সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে ১২টা পর্যন্ত সময়ে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড করা হয়েছে। আজও থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হবে
- আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ কবির আবহাওয়া অধিদফতর
জাহাঙ্গীর খান বাবু
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। ভারী এই বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে যা নগরবাসীর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে সকাল ৬টা থেকে ভারী বর্ষণে পরিণত হয়। এই প্রতিবেদন লেখা (রাত-৯ টা) পর্যন্ত মতিঝিলে হাটু পানি ছিল।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই হয়তো সকালটা ঘরে বসে বেশ আয়েশেই কাটিয়েছেন। কিন্তু এদিনও যাদের অফিস থাকে কিংবা জরুরি কাজে বাইরে যেতে হয়, তাদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গনমাধ্যমকর্মী ও চিকিৎসা নিতে হাসপাতালগামীদের বেশ বিপাকেই পড়তে হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়েই গন্তব্যে ছুটতে দেখা গেছে অনেককেই।
সকালের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর গ্রিনরোড, মোহাম্মদপুর, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, মালিবাগ, শান্তিনগর, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট এবং ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া শনির আখড়া, যাত্রবাড়ী, মীর হাজির বাগ, সায়দাবাদ, দয়াগঞ্জ বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর ১৩, মিরপুর ১০ ও ১১ নং সেকশন, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, পীরেরবাগ, কল্যাণপুর, হাতিরঝিলের কিছু অংশ এবং গুলশান লেকপাড় এলাকার সড়কগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রবল বৃষ্টিতে রাজধানীর নটরডেম কলেজের সামনে, আরামবাগ, মতিঝিল, মালিবাগ রেলগেট, মৌচাক, মগবাজার, তেজগাঁও, খিলগাঁও, বাসাবো, কাকরাইল, পল্টন, পুরান ঢাকা, বংশাল, সূত্রাপুর, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও মিরপুরসহ বেশিরভাগ এলাকায় রাস্তায় হাঁটুপানি জমায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
তবে ভোগান্তি আরও চরমে উঠেছে বেলা খানিকটা বাড়লে। টানা বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে গেছে। আর স্যুয়ারেজ লাইনের পানির সঙ্গে মিশে পথঘাট হয়েছে একাকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুটা ঘুরলেই চোখে পড়ছে ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেককেই।
আর রাস্তায় পানি জমে থাকায় যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। ফলে রাস্তায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থেকে যাত্রীরা একসময় বিরক্ত হয়ে হাঁটা শুরু করেন। কিন্তু কিছুটা পর পর ফুটপাতও ডুবে থাকায় সেটাও সম্ভব হচ্ছিল না। এই সুযোগে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন রিকশাওয়ালারা। এমনকি কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি পার করে দিতে ১০-২০ টাকা করে নিচ্ছেন তারা।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা শওকত আলী জানান, মূল রাস্তায় হাঁটু পানি, হেঁটে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। রিকশার ভাড়া ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা হয়ে গেছে। এমন অবস্থা জানলে আজ বেরই হতাম না।
মুষলধারার বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ডুবে গেছে। শুক্রবার সকাল থেকে টানা কয়েক ঘণ্টার এই বৃষ্টিপাতে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতো পানিতে ডুবেছে নিউমার্কেটও। নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে শুরু করে নীলক্ষেত পর্যন্ত সড়কে জমে আছে বৃষ্টির পানি। আর এমন অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন রাস্তার পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত নিচু ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
দুপুরে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির সময় উপচে সড়কের সব পানি প্রবেশ করেছে মার্কেটের ভেতর। ফলে দোকানে রাখা শাড়ি, কাপড়, বই, জুয়েলারিসহ অন্যান্য সবকিছুই ভিজে গেছে। এমন অবস্থায় সব মিলিয়ে প্রায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
শুধু নিউমার্কেটই নয় বরং পার্শ্ববর্তী ধানমন্ডি নায়েম রোড, ঢাকা কলেজের আবাসিক এলাকা, আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় এখনও হাঁটু পানি। রাস্তায় ও গলিতে পানি জমে থাকার কারণে এসব এলাকার অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ। রাস্তায় চলাচল করতে ব্যবহার করতে হচ্ছে রিকশা। একেবারেই প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাসা থেকেও বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, সামান্য পথ যেতে রিকশা বা ভ্যানে উঠে যেতে হচ্ছে। আর পনির কারণে বেশি সমস্যা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। নিচতলায় থাকা অধিকাংশ দোকানেই পানি প্রবেশ করেছে।
সৌরভ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি তুমুল বৃষ্টি। তাই ভয় হচ্ছিল পানি দোকানে ঢুকেছে কিনা। তাই দ্রুতই দোকানে যাই, গিয়ে দেখি পানিতে ভেসে যাচ্ছে সব। কিছু জিনিস সরাতে পারলেও অধিকাংশই পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।
কাপড় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকানের বেশিরভাগ কাপড়ই ভিজে গেছে। সব কাপড় শুকাতে হবে। কিন্তু পানি এখনো কমেনি। কমার পর দোকান খুললে ভেতরের ক্ষয়ক্ষতি আরও বোঝা যাবে।
নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, সবগুলো দোকানের ভেতরেই এখন এক ফিট পরিমাণ পানি। বইপত্র, কাপড়, তৈজসপত্র, জুয়েলারি সবকিছুই পানিতে ভিজে গেছে। আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল, যা টাকার অংক দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ভোগান্তিতে পড়া রাজধানীর বাসিন্দারা জানান, আজ ছুটির দিন হওয়ায় গণপরিবহন কম। তার ওপর বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় গণপরিবহন তেমন একটা নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোও পানির কারণে ধীরগতিতে চলছে। অন্যান্য দিনের তুলনায় রিকশাও আজ কম। রিকশাচালকরা পঞ্চাশ টাকার ভাড়া দেড়শ’-দুইশ’ টাকা দাবি করছেন। সিএনজি বা অটোরিকশা চালকদের আজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পুরান ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে পুরান ঢাকার সড়কগুলোতে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমেছে। পানিতে ডুবে গেছে বিভিন্ন অলিগলি। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরপানি। নিচে নেমে দেখি বাসার তিন সিঁড়ি পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। পানিতে গলি ডুবে যাওয়ায় ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা সব ভেসে উঠেছে, অনেক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আবু বকর বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর অলিগলিসহ বিভিন্ন সড়ক ডুবে যায়। ১৫-২০ বছর আগে যেমন ছিল এখনও একই সমস্যা আছে। কোনও উন্নতি নেই। একের পর এক মেয়র আসছেন-যাচ্ছেন কিন্তু জলাবদ্ধতা সমস্যা কেউ নিরসন করতে পারছেন না।
মতিঝিল এলাকায় গাড়ি পার্ক করে রাখা সুরুজ মিয়া জানান, সকাল থেকে এত বৃষ্টি হয়েছে যে আমার গাড়িটি প্রায় ডুবেই গেছে। শুধু আমারটি না, যে কয়টি গাড়ি পার্ক করা ছিল সবগুলো ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা। গাড়ি রেখে যে অন্য কোনও মাধ্যমে বাসায় যাবো সেই উপায় নেই। বৃষ্টির কারণে সবকিছু থমকে ছিল। আশপাশে রিকশা বা বাস কিছুই চলছিল না।
এদিকে ডিএনসিসি থেকে জানানো হয়েছে, ছুটির দিন সকাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পানি অপসারণ হতে কিছুটা সময় লেগেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজারের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া ১০টি অঞ্চলে কাজ করছে ১০টি কুইক রেসপন্স টিম। ইতোমধ্যে প্রধান সড়কগুলো থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, শুধু ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ে তারা ঢাকায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ কবির জানান, সকাল ৬টা থেকে ৯ পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ঢাকায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে ১২টা পর্যন্ত সময়ে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড করেছে আজ সারা দিনই থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হবে বলেও জানান তিনি।
গত ২৪ ঘন্টায় টাঙ্গাইলে ১০৫ মিলিমিটার, গোপালগঞ্জে ৭৩ মিলিমিটার, রাজশাহীতে ১৩৫ মিলিমিটার, বাঘাবাড়ীতে ১০৩ মিলিমিটার, দিনাজপুরে ৮৮ মিলিমিটার, নেত্রকোনায় ৭৫ মিলিমিটার, কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ৩০৯ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ২১৯ মিলিমিটার, সীতাকুন্ডে ১০২ মিলিমিটার, কুমারখালীতে ১১১ মিলিমিটারসহ দেশের অধিকাংশ স্থানে বৃষ্টিপাত হয়েছে।
- আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ কবির আবহাওয়া অধিদফতর
জাহাঙ্গীর খান বাবু
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিপাতের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। ভারী এই বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে যা নগরবাসীর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে সকাল ৬টা থেকে ভারী বর্ষণে পরিণত হয়। এই প্রতিবেদন লেখা (রাত-৯ টা) পর্যন্ত মতিঝিলে হাটু পানি ছিল।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই হয়তো সকালটা ঘরে বসে বেশ আয়েশেই কাটিয়েছেন। কিন্তু এদিনও যাদের অফিস থাকে কিংবা জরুরি কাজে বাইরে যেতে হয়, তাদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গনমাধ্যমকর্মী ও চিকিৎসা নিতে হাসপাতালগামীদের বেশ বিপাকেই পড়তে হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়েই গন্তব্যে ছুটতে দেখা গেছে অনেককেই।
সকালের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর গ্রিনরোড, মোহাম্মদপুর, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, মালিবাগ, শান্তিনগর, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট এবং ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া শনির আখড়া, যাত্রবাড়ী, মীর হাজির বাগ, সায়দাবাদ, দয়াগঞ্জ বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর ১৩, মিরপুর ১০ ও ১১ নং সেকশন, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, পীরেরবাগ, কল্যাণপুর, হাতিরঝিলের কিছু অংশ এবং গুলশান লেকপাড় এলাকার সড়কগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রবল বৃষ্টিতে রাজধানীর নটরডেম কলেজের সামনে, আরামবাগ, মতিঝিল, মালিবাগ রেলগেট, মৌচাক, মগবাজার, তেজগাঁও, খিলগাঁও, বাসাবো, কাকরাইল, পল্টন, পুরান ঢাকা, বংশাল, সূত্রাপুর, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও মিরপুরসহ বেশিরভাগ এলাকায় রাস্তায় হাঁটুপানি জমায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
তবে ভোগান্তি আরও চরমে উঠেছে বেলা খানিকটা বাড়লে। টানা বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে গেছে। আর স্যুয়ারেজ লাইনের পানির সঙ্গে মিশে পথঘাট হয়েছে একাকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছুটা ঘুরলেই চোখে পড়ছে ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেককেই।
আর রাস্তায় পানি জমে থাকায় যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। ফলে রাস্তায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থেকে যাত্রীরা একসময় বিরক্ত হয়ে হাঁটা শুরু করেন। কিন্তু কিছুটা পর পর ফুটপাতও ডুবে থাকায় সেটাও সম্ভব হচ্ছিল না। এই সুযোগে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন রিকশাওয়ালারা। এমনকি কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি পার করে দিতে ১০-২০ টাকা করে নিচ্ছেন তারা।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা শওকত আলী জানান, মূল রাস্তায় হাঁটু পানি, হেঁটে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। রিকশার ভাড়া ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা হয়ে গেছে। এমন অবস্থা জানলে আজ বেরই হতাম না।
মুষলধারার বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ডুবে গেছে। শুক্রবার সকাল থেকে টানা কয়েক ঘণ্টার এই বৃষ্টিপাতে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতো পানিতে ডুবেছে নিউমার্কেটও। নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে শুরু করে নীলক্ষেত পর্যন্ত সড়কে জমে আছে বৃষ্টির পানি। আর এমন অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন রাস্তার পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত নিচু ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
দুপুরে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির সময় উপচে সড়কের সব পানি প্রবেশ করেছে মার্কেটের ভেতর। ফলে দোকানে রাখা শাড়ি, কাপড়, বই, জুয়েলারিসহ অন্যান্য সবকিছুই ভিজে গেছে। এমন অবস্থায় সব মিলিয়ে প্রায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
