
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে গতকাল রোববার সারাদেশে পালিত হচ্ছে অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচি। সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ কর্মসূচি পালনকালে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন এবং পুলিশ সদস্যদের সংঘর্ষ হয়েছে। সারাদেশে সংঘর্ষে পিটিয়ে, কুপিয়ে ও গুলিবিদ্ধ হয়ে পুলিশসহ নিহত হয়েছে ৮৫ জন এবং আহত সহস্রাধিক। নরসিংদীতে ৬ জন, ফেনীতে ৭ জন, সিরাজগঞ্জে ১৩ পুলিশসহ মোট ২২ জন, কিশোরগঞ্জে ৪ জন, রাজধানী ঢাকায় ৫ জন, লক্ষ্মীপুরে ৮ জন, বগুড়ায় ৪ জন, মুন্সিগঞ্জে ৩ জন, মাগুরায় ৪ জন, ভোলায় ৩ জন, রংপুরে ৪ জন, পাবনায় ৩ জন, সিলেটে ২ জন, কুমিল্লায় পুলিশ সদস্যসহ ৩ জন, শেরপুরে ২জন, জয়পুরহাটে ১ জন, ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ১ জন, সাভারে ১ জন, হবিগঞ্জে ১ জন ও বরিশালে ১ জনসহ ৮৫ জন নিহত হয়েছেন।
সারাদেশ থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:-
১৪ পুলিশ সদস্য নিহত: সারা দেশে ১৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন। কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জে নিহত হয়েছেন একজন।
রাজধানীতে নিহত ৫ জন: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ চলছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের নেতা এবং আরেকজন শিক্ষার্থী। নিহত আওয়ামী লীগ নেতার নাম আনোয়ারুল ইসলাম। ষাটোর্ধ্ব এই প্রকৌশলী ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। জিগাতলায় সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী (২৩)। তিনি রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। আব্দুল্লাহ পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার এলাকার কলতা বাজারের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আবু বকর। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া বলেন, নিহত ব্যক্তির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। বিকেলে ফার্মগেট এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে আহত হয়ে তৌহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবক নিহত হয়েছে। তিনি মহাখালীর ডিএইট কনসালটেন্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, মৃত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তৌহিদুলের মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছেন। এদিকে মিরপুরে সংঘর্ষ চলাকালে মিরাজ হোসেন (২৩) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আজমল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অন্দিরা জানান, বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ওই যুবক মারা যান। তিনি মিরপুর ৬ নম্বরের এ ব্লকে থাকতেন। বিকেলে গুলিস্তান থেকে জহির উদ্দীন নামে এক ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি কুমিল্লায়। প্রাথমিকভাবে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
লক্ষ্মীপুরে নিহত ৮ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক কলেজছাত্রসহ আটজন নিহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মো. সোহেল রানা গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে জেলা শহরের উত্তর তেমুহনী থেকে ঝুমুর পর্যন্ত এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে তিনটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।
মুন্সীগঞ্জে নিহত ৩ জন: মুন্সীগঞ্জ শহরের থানারপুল চত্বরে আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে গতকাল রোববার সকাল ১০টার দিকে সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- রিয়াজুল ইসলাম (৩৫), মেহেদি হাসান (৩২), মো. সজল (২২)। এ সময় গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কমপক্ষে পাঁচটি মোটরসাইকেল।
রংপুরে নিহত ৪ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে রংপুরে আরও একজন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারজনে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। তাঁরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারাধন রায় ও তাঁর ভাগনে শ্যামল রায়। সংঘর্ষ চলাকালে শহরের কালিবাড়ি গেটের পাশে তাঁদের লাশ পড়ে থাকতে দেখে লোকজন। কাউন্সিলরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাহমুদুর রহমান। নিহত বাকি দুজন হলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য খায়রুল ইসলাম ও জেলা যুবলীগের কর্মী মাসুম হোসেন। রংপুর মেডিকেলে কলেজ হাসপাতাল মর্গের দায়িত্বে নিয়োজিত সর্দার আবদুল জলিল তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে শহরের সিটি বাজার ও জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটের সামনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এদিকে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের নাম পাওয়া যায়নি।
মাগুরা নিহত ৪ জন: মাগুরা শহরের ঢাকা রোড়ে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বী নিহত ও ফরহাদ হোসেন (২৩)সহ আরো দুইজন নিহত হন। গতকাল রোববার সকাল ১১টার দিকে এ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন তিন পুলিশ সদস্যসহ ১০ জন।
কুমিল্লায় নিহত ৩ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে দেবিদ্বারে একজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুর দেড়টার দিকে দেবিদ্বার পৌর এলাকার বানিয়াপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওই ব্যক্তির নাম আবদুল্লা রুবেল (৩৩)। তিনি পেশায় গাড়িচালক। তিনি বারেরা এলাকার ইউনুছ মিয়ার ছেলে। এছাড়াও এক পুলিশ কনস্টেবলসহ আরো এক আন্দোলকারী নিহত হয়েছে।
পাবনায় নিহত ৩ জন: পাবনায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের বিচার ও সরকারের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচিতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল রোববার বেলা ১টার দিকে পাবনা শহরের ট্রাফিক মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে সহকারী পরিচালক ডা. রফিকুল ইসলাম রিমন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতরা হলেন- পাবনা সদরের চর বলরামপুরের জাহিদুল ইসলাম (১৮) ও পাবনা শহরের আরিফপুর হাজীরহাট এলাকার মাহিবুল হোসন (১৬)।
সিলেটে নিহত ২ জন: সিলেটের গোলাপগঞ্জে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর গুলিতে দু’জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক লোক। গতকাল রোববার দপুর আড়াইটার দিকে গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার ধারাবহরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে গুলিতে তারা নিহত হন। নিহতরা হলেন-ধারাবহর গ্রামের মো. মকবুল আলীর ছেলে ব্যবসায়ী তাজ উদ্দিন (৪৩) ও শিলঘাটের বাসিন্দা সানি আহমদ (১৮)।
নরসিংদীতে নিহত ৬ জন: নরসিংদীর মাধবদীতে আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে এক ইউপি চেয়ারম্যানসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা সবাই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বা সমর্থক বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নেতাকর্মীরা। গতকাল রোববার দুপুর ১টার দিকে মাধবদী বাজার মসজিদে সামনে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শহীদুল ইসলাম সোহাগ। নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মাধবদী থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহীন (৩৭), সদর থানা সেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মনিরুজ্জামান ভূইয়া (৪৮), সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ছোটভাই ছোট গদাইচর এলাকার আবু সায়ীদের ছেলে দেলোয়ার হোসেন দেলু (৪৮), মাধবদীর আলগী এলাকার আওয়ামী লীগের সমর্থক শাহাজাহান মিয়ার ছেলে কামাল মিয়া (৪৫), মাধবদী শ্রমিকলীগ নেতা আনিসুর রহমান সোহেল (৪৩)। অজ্ঞাত একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
সিরাজগঞ্জে ১৩ পুলিশসহ নিহত ২২ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগের প্রথম দিন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্য হত্যার শিকার হয়েছে। এ তথ্য জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা কামরুল আহসান বলেন, এর বাইরে কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানায় ঢুকে এক পুলিশ কনস্টেবলকে পিটিয়ে হত্যা করেছে আন্দোলনকারীরা। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি বিজয় বসাক বলেন, “আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে এসে এনায়েতপুর থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। একপর্যায়ে তারা থানায় আগুন দেয় এবং সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করে।” প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনকারী থানার দক্ষিণে জমায়েত হয়। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন ছিলেন। এছাড়া, সিরাজগঞ্জ শহর ও রায়গঞ্জ উপজেলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় ৯ জন নিহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হাসান খান তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিরাজগঞ্জ শহরে মারা যাওয়া তিনজন বিএনপির নেতাকর্মী বলে দাবি করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। এদিকে, জেলার রায়গঞ্জে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মেহেদী হাসান ইলিয়াস এবং সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন সরকার নিহত হয়েছে। এমনটি দাবি করেছেন চাঁন্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেলিম আহমেদ। নিহত আল-আমিন সরকারের বড় ভাই হলেন সেলিম আহমেদ। এছাড়া, এই উপজেলার ধর্মগাছা উইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার লিটন, একই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হাসনাত টিটু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম ও স্থানীয় দৈনিক খবর পত্র পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি প্রদীপ কুমার মারা গেছেন। তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হাসান খান।
ভোলা নিহত ৩ জন: ভোলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সংঘর্ষে গতকাল রোববার তিনজন নিহত হয়েছেন। সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সংঘর্ষে পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিএনপির দাবি, তাদের দুই কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দাবি, তাঁদের এক যুবলীগ কর্মীকে বিক্ষোভকারীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। ভোলা সদর হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে পুলিশ সদস্য জহিরুল ইসলামসহ ১৫ জন ভর্তি হয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু বলেন, বিক্ষোভকারীরা যুবলীগের কর্মী মো. মিলনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রাইসুল আলম বলেন, পুলিশের গুলিতে ও আওয়ামী লীগের হামলায় তাঁদের দুজন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ নিহত ৪ জন: কিশোরগঞ্জে বিক্ষোভকারী, পুলিশ ও ছাত্রলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ। এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল ইসলামের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। নিহত চারজনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁদের একজন হলেন সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াল এলাকার দিলু মিয়ার ছেলে মো. মবিন মিয়া (৩২)। তিনি যুবলীগের কর্মী বলে জানা গেছে। বাকি দুজন হলেন সদরের যশোদল বীরদাম পাড়া এলাকার অঞ্জনা বেগম (৩৫) ও জেলা শহরের নিউ টাউন এলাকার জুয়েল মিয়া (৩০)। আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি।
