
গাজীপুর, বগুড়া, কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ইটপাটকেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিতে রণক্ষেত্র পরিণত হয়। বিক্ষোভকারীরা গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনায় পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দুটি গাড়িতে আগুন দেয়। বগুড়ায় সাতমাথা এলাকায় সন্ধ্যার পর দফায় দফায় সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্র পরিণত হয়। কুমিল্লার চান্দিনায় এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এছাড়াও গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসায় হামলা চালানো হয়েছে। এসময় তার বাসায় হামলা চালিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাংচুর করা হয়। বর্তমানে ওই বাসায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনায় গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে পুলিশ। আন্দোলনকারীরা পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়া পুলিশের দুটি গাড়িতেও দেয়া হয় আগুন।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল শনিবার বেলা ১১টা থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মাওনা চৌরাস্তার পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে অবস্থান নেন। এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাওনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান নিলে দেখা দেয় উত্তেজনা। কিছু সময় পর ছাত্ররা মিছিল নিয়ে মাওনা ফ্লাইওভার এলাকায় যান। তারা সেখানে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে সেøাগান দিতে থাকেন। পরে ছাত্ররা পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে ফিরে যান। এর কিছুসময় পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন। এরপর ফের ছাত্ররা মিছিল নিয়ে মাওনা চৌরাস্তায় আসেন। তারা মাওনা হাইওয়ে, গাজীপুর জেলা পুলিশ, শ্রীপুর থানা পুলিশের তিনটি বক্সে ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে মাওনা-শ্রীপুর সড়কের ‘ভাই ভাই সিটি কমপ্লেক্সে’র সামনে গেলে ছাত্রদের ধাওয়া দেয় পুলিশ। তাদের ওপর টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ওই কমপ্লেক্সে থাকা পুলিশের দুটি গাড়িসহ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর চালান ও আগুন দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো মাওনা চৌরাস্তার চারপাশে। এসময় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেয়।
মাওনা পিয়ার আলী ডিগ্রি কলেজের ছাত্র রাফিউল ইসলাম বলেন, আমাদের ভাইদের হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবো। যাদের হাত আমাদের ভাইদের রক্তে রঞ্জিত তাদের সঙ্গে কোনো আপস নেই। ডুয়েটের শিক্ষার্থী ইকবাল হোসেন বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত। আমাদের সবগুলো দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই।
এ বিষয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিউল আলম বলেন, পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ বক্স পুড়িয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতিকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ।
অপরদিকে বগুড়ায় বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী আহত হন। গতকাল শনিবার বিকেল চারটার দিকে শহরের সাতমাথা থেকে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণকালে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, সরকার পতনের একদফা দাবিতে বেলা আড়াইটা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাজারো শিক্ষার্থী-জনতা সাতমাথা এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের মিছিল ও সেøাগানে সাতমাথা এলাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বেলা তিনটার দিকে সাতমাথা থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় জিলা স্কুলের ফটকের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ মিছিলটি জিলা স্কুল অতিক্রম করার সময় পুলিশকে দেখে ‘ভুয়া, ভুয়া’ সেøাগান দেয়া হয়। এ সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিলে মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, বোতল ও জুতা নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীরা পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়েন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জিলা স্কুলের ভেতরে অবস্থান নেন।