শুধু নিউমার্কেটই নয় বরং পার্শ্ববর্তী ধানমন্ডি নায়েম রোড, ঢাকা কলেজের আবাসিক এলাকা, আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় এখনও হাঁটু পানি। রাস্তায় ও গলিতে পানি জমে থাকার কারণে এসব এলাকার অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ। রাস্তায় চলাচল করতে ব্যবহার করতে হচ্ছে রিকশা। একেবারেই প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাসা থেকেও বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, সামান্য পথ যেতে রিকশা বা ভ্যানে উঠে যেতে হচ্ছে। আর পনির কারণে বেশি সমস্যা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। নিচতলায় থাকা অধিকাংশ দোকানেই পানি প্রবেশ করেছে।
সৌরভ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি তুমুল বৃষ্টি। তাই ভয় হচ্ছিল পানি দোকানে ঢুকেছে কিনা। তাই দ্রুতই দোকানে যাই, গিয়ে দেখি পানিতে ভেসে যাচ্ছে সব। কিছু জিনিস সরাতে পারলেও অধিকাংশই পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।
কাপড় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকানের বেশিরভাগ কাপড়ই ভিজে গেছে। সব কাপড় শুকাতে হবে। কিন্তু পানি এখনো কমেনি। কমার পর দোকান খুললে ভেতরের ক্ষয়ক্ষতি আরও বোঝা যাবে।
নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, সবগুলো দোকানের ভেতরেই এখন এক ফিট পরিমাণ পানি। বইপত্র, কাপড়, তৈজসপত্র, জুয়েলারি সবকিছুই পানিতে ভিজে গেছে। আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল, যা টাকার অংক দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ভোগান্তিতে পড়া রাজধানীর বাসিন্দারা জানান, আজ ছুটির দিন হওয়ায় গণপরিবহন কম। তার ওপর বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় গণপরিবহন তেমন একটা নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোও পানির কারণে ধীরগতিতে চলছে। অন্যান্য দিনের তুলনায় রিকশাও আজ কম। রিকশাচালকরা পঞ্চাশ টাকার ভাড়া দেড়শ’-দুইশ’ টাকা দাবি করছেন। সিএনজি বা অটোরিকশা চালকদের আজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পুরান ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে পুরান ঢাকার সড়কগুলোতে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমেছে। পানিতে ডুবে গেছে বিভিন্ন অলিগলি। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরপানি। নিচে নেমে দেখি বাসার তিন সিঁড়ি পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। পানিতে গলি ডুবে যাওয়ায় ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা সব ভেসে উঠেছে, অনেক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আবু বকর বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর অলিগলিসহ বিভিন্ন সড়ক ডুবে যায়। ১৫-২০ বছর আগে যেমন ছিল এখনও একই সমস্যা আছে। কোনও উন্নতি নেই। একের পর এক মেয়র আসছেন-যাচ্ছেন কিন্তু জলাবদ্ধতা সমস্যা কেউ নিরসন করতে পারছেন না।
মতিঝিল এলাকায় গাড়ি পার্ক করে রাখা সুরুজ মিয়া জানান, সকাল থেকে এত বৃষ্টি হয়েছে যে আমার গাড়িটি প্রায় ডুবেই গেছে। শুধু আমারটি না, যে কয়টি গাড়ি পার্ক করা ছিল সবগুলো ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা। গাড়ি রেখে যে অন্য কোনও মাধ্যমে বাসায় যাবো সেই উপায় নেই। বৃষ্টির কারণে সবকিছু থমকে ছিল। আশপাশে রিকশা বা বাস কিছুই চলছিল না।
এদিকে ডিএনসিসি থেকে জানানো হয়েছে, ছুটির দিন সকাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পানি অপসারণ হতে কিছুটা সময় লেগেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজারের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া ১০টি অঞ্চলে কাজ করছে ১০টি কুইক রেসপন্স টিম। ইতোমধ্যে প্রধান সড়কগুলো থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, শুধু ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ে তারা ঢাকায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ তরিকুল নেওয়াজ কবির জানান, সকাল ৬টা থেকে ৯ পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ঢাকায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে ১২টা পর্যন্ত সময়ে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড করেছে আজ সারা দিনই থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হবে বলেও জানান তিনি।
গত ২৪ ঘন্টায় টাঙ্গাইলে ১০৫ মিলিমিটার, গোপালগঞ্জে ৭৩ মিলিমিটার, রাজশাহীতে ১৩৫ মিলিমিটার, বাঘাবাড়ীতে ১০৩ মিলিমিটার, দিনাজপুরে ৮৮ মিলিমিটার, নেত্রকোনায় ৭৫ মিলিমিটার, কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ৩০৯ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ২১৯ মিলিমিটার, সীতাকুন্ডে ১০২ মিলিমিটার, কুমারখালীতে ১১১ মিলিমিটারসহ দেশের অধিকাংশ স্থানে বৃষ্টিপাত হয়েছে।