ফেনী নিহত ৭ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগের মধ্যে ফেনী শহরে ছাত্র-জনতার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, পথচারী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। ফেনী জেনারেল হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। নিহতরা হলেন- ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ (১৯), সদর উপজেলার দক্ষিণ কাশিমপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে শিহাব উদ্দিন (১৮), ফাজিলপুর ইউনিয়নের রফিকুল ইসলামের ছেলে সাইদুল ইসলাম (২০), সোনাগাজী উপজেলার চর মজলিশপুর এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে শকিব (২১)। এছাড়া, সরোয়ার হোসেন মাসুদ, আরাফাত এবং বিপ্লব নামে অপর ৩ জনের লাশ মিললেও বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহতদের মধ্যে ৫ জনের লাশ মর্গে রয়েছে বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আরএমও আসিফ ইকবাল। এছাড়া, শ্রাবণ নামে অপর এক শিক্ষার্থীর লাশ তার স্বজনরা নিয়ে গেছে বলে নিহতের পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বগুড়ায় নিহত ৪ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকারবিরোধী অসহযোগের সময় বগুড়ায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষের সময় গুলিতে চারজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার বগুড়া সদর ও দুপচাঁচিয়া উপজেলায় এসব নিহতের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে একজনের নাম জানা গেছে। তিনি হলেন- দুপচাঁচিয়া উপজেলার বীরকেদার গ্রামের মনিরুল ইসলাম (২৪)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রোববার সকাল ১১টা থেকেই বগুড়া শহরের সাতমাথা মোড়ে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তখন একই স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে আওয়ামী লীগের লোকজন সরে যায়। তখন পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা সারা শহরেই ছড়িয়ে পড়ে। শহরের তিন নম্বর রেল ঘুণ্টি ও কাঁঠালবাড়ী এলাকায় দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাদের মরদেহ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. ওয়াদুদ জানান। তবে তিনি তিনজনের নাম জানাতে পারেনি। তিনি বলেন, আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
এছাড়া, শেরপুরে ২জন, ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ১ জন, সাভারে ১ জন, জয়পুরহাটে ১ জন, হবিগঞ্জে ১ জন ও বরিশালে ১ নিহত হয়েছে।
সারাদেশ থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:-
১৪ পুলিশ সদস্য নিহত: সারা দেশে ১৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন। কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জে নিহত হয়েছেন একজন।
রাজধানীতে নিহত ৫ জন: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ চলছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের নেতা এবং আরেকজন শিক্ষার্থী। নিহত আওয়ামী লীগ নেতার নাম আনোয়ারুল ইসলাম। ষাটোর্ধ্ব এই প্রকৌশলী ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। জিগাতলায় সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী (২৩)। তিনি রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। আব্দুল্লাহ পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার এলাকার কলতা বাজারের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আবু বকর। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া বলেন, নিহত ব্যক্তির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। বিকেলে ফার্মগেট এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে আহত হয়ে তৌহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবক নিহত হয়েছে। তিনি মহাখালীর ডিএইট কনসালটেন্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, মৃত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তৌহিদুলের মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছেন। এদিকে মিরপুরে সংঘর্ষ চলাকালে মিরাজ হোসেন (২৩) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আজমল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অন্দিরা জানান, বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ওই যুবক মারা যান। তিনি মিরপুর ৬ নম্বরের এ ব্লকে থাকতেন। বিকেলে গুলিস্তান থেকে জহির উদ্দীন নামে এক ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি কুমিল্লায়। প্রাথমিকভাবে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
লক্ষ্মীপুরে নিহত ৮ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক কলেজছাত্রসহ আটজন নিহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মো. সোহেল রানা গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে জেলা শহরের উত্তর তেমুহনী থেকে ঝুমুর পর্যন্ত এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে তিনটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।