মিছিলের একাংশ সার্কিট হাউস মোড় অতিক্রম করার সময় পুলিশ প্লাজার সামনে পুলিশের সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল ছোড়েন। পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা উত্তেজিত হয়ে সার্কিট হাউসের অভ্যর্থনাকক্ষের কাচ ভাঙচুর করেন। দুই পক্ষের সংঘর্ষে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী আহত হন। পরে জলেশ্বরীতলা, সাতমাথা, সার্কিট হাউস মোড়, জেলা জজ আদালতের সামনের সড়ক, কালীবাড়ী মোড়সহ গোটা শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে কুমিল্লার চান্দিনায় এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। গতকাল শনিবার দুপুর পৌনে ১টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা-বাগুর বাস স্টেশন এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী লেনে ওই গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত আত্মরক্ষা করেন চান্দিনা উপজেলার এসিল্যান্ড সৌম্য চৌধুরী এবং তার গাড়িচালক। এ ঘটনায় হামলাকারীরা কেউ শিক্ষার্থী নয় বলে দাবি করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)।
জানা গেছে, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পার্শ্ববর্তী দেবিদ্বার উপজেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় চান্দিনার এসিল্যান্ড আন্দোলনকারীদের মাঝে আটকা পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই আন্দোলনরতরা এসি ল্যান্ডের গাড়িতে ভাঙচুর চালান। হামলার মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত প্রাণ রক্ষা করেন এসি-ল্যান্ড ও তার গাড়িচালক। ভাঙচুরের এক পর্যায়ে গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ সময় চান্দিনা-বাগুর বাস স্টেশন থেকে মহাসড়কের উভয় পাশে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়।
এ ব্যাপারে ইউএনও জাবের মো. সোয়াইব বলেন, আন্দোলনে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও আমরা বুঝিয়ে বলায় তারা বিক্ষোভ শেষে মহাসড়ক থেকে সরে যান। দুষ্কৃতকারীরা এসিল্যান্ডের গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে। তারা কেউ শিক্ষার্থী নয়।
এছাড়াও কুমিল্লা নগরীতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে হামলা ও গুলির অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে নগরীর পুলিশ লাইনস এলাকায় শিক্ষার্থীদের মিছিলের পেছন থেকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয়। এ সময় মুহুর্মুহু গুলির শব্দ শোনা গেছে। হামলার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নগরীর রাণীর দিঘির দক্ষিণ পাড় এবং বাগিচাগাঁও এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের মারধর ও গুলি করেন। বিকাল ৩টা পর্যন্ত পাঁচ জন গুলিবিদ্ধসহ কমপক্ষে ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাগিচাগাঁও ও পুলিশ লাইনস এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করতে দেখা যায়। এ ছাড়াও এ সময় হকিস্টিক, লাঠি ও স্টাম্প দিয়ে হামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী জোবায়দা ইয়াসমিন মুমু বলেন, সারা দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে আজ আমরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছি। এখানে আমাদের একটাই দাবি, সরকারের পদত্যাগ। সরকারের পদত্যাগ ছাড়া শিক্ষার্থী সমাজ আর ঘরে ফিরবে না। কুমিল্লার সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে অবস্থান করে আমাদের বাধা দিচ্ছে।
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিকুল্লাহ খোকন বলেন, আমরা কারও ওপর হামলা করিনি। ছাত্রদের সঙ্গে শিবির ও বিএনপির লোকরা একাকার হয়ে দেশকে নাশকতার দিকে নিতে চায়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি।
নোয়াখালীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে দোকানপাট। তবে এ সময় হতাহতের কোনও ঘটনা ঘটেনি। এ সময় পুলিশের কোনও সদস্যকে শহরে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। গতকাল শনিবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে এই অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরী বলেন, এ হামলায় কোটা আন্দোলনকারীরা নয়, দুষ্কৃতকারী ও দুর্বৃত্তরা জড়িত ছিল। এরা এখন ছাত্র আন্দোলন নয়, আছে জ্বালানো-পোড়ানো নিয়ে। নোয়াখালী পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা পুরো ঘটনা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি। আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে লাগানো আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল পৌঁছালে সেখান থেকে একটি অংশ মেয়র গলির দিকে অগ্রসর হয়। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর ওয়াসার মোড়ের নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। এরপর শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চট্টগ্রামের চশমা হিলের বাসায় হামলা চালানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশ উত্তর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর বলেন, মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার ঘটনা শোনার পর আমরা ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি।
