
* কারও পেটে, কারও পিঠে, কারও পায়ে গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে
* আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ছাড়াও রিকশাচালক, দিনমজুর, চাকরিজীবী রয়েছেন
গত শুক্রবার দুপুরে খাওয়ার পর ছাদে খেলতে গিয়েছিল পরিবারের সবার আদরের মেয়ে রিয়া গোপ। খানিক পরেই রাস্তায় সংঘর্ষ বাধে। বাসার সামনে হইহুল্লা শুনে বাবা ছুটে যান ছাদ থেকে মেয়েকে ঘরে আনতে। মেয়েকে কোলে নিতেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মাথায়। মুহূর্তেই ছোট্ট দেহটি ঢলে পড়ে বাবার কোলে। এদিন রিয়া গোপের মতো কারও পেটে গুলি, কারও পিঠে গুলি, কারও পায়ে গুলি- শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ২০ জনের মতো আহতের প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ। কারও লেগেছে একটি গুলি, কারও লেগেছে দুটি গুলি। অনেক ছররা গুলির ক্ষত নিয়েও ভর্তি কেউ কেউ।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদরের নয়ামাটি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতো সাড়ে ছয় বছর বয়সী মেয়েটির নাম রিয়া গোপ। সেদিন বাড়ির ছাদে গুলিবিদ্ধ রক্তে ভেজা মেয়েকে নিয়ে তখনই বাবা ছোটেন হাসপাতালে। বাসার কাছের ক্লিনিকে চিকিৎসকেরা বেশিক্ষণ রাখলেন না। পাঠিয়ে দিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে রাতেই মাথায় অস্ত্রোপচার হয়। সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন চিকিৎসকেরা। মেয়েটিকে রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। বলা হয়, ৭২ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাবে না। গত শুক্রবার বিকেলে গুলি লাগে মেয়েটির। সেদিন রাতে অস্ত্রোপচারের পর শনিবার পার হয়। রোববার ও সোমবার আইসিইউতে একটু একটু করে আঙুল নাড়ছিল মেয়েটি। স্বজনদের বুকে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু বুধবার সকালের দিকে মেয়েটির সে নড়াচড়াও থেমে যায়। সবাইকে কাঁদিয়ে মেয়েটি চলে যায় না-ফেরার দেশে। সাড়ে ছয় বছর বয়সী মেয়েটির নাম রিয়া গোপ। মা-বাবার সঙ্গে থাকতো নারায়ণগঞ্জ সদরের নয়ামাটি এলাকায়। চারতলা বাড়ির ওপরের তলায় থাকত ওরা। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের রেশ নারায়ণগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছিল। শুক্রবার বিকাল ৩টায় নয়ামাটি এলাকায় চলছিল সংঘাত, আর গোলাগুলি। সেই গুলিতেই প্রাণ গেল ছোট্ট রিয়ার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়, ‘গানশট ইনজুরি’। দীপক কুমার গোপ ও বিউটি ঘোষ দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল রিয়া। স্থানীয় একটি রড-সিমেন্টের দোকানে ব্যবস্থাপকের কাজ করেন দীপক। বিয়ের পাঁচ বছর পর এ দম্পতির ঘর আলো করে আসে রিয়া। এ বছরই ভর্তি হয়েছিল স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বুধবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে অপেক্ষা করছিলেন দীপক কুমার। সঙ্গে ছিলেন আরও স্বজনেরা। কথা হয় রিয়ার এক স্বজনের সঙ্গে। তিনি বললেন, বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে বাবার কোলেই গুলিবিদ্ধ হয় মেয়েটা। এরচেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে! বুধবার রিয়ার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার কিছু পরে। মর্গ থেকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগে স্ট্রেচারে রাখা মেয়েটির মুখ দেখানো হয় স্বজনদের। মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। রিয়ার ছোট খালা আহাজারি করতে করতে বলেন, আমার ছোট মা-রে, তুই আমাদের ছেড়ে চলে গেলি! তোরে ছাড়া আমরা কেমনে বাঁচব? একমাত্র মেয়েকে হারানোর শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন দীপক কুমার। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলছিলেন, কোথা থেকে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝি নাই। আমার কোলেই মেয়ের মাথা থেকে রক্ত বেয়ে পড়ছিল। বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
