ন ও নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে প্রশাসন ভেঙ্গে পড়তে পারে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পেতে অসুবিধা হবে। গতকাল রোববার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ম-বিধি অনুযায়ী পদায়ন ও বদল করা হয়। তাদের বল পূর্বক পদত্যাগের সুযোগ নেই। একটি সফল অভ্যুত্থানের পর সুশৃঙ্খল সমাজে ফিরে যেতে চান উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যে ধরনের সম্পর্ক আশা করা হয়, সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে এবং কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত করা যাবে না। শিক্ষাঙ্গনে ভদ্রতা রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
জানা গেছে, সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় অবস্থিত নীলক্ষেত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সুরমান আলীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টা থেকে তার পদত্যাগের দাবিতে স্কুল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, এমনকি অভিভাবকদের সঙ্গেও। তিনি তুচ্ছ কারণেই যে কোনো সময়ে যে কাউকে বহিষ্কার করেন। স্কুলে খেলাধুলার সুযোগও দেন না তিনি। স্কুলের এক নারী শিক্ষার্থী জানায়, স্কুলের কম্পিউটার রুমের কম্পিউটারগুলো নষ্ট বহুদিন ধরেই, কোনো পদক্ষেপ নেননি প্রধান শিক্ষক। আন্দোলনের বিষয়ে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, আমাদের সন্তানদের নিয়ে স্কুলে আসার পর আমরা একটু বসতে পারি না, আমাদের বসার জায়গার ব্যবস্থা নেই। বাচ্চাদের ক্লাসরুমেও ফ্যান নেই, তারা বসে থাকতে পারে না। প্রধান শিক্ষক এগুলোকে গুরুত্বই দেন না। তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন না। আমরা তার পদত্যাগ চাই। একইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলা পরিষদ চত্বরে খানসামা সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) নজরুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে পক্ষে ও বিপক্ষে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা। একইদিন সুবর্ণখুলী সাবুদেরহাট দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রকাশ চন্দ্র রায়, আলোকঝাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খগেশ্বর রায়, টংগুয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সতিশ চন্দ্র রায়ের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়। একইদিন রোববার বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ বলইবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমির হোসেন দুলালের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম তারেক সুলতান বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের স্মারকলিপি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। গতকাল রোববার বেলা ১২টার দিকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে মানিকগঞ্জের জিকে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। একইদিন ঝালকাঠি সদর উপজেলার চারুখান দশগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজুল ইসলাম এর পদত্যাগের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা। পরে বিদ্যালয়ের সামনে ঘণ্টাব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ করে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের রুমে তালা ঝুলিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন করে। বিক্ষোভ সমাবেশে শতাধিক ছাত্র ও অভিভাবক অংশগ্রহণ করে। ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহের ত্রিশাল পোড়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককের অনিয়ম দুর্নীতি ও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরের পদত্যাগের দাবিতে স্কুলের মূল ফটকে গণজমায়েত ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ। একইদিন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় পঙ্গুয়াই উমেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুব হাসান কাজলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য নানান অনিয়ম-দুর্নীতি অপকর্মের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এদিন বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। ওই সময় বিক্ষোভকারীরা প্রধান শিক্ষক মাহাবুব হাসান কাজলের পদত্যাগ ও শাস্তির দাবি করেন।
রাজশাহীর ৭৮ শিক্ষক আতঙ্ক উৎকন্ঠায়: রাজশাহীর পুঠিয়ায় ৭৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগকৃত শিক্ষক-কর্মচারী এবং দলবাজরা ভীষণ আতঙ্ক উৎকন্ঠার ভিতরে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে উপজেলার দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসী অভিভাবকরা মিলে আন্দোলন করছে। হয়তো তাদের আন্দোলনের মুখে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হতে পারে। এই আতঙ্কে অনেক শিক্ষক-কর্মচারীদের রয়েছে। অবশ্য যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও শিক্ষা বাণিজ্যে আওয়ামী লীগের দলবাজগিরি করেছেন তাদের মাঝে উৎকণ্ঠা বেশি কাজ করছে। তাই দুর্নীতিবাজদের চোখের ঘুম হারাম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আবার অনেকে ঠিকমতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। অপরদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকের শিক্ষা সনদপত্র নকল বলে গুঞ্জন উঠেছে। অনেকে আবার বেসরকারি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সনদপত্র দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করছেন। এদিকে ২০টি কলেজ রয়েছে সব বিষয়ে শিক্ষক আছে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী নেই। তবুও শিক্ষকরা বেতন ভাতা উঠানোরও নজির রয়েছে।
শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে উদ্বেগ জন্মাষ্টমী পরিষদের: সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠনসহ ১০দফা দাবি জানিয়েছে শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদ। এছাড়া ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করানোর ঘটনা বন্ধের দাবি জানানো হয়। ২৪ আগস্ট দুপুরে নগরের রহমতগঞ্জে পরিষদের প্রধান কার্যালয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার সেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে অসম্মান ও জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যেটি জাতির বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। পরিষদ এসব অপরাধের তীব্র নিন্দা এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।
শিক্ষকদের হয়রানি ও পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ঢাবির: গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জিনাত হুদা। গত বুধবার অধ্যাপক জিনাত হুদা শিক্ষকদের এই অবস্থার প্রতিকার চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। জিনাত হুদা বলেন, অধ্যাপক আসিফ নজরুল আমাদের সহকর্মী। তিনি সরকারের উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। তাই উনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অবগত করেছি। আমাদের বেশকিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হয়রানির শিকার হচ্ছেন, পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সদস্য জিনাত হুদা চিঠিতে লিখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু সংখ্যক শিক্ষক নাজুক অবস্থায় রয়েছেন। চেয়ারম্যান, পরিচালক, ডিনশিপ এবং চাকরি থেকে পদত্যাগ করার জন্য তাদের হুমকি ও আক্রমণ করা হচ্ছে। এখন প্রায় সব বিভাগেই ঘটছে। কোটাবিরোধীতার নাম করে কিছু শিক্ষার্থী এভাবে বিভাগ ও অনুষদের শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা ব্যানার তৈরি করছে, তাদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাচ্ছে এবং তাদের মান ক্ষুণ্ন করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের সড়কে বিক্ষোভ: কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে গত বুধবার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীরা ফের অবস্থান নেয় কুষ্টিয়া-প্রাগপুর আঞ্চলিক সড়কের হোসেনাবাদ বাজার এলাকায়। গতকাল রোববার দুপুর ১২টা থেকে সড়কে অবস্থান নিয়ে প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমের বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করতে দেখা যায় হোসেনাবাদ আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এসময় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন জনসাধারণ। এর আগে গেল ২১ আগস্ট আন্দলোনের মুখে বিকেল ৩টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের দাবি ও আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলে প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমকে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের সাবেক পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি জরুরি সভা করে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘরে ফেরান। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুসারে আশানুরূপ কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জানানো হয়নি বলে তারা আবার সড়কে অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিশ্রুতিতে আমরা বুধবার ঘরে ফিরেছিলাম তবে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সমাধানের কথা আমাদের জানাননি। গত বৃহস্পতিবার আমাদের কয়েকজন শিক্ষককে ডেকে তিনি আলোচনা করেন। তবে কোনো সমাধান দেননি।
শিক্ষককে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগের অভিযোগ: গত ২৩ আগস্ট লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মাহমুদা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিন মো: বাবরকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বুধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দেয়া এক অভিযোগ সূত্রে একথা জানা যায়। বড়খেরী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল মতিন বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। একজন শিক্ষকের সাথে এমন আচরণ মেনে নেয়া যায় না। রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আমজাদ হোসেন বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত ১৯ আগস্ট ঢাকা জেলার ঐতিহ্যবাহী সাভার মডেল কলেজে শিক্ষার্থীদের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করলেন অধ্যক্ষসহ আরো ২ শিক্ষক। ১৮ আগস্ট দুপুরে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করেন তারা। এর আগে, সকাল থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেন প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী।