মুন্সীগঞ্জে নিহত ৩ জন: মুন্সীগঞ্জ শহরের থানারপুল চত্বরে আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে গতকাল রোববার সকাল ১০টার দিকে সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- রিয়াজুল ইসলাম (৩৫), মেহেদি হাসান (৩২), মো. সজল (২২)। এ সময় গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কমপক্ষে পাঁচটি মোটরসাইকেল।
রংপুরে নিহত ৪ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে রংপুরে আরও একজন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারজনে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। তাঁরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারাধন রায় ও তাঁর ভাগনে শ্যামল রায়। সংঘর্ষ চলাকালে শহরের কালিবাড়ি গেটের পাশে তাঁদের লাশ পড়ে থাকতে দেখে লোকজন। কাউন্সিলরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাহমুদুর রহমান। নিহত বাকি দুজন হলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য খায়রুল ইসলাম ও জেলা যুবলীগের কর্মী মাসুম হোসেন। রংপুর মেডিকেলে কলেজ হাসপাতাল মর্গের দায়িত্বে নিয়োজিত সর্দার আবদুল জলিল তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে শহরের সিটি বাজার ও জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটের সামনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এদিকে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের নাম পাওয়া যায়নি।
মাগুরা নিহত ৪ জন: মাগুরা শহরের ঢাকা রোড়ে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বী নিহত ও ফরহাদ হোসেন (২৩)সহ আরো দুইজন নিহত হন। গতকাল রোববার সকাল ১১টার দিকে এ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন তিন পুলিশ সদস্যসহ ১০ জন।
কুমিল্লায় নিহত ৩ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে দেবিদ্বারে একজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুর দেড়টার দিকে দেবিদ্বার পৌর এলাকার বানিয়াপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওই ব্যক্তির নাম আবদুল্লা রুবেল (৩৩)। তিনি পেশায় গাড়িচালক। তিনি বারেরা এলাকার ইউনুছ মিয়ার ছেলে। এছাড়াও এক পুলিশ কনস্টেবলসহ আরো এক আন্দোলকারী নিহত হয়েছে।
পাবনায় নিহত ৩ জন: পাবনায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের বিচার ও সরকারের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচিতে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল রোববার বেলা ১টার দিকে পাবনা শহরের ট্রাফিক মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে সহকারী পরিচালক ডা. রফিকুল ইসলাম রিমন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতরা হলেন- পাবনা সদরের চর বলরামপুরের জাহিদুল ইসলাম (১৮) ও পাবনা শহরের আরিফপুর হাজীরহাট এলাকার মাহিবুল হোসন (১৬)।
সিলেটে নিহত ২ জন: সিলেটের গোলাপগঞ্জে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর গুলিতে দু’জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক লোক। গতকাল রোববার দপুর আড়াইটার দিকে গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার ধারাবহরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে গুলিতে তারা নিহত হন। নিহতরা হলেন-ধারাবহর গ্রামের মো. মকবুল আলীর ছেলে ব্যবসায়ী তাজ উদ্দিন (৪৩) ও শিলঘাটের বাসিন্দা সানি আহমদ (১৮)।
নরসিংদীতে নিহত ৬ জন: নরসিংদীর মাধবদীতে আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে এক ইউপি চেয়ারম্যানসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা সবাই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বা সমর্থক বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নেতাকর্মীরা। গতকাল রোববার দুপুর ১টার দিকে মাধবদী বাজার মসজিদে সামনে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শহীদুল ইসলাম সোহাগ। নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মাধবদী থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহীন (৩৭), সদর থানা সেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মনিরুজ্জামান ভূইয়া (৪৮), সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ছোটভাই ছোট গদাইচর এলাকার আবু সায়ীদের ছেলে দেলোয়ার হোসেন দেলু (৪৮), মাধবদীর আলগী এলাকার আওয়ামী লীগের সমর্থক শাহাজাহান মিয়ার ছেলে কামাল মিয়া (৪৫), মাধবদী শ্রমিকলীগ নেতা আনিসুর রহমান সোহেল (৪৩)। অজ্ঞাত একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
সিরাজগঞ্জে ১৩ পুলিশসহ নিহত ২২ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগের প্রথম দিন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্য হত্যার শিকার হয়েছে। এ তথ্য জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা কামরুল আহসান বলেন, এর বাইরে কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানায় ঢুকে এক পুলিশ কনস্টেবলকে পিটিয়ে হত্যা করেছে আন্দোলনকারীরা। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি বিজয় বসাক বলেন, “আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে এসে এনায়েতপুর থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। একপর্যায়ে তারা থানায় আগুন দেয় এবং সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করে।” প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনকারী থানার দক্ষিণে জমায়েত হয়। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন ছিলেন। এছাড়া, সিরাজগঞ্জ শহর ও রায়গঞ্জ উপজেলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় ৯ জন নিহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হাসান খান তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিরাজগঞ্জ শহরে মারা যাওয়া তিনজন বিএনপির নেতাকর্মী বলে দাবি করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। এদিকে, জেলার রায়গঞ্জে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মেহেদী হাসান ইলিয়াস এবং সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন সরকার নিহত হয়েছে। এমনটি দাবি করেছেন চাঁন্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেলিম আহমেদ। নিহত আল-আমিন সরকারের বড় ভাই হলেন সেলিম আহমেদ। এছাড়া, এই উপজেলার ধর্মগাছা উইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার লিটন, একই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হাসনাত টিটু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম ও স্থানীয় দৈনিক খবর পত্র পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি প্রদীপ কুমার মারা গেছেন। তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ হাসান খান।
ভোলা নিহত ৩ জন: ভোলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সংঘর্ষে গতকাল রোববার তিনজন নিহত হয়েছেন। সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সংঘর্ষে পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিএনপির দাবি, তাদের দুই কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দাবি, তাঁদের এক যুবলীগ কর্মীকে বিক্ষোভকারীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। ভোলা সদর হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে পুলিশ সদস্য জহিরুল ইসলামসহ ১৫ জন ভর্তি হয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু বলেন, বিক্ষোভকারীরা যুবলীগের কর্মী মো. মিলনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রাইসুল আলম বলেন, পুলিশের গুলিতে ও আওয়ামী লীগের হামলায় তাঁদের দুজন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ নিহত ৪ জন: কিশোরগঞ্জে বিক্ষোভকারী, পুলিশ ও ছাত্রলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ। এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল ইসলামের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। নিহত চারজনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁদের একজন হলেন সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াল এলাকার দিলু মিয়ার ছেলে মো. মবিন মিয়া (৩২)। তিনি যুবলীগের কর্মী বলে জানা গেছে। বাকি দুজন হলেন সদরের যশোদল বীরদাম পাড়া এলাকার অঞ্জনা বেগম (৩৫) ও জেলা শহরের নিউ টাউন এলাকার জুয়েল মিয়া (৩০)। আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি।
ফেনী নিহত ৭ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগের মধ্যে ফেনী শহরে ছাত্র-জনতার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, পথচারী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। ফেনী জেনারেল হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। নিহতরা হলেন- ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ (১৯), সদর উপজেলার দক্ষিণ কাশিমপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে শিহাব উদ্দিন (১৮), ফাজিলপুর ইউনিয়নের রফিকুল ইসলামের ছেলে সাইদুল ইসলাম (২০), সোনাগাজী উপজেলার চর মজলিশপুর এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে শকিব (২১)। এছাড়া, সরোয়ার হোসেন মাসুদ, আরাফাত এবং বিপ্লব নামে অপর ৩ জনের লাশ মিললেও বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহতদের মধ্যে ৫ জনের লাশ মর্গে রয়েছে বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আরএমও আসিফ ইকবাল। এছাড়া, শ্রাবণ নামে অপর এক শিক্ষার্থীর লাশ তার স্বজনরা নিয়ে গেছে বলে নিহতের পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বগুড়ায় নিহত ৪ জন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকারবিরোধী অসহযোগের সময় বগুড়ায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষের সময় গুলিতে চারজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার বগুড়া সদর ও দুপচাঁচিয়া উপজেলায় এসব নিহতের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে একজনের নাম জানা গেছে। তিনি হলেন- দুপচাঁচিয়া উপজেলার বীরকেদার গ্রামের মনিরুল ইসলাম (২৪)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রোববার সকাল ১১টা থেকেই বগুড়া শহরের সাতমাথা মোড়ে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তখন একই স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে আওয়ামী লীগের লোকজন সরে যায়। তখন পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা সারা শহরেই ছড়িয়ে পড়ে। শহরের তিন নম্বর রেল ঘুণ্টি ও কাঁঠালবাড়ী এলাকায় দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাদের মরদেহ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. ওয়াদুদ জানান। তবে তিনি তিনজনের নাম জানাতে পারেনি। তিনি বলেন, আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
এছাড়া, শেরপুরে ২জন, ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ১ জন, সাভারে ১ জন, জয়পুরহাটে ১ জন, হবিগঞ্জে ১ জন ও বরিশালে ১ নিহত হয়েছে।