জানালায় দাঁড়াতেই গুলি এসে কেড়ে নিল শিশুটিকে: জানালার পাশেই সামিরের পড়ার টেবিল। পড়ার বই, প্লাস্টিকের খেলনা, ঘরের মেঝেতে এখনো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। গত শুক্রবার জানালা দিয়ে আসা একটি বুলেট সামিরের চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার খুলি ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ১১ বছরের সাফকাত সামির। ওই দিন (১৯ জুলাই) কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে মিরপুরে কাফরুল থানার সামনের সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ঢুকছিল সামিরের ঘরে। জানালা বন্ধ করতে গেলে বাইরে থেকে গুলি এসে বিদ্ধ করে শিশুটিকে। গুলিটি তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘরে ছিল তার চাচা মশিউর রহমান (১৭)। তার কাঁধেও গুলি লাগে। মঙ্গলবার সামিরদের বাসায় গিয়ে নির্মম মৃত্যুর চিহ্ন দেখা যায়। নানাবাড়ি আশুলিয়ায় একমাত্র সন্তানকে দাফন করে মা ফারিয়া ইবনাত (২৮) সেখানেই রয়ে গেছেন। বাবা সাকিবুর রহমান (৩৪) মিরপুরের ছোট্ট বাসাটিতে ফিরে এসে সন্তানের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছোট চাকরি করেন। শিশু সামির একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। সাকিবুর রহমানের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তার চোখের পানি থামছিলই না। তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেলে তিনি পাশেই বকুলতলা মাঠের কাছে ছিলেন। হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি হচ্ছিল দেখে বাসার দিকে রওনা দেন তিনি। এমন সময় এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে বাসায় গুলি ও রক্তের সংবাদ পান। দ্রুত বাসায় এসে দেখেন, তাঁর একমাত্র সন্তান রক্তাক্ত হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। তাকে কোলে নিয়ে ছুটে যান পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। চিকিৎসক বলেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই। সন্তানের লাশ হাসপাতালে থাকা অবস্থায় এলাকার মুরব্বি ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য মো. ইসমাইল হোসেন হাজির হন। তিনি সাকিবুর রহমানকে নিয়ে যান কাফরুল থানায়। তিনি বোঝাতে থাকেন, সন্তানের লাশ দ্রুত দাফন করা বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব। আইনি জটিলতায় না গিয়ে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন তিনিসহ স্থানীয় মুরব্বিরা। বাবা সাকিবুর মুরব্বিদের কথা মেনে আর মামলায় যাননি। ইসমাইল হোসেনের কাছে ওই রাতের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই সময় আমাদের কাছে দুটি বিকল্প ছিল। তৎক্ষণাৎ লাশ দাফন না করে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য জটিলতার মধ্যে যাওয়া। অথবা এলাকাবাসী লাশ নিয়ে মিছিল করে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, সেই দাবির প্রতি সমর্থন জানানো। তাই পুলিশের কথা শুনে আমরা ‘মামলা করব না, অভিযোগ নেই’ এমন চিঠিতে সই করতে সাকিবুরকে বোঝাই। রাতে এলাকার একদল তরুণ এসে হাসপাতালের বাইরে হাজির হন। তারা লাশ নিয়ে মিছিল করতে চান। মৃত্যুর বিচার চেয়ে প্রশাসনের কাছে যেতে চান এলাকাবাসী। এ পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে বাবা সাকিবুরের চোখেমুখে সেই সময়ের ছায়া প্রবল হতে থাকে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলতে থাকেন, ‘থানার লোকজন আমাকে একটি লিখিত ফরম সামনে তুলে ধরেন। তারা বলেন এখানে স্বাক্ষর করেন; নয়তো তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ, প্রমাণ হাজির করাসহ অনেক ঝামেলায় পড়তে হবে। লাশ নিয়ে রাজনীতি হবে। সেখানে কী লেখা ছিল জানতে চাইলে সাকিবুর বলেন, এ ঘটনায় আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি মামলা করতে চাই না। আমি আমার ছেলের লাশ নিয়ে দাফন করতে চলে যাব। এসব কথা লেখা একটি টাইপ করা ফরম আমার সামনে দিলে আমি শুধু কয়েকটি বিষয় ভেবেছি, আমি সন্তানকে হারিয়েছি, সে অনেক কষ্ট করে মারা গেছে। এখন যদি সময়মতো কবরও দিতে না পারি, তাহলে এর চেয়ে কষ্ট আর নেই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে কাগজে স্বাক্ষর করি। সাকিবুর বলেন, আমরা সরকারবিরোধী কোনো কাজ করিনি। প্রশাসনের নিয়ম মেনেছি। কারফিউ জারি করার পর আমরা পরিবারের সবাইকে ঘরের মধ্যে রেখেছি। সেই ঘরের মধ্যেও আমরা যদি নিরাপদে থাকতে না পারি, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমি আওয়ামী লীগ করি, পরিবার ও এলাকার বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগ সমর্থন করে। গত নির্বাচনে আমরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছি। এখানে বড় ধরনের গন্ডগোল করার মতো কেউ নেই। আমাদের কেন এমন হবে! আমাদের বাসায় কেন গুলি করবে! এটা কোন নিয়ম। এসব কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন সাকিবুর।
পেটে গুলি, বুকে গুলি, পায়ে গুলি, কাতরাচ্ছেন তারা: কারও পেটে গুলি, কারও পিঠে গুলি, কারও পায়ে গুলি—শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ২০ জনের মতো আহতের প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ। কারও লেগেছে একটি গুলি, কারও লেগেছে দুটি গুলি। অনেকগুলো ছররা গুলির ক্ষত নিয়েও ভর্তি কেউ কেউ। হাসপাতালটিতে গত মঙ্গলবার গিয়ে আহতদের মধ্যে দেখা গেল একটি কিশোরকে। তার দুই পায়ে দুটি গুলি লেগেছে। পা দুটো ব্যান্ডেজ করা। পাশে বসা তার মামা। গিয়ে কথা বলতে চাইলে মামা সবকিছুই বললেন। তবে অনুরোধ জানালেন, তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় যেন প্রকাশ করা না হয়। আহত ব্যক্তির মামার দাবি, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুরে সংঘর্ষের সময় বাসায় ফিরতে গিয়ে ১৯ জুলাই (শুক্রবার) গুলিবিদ্ধ হয় তার ভাগনে। ঘটনাস্থল মিরপুর-১০ নম্বর সেকশন। আহত কিশোরটি স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আহতের মামা আরও বলেন, তার ভাগনের দুই পায়ে যে দুটি গুলি লেগেছে, তা রাবার বুলেট বা ছররা গুলি নয়। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীটির ততটা ঝুঁকি নেই। তবে কারও কারও পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাদের একজন জাকির শিকদার। তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগে ভর্তি। বয়স ২৭ বছর। সংঘর্ষের মধ্যে ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ঢাকার মধ্যবাড্ডা এলাকায় তার বাঁ পায়ে গুলি লাগে। পা–টি ইতোমধ্যে অস্ত্রোপচার করে কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকেরা। জাকির নিজেকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী বলে উল্লেখ করেন। গতকাল তিনি বলেন, শরীরের ব্যথা তো কিছু না ভাই। আমি তো পঙ্গু হয়ে গেলাম! পরিবারের বোঝা হয়ে গেলাম। তিনি দাবি করেন, কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে তার পায়ে গুলি লাগে। বৃহস্পতিবার পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গুলিবিদ্ধ ৩৫ জন ভর্তি। এর মধ্যে সাতজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। তাদের সবার শরীরে লেগেছিল একটি করে গুলি। জাকিরের বাড়ি মাদারীপুর সদরে। তার বাবা শাহজাহান শিকদার ২০০৭ সালে মারা যান। চার ভাই, এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোট ভাই ও মাকে নিয়ে তিনি মধ্যবাড্ডায় ভাড়া থাকেন। পঙ্গু হাসপাতালে যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তাঁর মা হনুফা বেগম পাশে বসে চোখ মুছছিলেন। তিনি শুধু বলছিলেন, আমার ছেলে (জাকির) সবাইকে দেখে রেখেছিল, এখন আমার ছেলেকে কে দেখবে? সরেজমিনে গত মঙ্গলবার পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গুলিবিদ্ধ ৩৫ জন ভর্তি। এর মধ্যে সাতজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। তাঁদের সবার শরীরে লেগেছিল একটি করে গুলি। আহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন শিক্ষার্থী। ৩৫ জনের মধ্যে ছিল ৫টি শিশু ও কিশোর। ১৯ জুলাই বাড্ডা থেকে আসা মুহিব্বুল্লাহ (৩৮) নামের একজনের ছিল বুকের এক পাশে গুলির আঘাত। তিনি গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক বনানী শাখায় নামাজ পড়ান। নীরবের ভাষ্য, ঘটনার দিন তিনি রিকশা চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। তিনি রিকশা নিয়ে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। তখন পুলিশের ছোড়া গুলি তার শরীরের বিভিন্ন অংশে লাগে। আহতদের একজন মো. সিফাত (১৪)। সে মিরপুরের পল্লবী মাজেদুল ইসলাম মডেল হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে জানায়, ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) রাত ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় তার ডান পায়ে গুলি লাগে। সিফাতের বাবা মো. সিরাজ একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মী। তিনি বলেন, দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি পল্লবীতে থাকেন। ঘটনার দিন তাঁর ছেলে সিফাত এক বন্ধুর সঙ্গে মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়েছিল। বাসায় ফেরার পথে রাস্তা পারাপারের সময় তার পায়ে গুলি লাগে। পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, সেখানে ভর্তি রোগীরা সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের আনা হয়েছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বাড্ডা, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা থেকে। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ছাড়াও রিকশাচালক, দিনমজুর, চাকরিজীবী, গাড়িচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। একজন শিক্ষকও রয়েছেন।
* আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ছাড়াও রিকশাচালক, দিনমজুর, চাকরিজীবী রয়েছেন
গত শুক্রবার দুপুরে খাওয়ার পর ছাদে খেলতে গিয়েছিল পরিবারের সবার আদরের মেয়ে রিয়া গোপ। খানিক পরেই রাস্তায় সংঘর্ষ বাধে। বাসার সামনে হইহুল্লা শুনে বাবা ছুটে যান ছাদ থেকে মেয়েকে ঘরে আনতে। মেয়েকে কোলে নিতেই একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় মাথায়। মুহূর্তেই ছোট্ট দেহটি ঢলে পড়ে বাবার কোলে। এদিন রিয়া গোপের মতো কারও পেটে গুলি, কারও পিঠে গুলি, কারও পায়ে গুলি- শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ২০ জনের মতো আহতের প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ। কারও লেগেছে একটি গুলি, কারও লেগেছে দুটি গুলি। অনেক ছররা গুলির ক্ষত নিয়েও ভর্তি কেউ কেউ।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদরের নয়ামাটি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতো সাড়ে ছয় বছর বয়সী মেয়েটির নাম রিয়া গোপ। সেদিন বাড়ির ছাদে গুলিবিদ্ধ রক্তে ভেজা মেয়েকে নিয়ে তখনই বাবা ছোটেন হাসপাতালে। বাসার কাছের ক্লিনিকে চিকিৎসকেরা বেশিক্ষণ রাখলেন না। পাঠিয়ে দিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে রাতেই মাথায় অস্ত্রোপচার হয়। সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন চিকিৎসকেরা। মেয়েটিকে রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। বলা হয়, ৭২ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাবে না। গত শুক্রবার বিকেলে গুলি লাগে মেয়েটির। সেদিন রাতে অস্ত্রোপচারের পর শনিবার পার হয়। রোববার ও সোমবার আইসিইউতে একটু একটু করে আঙুল নাড়ছিল মেয়েটি। স্বজনদের বুকে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু বুধবার সকালের দিকে মেয়েটির সে নড়াচড়াও থেমে যায়। সবাইকে কাঁদিয়ে মেয়েটি চলে যায় না-ফেরার দেশে। সাড়ে ছয় বছর বয়সী মেয়েটির নাম রিয়া গোপ। মা-বাবার সঙ্গে থাকতো নারায়ণগঞ্জ সদরের নয়ামাটি এলাকায়। চারতলা বাড়ির ওপরের তলায় থাকত ওরা। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের রেশ নারায়ণগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছিল। শুক্রবার বিকাল ৩টায় নয়ামাটি এলাকায় চলছিল সংঘাত, আর গোলাগুলি। সেই গুলিতেই প্রাণ গেল ছোট্ট রিয়ার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়, ‘গানশট ইনজুরি’। দীপক কুমার গোপ ও বিউটি ঘোষ দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল রিয়া। স্থানীয় একটি রড-সিমেন্টের দোকানে ব্যবস্থাপকের কাজ করেন দীপক। বিয়ের পাঁচ বছর পর এ দম্পতির ঘর আলো করে আসে রিয়া। এ বছরই ভর্তি হয়েছিল স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বুধবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে অপেক্ষা করছিলেন দীপক কুমার। সঙ্গে ছিলেন আরও স্বজনেরা। কথা হয় রিয়ার এক স্বজনের সঙ্গে। তিনি বললেন, বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে বাবার কোলেই গুলিবিদ্ধ হয় মেয়েটা। এরচেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে! বুধবার রিয়ার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার কিছু পরে। মর্গ থেকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগে স্ট্রেচারে রাখা মেয়েটির মুখ দেখানো হয় স্বজনদের। মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। রিয়ার ছোট খালা আহাজারি করতে করতে বলেন, আমার ছোট মা-রে, তুই আমাদের ছেড়ে চলে গেলি! তোরে ছাড়া আমরা কেমনে বাঁচব? একমাত্র মেয়েকে হারানোর শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন দীপক কুমার। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলছিলেন, কোথা থেকে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝি নাই। আমার কোলেই মেয়ের মাথা থেকে রক্ত বেয়ে পড়ছিল। বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
জানালায় দাঁড়াতেই গুলি এসে কেড়ে নিল শিশুটিকে: জানালার পাশেই সামিরের পড়ার টেবিল। পড়ার বই, প্লাস্টিকের খেলনা, ঘরের মেঝেতে এখনো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। গত শুক্রবার জানালা দিয়ে আসা একটি বুলেট সামিরের চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার খুলি ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ১১ বছরের সাফকাত সামির। ওই দিন (১৯ জুলাই) কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে মিরপুরে কাফরুল থানার সামনের সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ঢুকছিল সামিরের ঘরে। জানালা বন্ধ করতে গেলে বাইরে থেকে গুলি এসে বিদ্ধ করে শিশুটিকে। গুলিটি তার চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘরে ছিল তার চাচা মশিউর রহমান (১৭)। তার কাঁধেও গুলি লাগে। মঙ্গলবার সামিরদের বাসায় গিয়ে নির্মম মৃত্যুর চিহ্ন দেখা যায়। নানাবাড়ি আশুলিয়ায় একমাত্র সন্তানকে দাফন করে মা ফারিয়া ইবনাত (২৮) সেখানেই রয়ে গেছেন। বাবা সাকিবুর রহমান (৩৪) মিরপুরের ছোট্ট বাসাটিতে ফিরে এসে সন্তানের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছোট চাকরি করেন। শিশু সামির একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। সাকিবুর রহমানের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তার চোখের পানি থামছিলই না। তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেলে তিনি পাশেই বকুলতলা মাঠের কাছে ছিলেন। হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি হচ্ছিল দেখে বাসার দিকে রওনা দেন তিনি। এমন সময় এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে বাসায় গুলি ও রক্তের সংবাদ পান। দ্রুত বাসায় এসে দেখেন, তাঁর একমাত্র সন্তান রক্তাক্ত হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। তাকে কোলে নিয়ে ছুটে যান পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। চিকিৎসক বলেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই। সন্তানের লাশ হাসপাতালে থাকা অবস্থায় এলাকার মুরব্বি ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য মো. ইসমাইল হোসেন হাজির হন। তিনি সাকিবুর রহমানকে নিয়ে যান কাফরুল থানায়। তিনি বোঝাতে থাকেন, সন্তানের লাশ দ্রুত দাফন করা বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব। আইনি জটিলতায় না গিয়ে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন তিনিসহ স্থানীয় মুরব্বিরা। বাবা সাকিবুর মুরব্বিদের কথা মেনে আর মামলায় যাননি। ইসমাইল হোসেনের কাছে ওই রাতের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই সময় আমাদের কাছে দুটি বিকল্প ছিল। তৎক্ষণাৎ লাশ দাফন না করে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য জটিলতার মধ্যে যাওয়া। অথবা এলাকাবাসী লাশ নিয়ে মিছিল করে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, সেই দাবির প্রতি সমর্থন জানানো। তাই পুলিশের কথা শুনে আমরা ‘মামলা করব না, অভিযোগ নেই’ এমন চিঠিতে সই করতে সাকিবুরকে বোঝাই। রাতে এলাকার একদল তরুণ এসে হাসপাতালের বাইরে হাজির হন। তারা লাশ নিয়ে মিছিল করতে চান। মৃত্যুর বিচার চেয়ে প্রশাসনের কাছে যেতে চান এলাকাবাসী। এ পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে বাবা সাকিবুরের চোখেমুখে সেই সময়ের ছায়া প্রবল হতে থাকে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলতে থাকেন, ‘থানার লোকজন আমাকে একটি লিখিত ফরম সামনে তুলে ধরেন। তারা বলেন এখানে স্বাক্ষর করেন; নয়তো তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ, প্রমাণ হাজির করাসহ অনেক ঝামেলায় পড়তে হবে। লাশ নিয়ে রাজনীতি হবে। সেখানে কী লেখা ছিল জানতে চাইলে সাকিবুর বলেন, এ ঘটনায় আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি মামলা করতে চাই না। আমি আমার ছেলের লাশ নিয়ে দাফন করতে চলে যাব। এসব কথা লেখা একটি টাইপ করা ফরম আমার সামনে দিলে আমি শুধু কয়েকটি বিষয় ভেবেছি, আমি সন্তানকে হারিয়েছি, সে অনেক কষ্ট করে মারা গেছে। এখন যদি সময়মতো কবরও দিতে না পারি, তাহলে এর চেয়ে কষ্ট আর নেই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে কাগজে স্বাক্ষর করি। সাকিবুর বলেন, আমরা সরকারবিরোধী কোনো কাজ করিনি। প্রশাসনের নিয়ম মেনেছি। কারফিউ জারি করার পর আমরা পরিবারের সবাইকে ঘরের মধ্যে রেখেছি। সেই ঘরের মধ্যেও আমরা যদি নিরাপদে থাকতে না পারি, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমি আওয়ামী লীগ করি, পরিবার ও এলাকার বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগ সমর্থন করে। গত নির্বাচনে আমরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছি। এখানে বড় ধরনের গন্ডগোল করার মতো কেউ নেই। আমাদের কেন এমন হবে! আমাদের বাসায় কেন গুলি করবে! এটা কোন নিয়ম। এসব কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন সাকিবুর।
পেটে গুলি, বুকে গুলি, পায়ে গুলি, কাতরাচ্ছেন তারা: কারও পেটে গুলি, কারও পিঠে গুলি, কারও পায়ে গুলি—শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ২০ জনের মতো আহতের প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ। কারও লেগেছে একটি গুলি, কারও লেগেছে দুটি গুলি। অনেকগুলো ছররা গুলির ক্ষত নিয়েও ভর্তি কেউ কেউ। হাসপাতালটিতে গত মঙ্গলবার গিয়ে আহতদের মধ্যে দেখা গেল একটি কিশোরকে। তার দুই পায়ে দুটি গুলি লেগেছে। পা দুটো ব্যান্ডেজ করা। পাশে বসা তার মামা। গিয়ে কথা বলতে চাইলে মামা সবকিছুই বললেন। তবে অনুরোধ জানালেন, তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় যেন প্রকাশ করা না হয়। আহত ব্যক্তির মামার দাবি, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুরে সংঘর্ষের সময় বাসায় ফিরতে গিয়ে ১৯ জুলাই (শুক্রবার) গুলিবিদ্ধ হয় তার ভাগনে। ঘটনাস্থল মিরপুর-১০ নম্বর সেকশন। আহত কিশোরটি স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আহতের মামা আরও বলেন, তার ভাগনের দুই পায়ে যে দুটি গুলি লেগেছে, তা রাবার বুলেট বা ছররা গুলি নয়। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীটির ততটা ঝুঁকি নেই। তবে কারও কারও পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাদের একজন জাকির শিকদার। তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগে ভর্তি। বয়স ২৭ বছর। সংঘর্ষের মধ্যে ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ঢাকার মধ্যবাড্ডা এলাকায় তার বাঁ পায়ে গুলি লাগে। পা–টি ইতোমধ্যে অস্ত্রোপচার করে কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকেরা। জাকির নিজেকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী বলে উল্লেখ করেন। গতকাল তিনি বলেন, শরীরের ব্যথা তো কিছু না ভাই। আমি তো পঙ্গু হয়ে গেলাম! পরিবারের বোঝা হয়ে গেলাম। তিনি দাবি করেন, কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে তার পায়ে গুলি লাগে। বৃহস্পতিবার পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গুলিবিদ্ধ ৩৫ জন ভর্তি। এর মধ্যে সাতজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। তাদের সবার শরীরে লেগেছিল একটি করে গুলি। জাকিরের বাড়ি মাদারীপুর সদরে। তার বাবা শাহজাহান শিকদার ২০০৭ সালে মারা যান। চার ভাই, এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোট ভাই ও মাকে নিয়ে তিনি মধ্যবাড্ডায় ভাড়া থাকেন। পঙ্গু হাসপাতালে যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তাঁর মা হনুফা বেগম পাশে বসে চোখ মুছছিলেন। তিনি শুধু বলছিলেন, আমার ছেলে (জাকির) সবাইকে দেখে রেখেছিল, এখন আমার ছেলেকে কে দেখবে? সরেজমিনে গত মঙ্গলবার পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গুলিবিদ্ধ ৩৫ জন ভর্তি। এর মধ্যে সাতজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। তাঁদের সবার শরীরে লেগেছিল একটি করে গুলি। আহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন শিক্ষার্থী। ৩৫ জনের মধ্যে ছিল ৫টি শিশু ও কিশোর। ১৯ জুলাই বাড্ডা থেকে আসা মুহিব্বুল্লাহ (৩৮) নামের একজনের ছিল বুকের এক পাশে গুলির আঘাত। তিনি গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক বনানী শাখায় নামাজ পড়ান। নীরবের ভাষ্য, ঘটনার দিন তিনি রিকশা চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। তিনি রিকশা নিয়ে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। তখন পুলিশের ছোড়া গুলি তার শরীরের বিভিন্ন অংশে লাগে। আহতদের একজন মো. সিফাত (১৪)। সে মিরপুরের পল্লবী মাজেদুল ইসলাম মডেল হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে জানায়, ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) রাত ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় তার ডান পায়ে গুলি লাগে। সিফাতের বাবা মো. সিরাজ একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মী। তিনি বলেন, দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি পল্লবীতে থাকেন। ঘটনার দিন তাঁর ছেলে সিফাত এক বন্ধুর সঙ্গে মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়েছিল। বাসায় ফেরার পথে রাস্তা পারাপারের সময় তার পায়ে গুলি লাগে। পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি-২ বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, সেখানে ভর্তি রোগীরা সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের আনা হয়েছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বাড্ডা, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা থেকে। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ছাড়াও রিকশাচালক, দিনমজুর, চাকরিজীবী, গাড়িচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। একজন শিক্ষকও রয়েছেন।