পদত্যাকৃতরা হলেন জোরপূর্বক অধ্যক্ষের পদে থাকা ভূগোল বিভাগের প্রভাষক আলী হোসেন, দর্শন বিভাগের হোসাইন মোহাম্মদ রানা এবং সমকামিতায় অভিযুক্ত ইসলাম শিক্ষা বিভাগের রমজান আলী। এছাড়া বিতর্কিত কর্মকান্ডের সহযোগিতার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন ক্রীড়া শিক্ষক ফিরোজ আলম ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আমিনুল ইসলাম।
ভিকারুননিসায় আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই: ১১ আগস্ট রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় ও সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম অভিযোগ করে বলেন, আমাকে চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই নিয়েছে। সাদা কাগজে বাংলা ও ইংরেজিতে সই নিয়েছে। অধ্যক্ষ কেকা রায়কেও জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়েছে। অধ্যক্ষ সাধারণ শিক্ষক হিসেবে থাকতে চেয়েছিলেন, সে সুযোগও দেয়া হয়নি। যারা অধ্যক্ষসহ দুই শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন তাদের মধ্যে বর্তমান ছাত্রীদের চেয়ে সাবেক ছাত্রী বেশি ছিল বলে জানান তিনি। ড. ফারহানাকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। ভিকারুননিসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায়ের বিরুদ্ধে অবৈধ ছাত্র ভর্তির অভিযোগ রযেছে।
জোরপূর্বক পদত্যাগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: গত ২৩ আগস্ট সাভারের শুকুরজান জিন্নত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নওশের আলীকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে বিদ্যালয়টির বর্তমান ও প্রাক্তন শতাধিক শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। এদিন বিকালে বিদ্যালয়ের সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জামসিং-ভাটপাড়া সংযোগ সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এসময় তারা জোর করে প্রধান শিক্ষককের পদত্যাগ মানিনা মানবোনা, শিক্ষকদের হুমকি কেন জবাব চাই, স্কুলে দালালী চলবেনা, আমাদের স্কুলে আমরাই থাকবোসহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। মানববন্ধন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বলেন, নওশের স্যার দুইযুগ ধরে আমাদের এখানে দায়িত্ব পালন করে আসছেন কখনো তিনি কোন অনিয়ম ও দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের সকলের প্রিয় শিক্ষককে অপমান ও হেনস্থার মাধ্যমে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নিয়েছে। যেটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তাই আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই এবং আমাদের প্রিয় শিক্ষককে আবারো বিদ্যালয়ে ফিরে পাওয়ার দাবি জানাচ্ছি। এসময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবী তুলে ধরেন।
শিক্ষকদের হেনস্তায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্বেগ: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের অপমান-হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। গত বৃহস্পতিবার (২২আগস্ট) সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা উপাচার্যকে শিক্ষার্থীরা জোরপূর্বক পদত্যাগ করাতে বাধ্য করছে। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করছে না। এই হেনস্তা থেকে নারী শিক্ষকরাও রেহাই পাচ্ছেন না।
পদত্যাগে বাধ্য করার প্রতিবাদে শিক্ষক সমাবেশ: ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ধ্বংসের চক্রান্ত বন্ধ করা, দেশব্যাপী শিক্ষক নির্যাতন, আইন বহির্ভূতভাবে শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রতিবাদে রংপুরে শিক্ষক সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) রংপুরের আহ্বানে এই কর্মসূচি পালিত হয়। রংপুর মহানগর বাকবিশিস সভাপতি অধ্যাপক নবীব হোসেন লাভলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন রংপুর জেলা বাকবিশিস সভাপতি অধ্যক্ষ মো. আব্দুল ওয়াহেদ মিঞা, অধ্যক্ষ শাহ মো. রেজাউল ইসলাম প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত বক্তারা বলেন, বিগত সরকার পতনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অন্যায়ভাবে সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনসহ পদত্যাগে বাধ্য করছে। যা দেশের প্রচলিত আইন পরিপন্থি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদত্যাগ নিয়ে যা বললেন শিক্ষা উপদেষ্টা: শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের কারও বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নতুন করে পদায়ন ও নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে প্রশাসন ভেঙ্গে পড়তে পারে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পেতে অসুবিধা হবে। গতকাল রোববার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ম-বিধি অনুযায়ী পদায়ন ও বদল করা হয়। তাদের বল পূর্বক পদত্যাগের সুযোগ নেই। একটি সফল অভ্যুত্থানের পর সুশৃঙ্খল সমাজে ফিরে যেতে চান উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যে ধরনের সম্পর্ক আশা করা হয়, সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে এবং কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত করা যাবে না। শিক্ষাঙ্গনে ভদ্রতা রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।