নগর পুলিশের আরেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার কাজী তারেক আজিজ বলেন, মিছিল থেকে শিক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে হামলা হয়েছে। তারা কয়েকটি পুলিশ বক্সও ভাঙচুর করেছে। শিক্ষামন্ত্রীর বাসা দুই নম্বর গেটের মূল সড়ক থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। নওফেল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে।
জানা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনায় গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে পুলিশ। আন্দোলনকারীরা পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়া পুলিশের দুটি গাড়িতেও দেয়া হয় আগুন।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল শনিবার বেলা ১১টা থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মাওনা চৌরাস্তার পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে অবস্থান নেন। এদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাওনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান নিলে দেখা দেয় উত্তেজনা। কিছু সময় পর ছাত্ররা মিছিল নিয়ে মাওনা ফ্লাইওভার এলাকায় যান। তারা সেখানে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে সেøাগান দিতে থাকেন। পরে ছাত্ররা পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে ফিরে যান। এর কিছুসময় পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন। এরপর ফের ছাত্ররা মিছিল নিয়ে মাওনা চৌরাস্তায় আসেন। তারা মাওনা হাইওয়ে, গাজীপুর জেলা পুলিশ, শ্রীপুর থানা পুলিশের তিনটি বক্সে ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে মাওনা-শ্রীপুর সড়কের ‘ভাই ভাই সিটি কমপ্লেক্সে’র সামনে গেলে ছাত্রদের ধাওয়া দেয় পুলিশ। তাদের ওপর টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ওই কমপ্লেক্সে থাকা পুলিশের দুটি গাড়িসহ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর চালান ও আগুন দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো মাওনা চৌরাস্তার চারপাশে। এসময় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেয়।
মাওনা পিয়ার আলী ডিগ্রি কলেজের ছাত্র রাফিউল ইসলাম বলেন, আমাদের ভাইদের হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবো। যাদের হাত আমাদের ভাইদের রক্তে রঞ্জিত তাদের সঙ্গে কোনো আপস নেই। ডুয়েটের শিক্ষার্থী ইকবাল হোসেন বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত। আমাদের সবগুলো দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই।
এ বিষয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিউল আলম বলেন, পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ বক্স পুড়িয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতিকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ।
অপরদিকে বগুড়ায় বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী আহত হন। গতকাল শনিবার বিকেল চারটার দিকে শহরের সাতমাথা থেকে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণকালে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, সরকার পতনের একদফা দাবিতে বেলা আড়াইটা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাজারো শিক্ষার্থী-জনতা সাতমাথা এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের মিছিল ও সেøাগানে সাতমাথা এলাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বেলা তিনটার দিকে সাতমাথা থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় জিলা স্কুলের ফটকের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ মিছিলটি জিলা স্কুল অতিক্রম করার সময় পুলিশকে দেখে ‘ভুয়া, ভুয়া’ সেøাগান দেয়া হয়। এ সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিলে মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, বোতল ও জুতা নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীরা পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়েন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জিলা স্কুলের ভেতরে অবস্থান নেন।
মিছিলের একাংশ সার্কিট হাউস মোড় অতিক্রম করার সময় পুলিশ প্লাজার সামনে পুলিশের সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল ছোড়েন। পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা উত্তেজিত হয়ে সার্কিট হাউসের অভ্যর্থনাকক্ষের কাচ ভাঙচুর করেন। দুই পক্ষের সংঘর্ষে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী আহত হন। পরে জলেশ্বরীতলা, সাতমাথা, সার্কিট হাউস মোড়, জেলা জজ আদালতের সামনের সড়ক, কালীবাড়ী মোড়সহ গোটা শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে কুমিল্লার চান্দিনায় এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। গতকাল শনিবার দুপুর পৌনে ১টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা-বাগুর বাস স্টেশন এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী লেনে ওই গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত আত্মরক্ষা করেন চান্দিনা উপজেলার এসিল্যান্ড সৌম্য চৌধুরী এবং তার গাড়িচালক। এ ঘটনায় হামলাকারীরা কেউ শিক্ষার্থী নয় বলে দাবি করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)।
