
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবী করেছেন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন জঙ্গিবাদ মতাদর্শের প্রচার থেমে নেই। সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও শঙ্কা এখনও আনসার আল ইসলামকে নিয়ে। আনসার আল ইসলাম ভেতরে ভেতরে সুসংগঠিত হওয়ার কাজ করছে। তারা যদি আবারও সহিংস কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে তবে বাংলাদেশের জন্য তা বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের পদচারণায় সব সময় মুখর থাকতো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই অন্যান্য দিনের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়ে লেকের পাড়ের মনোরম পরিবেশের রেস্তোরাঁটি। সন্ধ্যা গড়াতেই হলি আর্টিসানের আড্ডাস্থল পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেখানে চালানো হয় ইতিহাসের জঘন্যতম জঙ্গি হামলা। ভয়াবহ এ হামলায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ এবং প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিম্মি সংকটের ঘটনায় স্তম্ভিত করেছিল পুরো জাতিকে। ১ জুলাই সোমবার হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার আট বছর হলো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে জঙ্গি হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হয়েছেন মোট ২২ জন। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর দিনেদুপুরে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণ থেকে প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জঙ্গিরা। আড়াই বছরেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা পলাতক দুজনের একজনকেও শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে যতগুলো জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও শক্তিশালী আনসার আল ইসলাম। সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়ার চেষ্টা করে আসছিল।
জঙ্গি দমনে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি ইউনিটের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনসার আল ইসলামকে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার বাংলাদেশি শাখা (একিউআইএস) বলা হয়। সম্প্রতি আনসার আল ইসলামের কার্যক্রমের ধরন দেখে গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন আল-কায়েদা থেকে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা পেয়ে মাঠে নেমেছে তারা। বড় কিছু করার উদ্দেশ্যে পুরোনো ও বিশ্বাসযোগ্য সদস্যদের যে কোনো মূল্যে কাছে পেতে চাচ্ছে সংগঠনটি। তবে ঠিক কী নির্দেশনা আনসার আল ইসলামের কাছে এসেছে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গত বছরের ৩০ অক্টোবর হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলার মামলায় বিশেষ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাত জঙ্গির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ হাইকোর্ট। আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া সাত জঙ্গি হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। তারা এখন কারাগারে রয়েছেন।
হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলায় জড়িত অন্য আট জঙ্গি পরে পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়। তারা হলেন-তামিম আহমেদ চৌধুরী (৩৩), নুরুল ইসলাম মারজান (২৩), সারোয়ার জাহান মানিক (৩৫), তানভীর কাদেরী (৪০), বাশারুজ্জামান চকলেট (৩২), মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম (৩৭), মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান (৩২) এবং রায়হানুল কবির রায়হান ওরফে তারেক (২০)।
হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলার ঘটনার পরে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) মোট ৮২৬ জন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে জেএমবির ২০০ জন, নব্য জেএমবির ১৮০ জন, আনসার আল ইসলামের ২৩০ জন, হরকাতুল জিহাদের ১৫ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১৮ জন, নতুন জঙ্গি সংগঠন ইমাম মাহমুদের কাফেলার ৪১ জন, অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের ১২০ জন এবং সংগঠন উল্লেখ নেই এমন ২২ জন রয়েছে। হলি আর্টিসানে হামলার ঘটনার পরে র্যাব গ্রেফতার করে ১ হাজার ৮৭৫ জঙ্গি সদস্যকে। এর মধ্যে ৮৭৩ জন জেএমবি সদস্য, হরকাতুল জিহাদের (হুজিবি) ৩৭ জন, হিযবুত তাহরীরের ১০৪, আনসার আল ইসলামের ৪৭৩ সদস্য, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ৮২ সদস্য এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের ৩০৬ জন। এ ছাড়া ২০১৬ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ সারা দেশে এক হাজার নয়জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের আট বছর পূর্ণ উপলক্ষে নিহত দুই পুলিশ সদস্যের স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে র্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান মনিরুল ইসলাম ও ঢাকার পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম বলেছেন, অনেকে মনে করেছিল এই জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আরও জঙ্গি হামলায় বাংলাদেশ আফগানিস্তানে পরিণত হবে বলেও অনেকে মনে করেছিল। তবে দেশে এখন জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে।
শ্রদ্ধা জানানো শেষে কথা বলেছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, দেশে আর কখনোই জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না । তিনি আরও বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে।
শ্রদ্ধা জানানোর পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেছেন, অনলাইনে জঙ্গি তৎপরতা পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকার ও পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, সচেতন শ্রেণির মানুষ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে তার সন্তান কীভাবে চলছে, কার সঙ্গে চলছে, কতক্ষণ তার সন্তান মোবাইলে থাকছে, একা একা থাকছে, কার সঙ্গে থাকছে। জঙ্গিদের অর্থায়নে বিভিন্ন ইন্স্যুরেন্সের জড়িত থাকার অভিযোগের প্রশ্নে হাবিবুর রহমান বলেন, জঙ্গিসংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের পেছনে পুলিশের তৎপরতা রয়েছে এবং সেটি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে গুলশানে পুলিশের সহকারী কমিশনার আশরাফুল করিম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান প্রত্যক্ষদর্শীরা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোলাগুলিতে আহত হন বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কয়েকশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেন। গণমাধ্যম কর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।
সিটিটিসিপ্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নব্য জেএমবির সদস্যরা হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা চালিয়েছিল। জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে নব্য জেএমবি। তারপরেও তারা থেমে নেই। যারা গ্রেফতার হয়নি বা বাইরে ছিল তারা সংগঠনটিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। তবে সংগঠিত হওয়ার আগেই আমরা তাদেরকে শনাক্ত করেছি। এই মুহূর্তে জঙ্গিবাদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশকে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। যার অন্যতম উদ্দেশ্য দেশব্যাপী জনসচেতনতা কার্যক্রম তৈরি করা। আরেকটি হলো ডি-রেডিকালাইজেশন। ইতোমধ্যে আমরা এই দুটি কাজ শুরু করেছি। এরইমধ্যে ৫৪ জনকে ডি-রেডিকালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। এটি একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যারা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে, প্রাথমিক তথ্য মিলছে তাদেরকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আনা হচ্ছে। এছাড়া যারা আটক হয়েছে তারা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অতীতের আদর্শে অথবা সাজা খেটে বের হচ্ছে তাদেরকে ডি-রেডিকালাইজেশনের আওতায় আনা হয়। জেলখানায় দুটি ব্যাচকে ডি-রেডিকালাইজেশন করা হয়েছে। কাশিমপুর কারাগারে আটজন আটজন করে ১৬ জনকে এই প্রোগ্রামের আওতায় এনেছি। যারা জামিন পাবেন বা সাজার মেয়াদ শেষ হতে আরও দুই-একবছর লাগবে তাদেরকেও নিয়ে এই প্রোগ্রাম করেছি।
পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি এস এম রুহুল আমিন বলেন, বাংলাদেশে এটিইউ, সিটিটিসি ও র্যাব যেভাবে কাজ করছে, তাতে মনে করি জঙ্গিদের হামলার কোনো সামর্থ্য নেই। তবে জঙ্গিবাদের বিষয়ে পরিতৃপ্তি থাকা যায় না। পরিতৃপ্তি থাকলেই জঙ্গিরা ভেতরে ভেতরে কাজ করে। আমরা অ্যালার্ট আছি। সামগ্রিকভাবে খারাপ কিছু আশা করছি না।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার আরাফাত ইসলাম বলেন, জঙ্গিদের বিষয়ে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি রয়েছে। র্যাব একের পর এক শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের গ্রেফতার করেছে। ধারাবাহিক অভিযানের ফলে জঙ্গিরা এখন মাথা চাড়া দিতে পারছে না। এরপরেও আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগছি না। জামিন নেয়া জঙ্গিদের বিষয়ে কমান্ডার আরাফাত বলেন, জামিন পাওয়া জঙ্গিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয় সে মামলাগুলো মনিটরিং করা হয়। এছাড়া সাইবার স্পেসে যাতে কেউ উগ্রবাদ ছড়াতে না পারে সেজন্য সাইবার ওয়ার্ল্ডেও নজরদারি করা হয়।
রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের পদচারণায় সব সময় মুখর থাকতো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই অন্যান্য দিনের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়ে লেকের পাড়ের মনোরম পরিবেশের রেস্তোরাঁটি। সন্ধ্যা গড়াতেই হলি আর্টিসানের আড্ডাস্থল পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেখানে চালানো হয় ইতিহাসের জঘন্যতম জঙ্গি হামলা। ভয়াবহ এ হামলায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ এবং প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিম্মি সংকটের ঘটনায় স্তম্ভিত করেছিল পুরো জাতিকে। ১ জুলাই সোমবার হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার আট বছর হলো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে জঙ্গি হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হয়েছেন মোট ২২ জন। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর দিনেদুপুরে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণ থেকে প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জঙ্গিরা। আড়াই বছরেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা পলাতক দুজনের একজনকেও শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে যতগুলো জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও শক্তিশালী আনসার আল ইসলাম। সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়ার চেষ্টা করে আসছিল।
জঙ্গি দমনে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি ইউনিটের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনসার আল ইসলামকে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার বাংলাদেশি শাখা (একিউআইএস) বলা হয়। সম্প্রতি আনসার আল ইসলামের কার্যক্রমের ধরন দেখে গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন আল-কায়েদা থেকে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা পেয়ে মাঠে নেমেছে তারা। বড় কিছু করার উদ্দেশ্যে পুরোনো ও বিশ্বাসযোগ্য সদস্যদের যে কোনো মূল্যে কাছে পেতে চাচ্ছে সংগঠনটি। তবে ঠিক কী নির্দেশনা আনসার আল ইসলামের কাছে এসেছে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গত বছরের ৩০ অক্টোবর হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলার মামলায় বিশেষ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাত জঙ্গির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ হাইকোর্ট। আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া সাত জঙ্গি হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। তারা এখন কারাগারে রয়েছেন।
হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলায় জড়িত অন্য আট জঙ্গি পরে পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়। তারা হলেন-তামিম আহমেদ চৌধুরী (৩৩), নুরুল ইসলাম মারজান (২৩), সারোয়ার জাহান মানিক (৩৫), তানভীর কাদেরী (৪০), বাশারুজ্জামান চকলেট (৩২), মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম (৩৭), মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান (৩২) এবং রায়হানুল কবির রায়হান ওরফে তারেক (২০)।
হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলার ঘটনার পরে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) মোট ৮২৬ জন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে জেএমবির ২০০ জন, নব্য জেএমবির ১৮০ জন, আনসার আল ইসলামের ২৩০ জন, হরকাতুল জিহাদের ১৫ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১৮ জন, নতুন জঙ্গি সংগঠন ইমাম মাহমুদের কাফেলার ৪১ জন, অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের ১২০ জন এবং সংগঠন উল্লেখ নেই এমন ২২ জন রয়েছে। হলি আর্টিসানে হামলার ঘটনার পরে র্যাব গ্রেফতার করে ১ হাজার ৮৭৫ জঙ্গি সদস্যকে। এর মধ্যে ৮৭৩ জন জেএমবি সদস্য, হরকাতুল জিহাদের (হুজিবি) ৩৭ জন, হিযবুত তাহরীরের ১০৪, আনসার আল ইসলামের ৪৭৩ সদস্য, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ৮২ সদস্য এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের ৩০৬ জন। এ ছাড়া ২০১৬ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ সারা দেশে এক হাজার নয়জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের আট বছর পূর্ণ উপলক্ষে নিহত দুই পুলিশ সদস্যের স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে র্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান মনিরুল ইসলাম ও ঢাকার পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম বলেছেন, অনেকে মনে করেছিল এই জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আরও জঙ্গি হামলায় বাংলাদেশ আফগানিস্তানে পরিণত হবে বলেও অনেকে মনে করেছিল। তবে দেশে এখন জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে।
শ্রদ্ধা জানানো শেষে কথা বলেছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, দেশে আর কখনোই জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না । তিনি আরও বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে।
শ্রদ্ধা জানানোর পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেছেন, অনলাইনে জঙ্গি তৎপরতা পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকার ও পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, সচেতন শ্রেণির মানুষ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে তার সন্তান কীভাবে চলছে, কার সঙ্গে চলছে, কতক্ষণ তার সন্তান মোবাইলে থাকছে, একা একা থাকছে, কার সঙ্গে থাকছে। জঙ্গিদের অর্থায়নে বিভিন্ন ইন্স্যুরেন্সের জড়িত থাকার অভিযোগের প্রশ্নে হাবিবুর রহমান বলেন, জঙ্গিসংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের পেছনে পুলিশের তৎপরতা রয়েছে এবং সেটি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে গুলশানে পুলিশের সহকারী কমিশনার আশরাফুল করিম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান প্রত্যক্ষদর্শীরা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোলাগুলিতে আহত হন বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কয়েকশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেন। গণমাধ্যম কর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।
সিটিটিসিপ্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নব্য জেএমবির সদস্যরা হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা চালিয়েছিল। জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে নব্য জেএমবি। তারপরেও তারা থেমে নেই। যারা গ্রেফতার হয়নি বা বাইরে ছিল তারা সংগঠনটিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। তবে সংগঠিত হওয়ার আগেই আমরা তাদেরকে শনাক্ত করেছি। এই মুহূর্তে জঙ্গিবাদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশকে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। যার অন্যতম উদ্দেশ্য দেশব্যাপী জনসচেতনতা কার্যক্রম তৈরি করা। আরেকটি হলো ডি-রেডিকালাইজেশন। ইতোমধ্যে আমরা এই দুটি কাজ শুরু করেছি। এরইমধ্যে ৫৪ জনকে ডি-রেডিকালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। এটি একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যারা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে, প্রাথমিক তথ্য মিলছে তাদেরকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আনা হচ্ছে। এছাড়া যারা আটক হয়েছে তারা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অতীতের আদর্শে অথবা সাজা খেটে বের হচ্ছে তাদেরকে ডি-রেডিকালাইজেশনের আওতায় আনা হয়। জেলখানায় দুটি ব্যাচকে ডি-রেডিকালাইজেশন করা হয়েছে। কাশিমপুর কারাগারে আটজন আটজন করে ১৬ জনকে এই প্রোগ্রামের আওতায় এনেছি। যারা জামিন পাবেন বা সাজার মেয়াদ শেষ হতে আরও দুই-একবছর লাগবে তাদেরকেও নিয়ে এই প্রোগ্রাম করেছি।
পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি এস এম রুহুল আমিন বলেন, বাংলাদেশে এটিইউ, সিটিটিসি ও র্যাব যেভাবে কাজ করছে, তাতে মনে করি জঙ্গিদের হামলার কোনো সামর্থ্য নেই। তবে জঙ্গিবাদের বিষয়ে পরিতৃপ্তি থাকা যায় না। পরিতৃপ্তি থাকলেই জঙ্গিরা ভেতরে ভেতরে কাজ করে। আমরা অ্যালার্ট আছি। সামগ্রিকভাবে খারাপ কিছু আশা করছি না।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার আরাফাত ইসলাম বলেন, জঙ্গিদের বিষয়ে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি রয়েছে। র্যাব একের পর এক শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের গ্রেফতার করেছে। ধারাবাহিক অভিযানের ফলে জঙ্গিরা এখন মাথা চাড়া দিতে পারছে না। এরপরেও আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগছি না। জামিন নেয়া জঙ্গিদের বিষয়ে কমান্ডার আরাফাত বলেন, জামিন পাওয়া জঙ্গিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয় সে মামলাগুলো মনিটরিং করা হয়। এছাড়া সাইবার স্পেসে যাতে কেউ উগ্রবাদ ছড়াতে না পারে সেজন্য সাইবার ওয়ার্ল্ডেও নজরদারি করা হয়।