জানা গেছে, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পার্শ্ববর্তী দেবিদ্বার উপজেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় চান্দিনার এসিল্যান্ড আন্দোলনকারীদের মাঝে আটকা পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই আন্দোলনরতরা এসি ল্যান্ডের গাড়িতে ভাঙচুর চালান। হামলার মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত প্রাণ রক্ষা করেন এসি-ল্যান্ড ও তার গাড়িচালক। ভাঙচুরের এক পর্যায়ে গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ সময় চান্দিনা-বাগুর বাস স্টেশন থেকে মহাসড়কের উভয় পাশে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়।
এ ব্যাপারে ইউএনও জাবের মো. সোয়াইব বলেন, আন্দোলনে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও আমরা বুঝিয়ে বলায় তারা বিক্ষোভ শেষে মহাসড়ক থেকে সরে যান। দুষ্কৃতকারীরা এসিল্যান্ডের গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দিয়েছে। তারা কেউ শিক্ষার্থী নয়।
এছাড়াও কুমিল্লা নগরীতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে হামলা ও গুলির অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে নগরীর পুলিশ লাইনস এলাকায় শিক্ষার্থীদের মিছিলের পেছন থেকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয়। এ সময় মুহুর্মুহু গুলির শব্দ শোনা গেছে। হামলার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নগরীর রাণীর দিঘির দক্ষিণ পাড় এবং বাগিচাগাঁও এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের মারধর ও গুলি করেন। বিকাল ৩টা পর্যন্ত পাঁচ জন গুলিবিদ্ধসহ কমপক্ষে ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাগিচাগাঁও ও পুলিশ লাইনস এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করতে দেখা যায়। এ ছাড়াও এ সময় হকিস্টিক, লাঠি ও স্টাম্প দিয়ে হামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী জোবায়দা ইয়াসমিন মুমু বলেন, সারা দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে আজ আমরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছি। এখানে আমাদের একটাই দাবি, সরকারের পদত্যাগ। সরকারের পদত্যাগ ছাড়া শিক্ষার্থী সমাজ আর ঘরে ফিরবে না। কুমিল্লার সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে অবস্থান করে আমাদের বাধা দিচ্ছে।
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিকুল্লাহ খোকন বলেন, আমরা কারও ওপর হামলা করিনি। ছাত্রদের সঙ্গে শিবির ও বিএনপির লোকরা একাকার হয়ে দেশকে নাশকতার দিকে নিতে চায়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি।
নোয়াখালীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে দোকানপাট। তবে এ সময় হতাহতের কোনও ঘটনা ঘটেনি। এ সময় পুলিশের কোনও সদস্যকে শহরে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। গতকাল শনিবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে এই অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরী বলেন, এ হামলায় কোটা আন্দোলনকারীরা নয়, দুষ্কৃতকারী ও দুর্বৃত্তরা জড়িত ছিল। এরা এখন ছাত্র আন্দোলন নয়, আছে জ্বালানো-পোড়ানো নিয়ে। নোয়াখালী পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা পুরো ঘটনা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি। আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে লাগানো আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল পৌঁছালে সেখান থেকে একটি অংশ মেয়র গলির দিকে অগ্রসর হয়। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর ওয়াসার মোড়ের নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। এরপর শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চট্টগ্রামের চশমা হিলের বাসায় হামলা চালানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশ উত্তর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর বলেন, মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার ঘটনা শোনার পর আমরা ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি।
নগর পুলিশের আরেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার কাজী তারেক আজিজ বলেন, মিছিল থেকে শিক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে হামলা হয়েছে। তারা কয়েকটি পুলিশ বক্সও ভাঙচুর করেছে। শিক্ষামন্ত্রীর বাসা দুই নম্বর গেটের মূল সড়ক থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। নওফেল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে।