
দেশে বন্যাকবলিত বেশির ভাগ জেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। পানি কমতে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছেন মানুষ। অনেক এলাকায় পানি কমলেও বাড়িঘরে ফেরার মতো অবস্থা এখনো হয়নি। পানি কমে যাওয়ায় বাড়ছে চরম দুর্ভোগ। সিলেট নগরীর উঁচু এলাকায় বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেছে। তবে নিচু এলাকাগুলোয় সড়ক ও বাসাবাড়ি থেকে পানি পুরোপুরি নামেনি। এরই মধ্যে গতকাল তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে সিলেটে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। কোথাও কোথাও অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় তীব্র ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, উজানের ঢল না থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলেও তিস্তাসহ অধিকাংশ নদনদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে উজানের ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীসহ সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যার প্রভাবে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে নদীতীরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বাড়িঘরসহ বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে দরিদ্র মানুষজন মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সিলেট নগরীর অধিকাংশ জায়গা থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও ময়লা-আবর্জনা আর নোংরা পানিতে একাকার হওয়া বাসাবাড়ি, দোকানপাট পরিষ্কারে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। এ ছাড়া নগরীর শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপাড়, যতরপুর, শেখঘাট, তালতলা, জামতলাসহ অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে এখনো বন্যার পানি রয়েছে। সিলেট সদর উপজেলা এবং জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার বন্যাকবলিতরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে রয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করেছেন বন্যাকবলিতরা। সিলেট আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সজীব হোসাইন জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও বৃষ্টিপাত কমেছে। এ অবস্থায় সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে। বন্যার ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে পানিবন্দি মানুষরা আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও সেখানে গিয়ে তাদের পড়তে হয়েছে নতুন ভোগান্তিতে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবারের অভাব ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে বন্যাদুর্গতরা।
গতকাল সোমবার ফের তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে সিলেটে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। কোথাও কোথাও অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি ধীরে নামার কারণে বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। সিলেট জেলা প্রশাসনের গতকাল সোমবার সকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সোমবার পর্যন্ত সিলেটে ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৬৫ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। তাছাড়া জেলার ২৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৩ হাজার ২০৯ জন মানুষ অবস্থান করছেন।
সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরআগে রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত বাড়ায় সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা-কুশিয়ারার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি আরও বেড়েছে। তবে কয়েকটি পয়েন্টে অপরিবর্তিত রয়েছে।
পাউবো জানায়, সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে সোমবার সকাল থেকে একই অবস্থায় রয়েছে। সকাল ৬টায় এ পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপরে। বিকেল ৩টায়ও একই অবস্থায় রয়েছে। গতকাল এ পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপরে। সুরমার পানি সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে থাকলে সকাল ৬টায় ছিল ১০ দশমিক ৪৯ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিকেল ৩টায় সেটি আরও বেড়ে ১০ দশমিক ৫১ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারার পানি আমলশীদ পয়েন্টে সকাল ৬টায় বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। বিকেল ৩টায় তা আরও বেড়ে ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগে গতকাল ছিল বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপরে।
কুশিয়ারার পানির ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে সকাল থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। সকাল ৬টায় এ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। বিকেল ৩টায়ও একই অবস্থায় রয়েছে। গতকাল এ পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার ওপরে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ফেঞ্চুগঞ্জ ও শেরপুরে জুড়ি ও মনু নদী কুশিয়ারার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এ নদীর পানি নামার গতি খুবই কম। তাছাড়া এখন ভাটির দিকে প্রায় সব এলাকা প্লাবিত। তবে বৃষ্টিপাত কমে গেলে ও প্রতিদিন রোদ হলে বন্যার পানি কমে যাবে।
হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি কমলেও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ছয়টি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও মাধবপুর। এলজিআরডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, বন্যায় জেলায় ৫৭ কিলোমিটার পাকা সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী গদাই গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত বসতবাড়ি নদীর কিনারায় ভাঙনের মুখে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বাড়িগুলো নদীতে বিলীন হতে পারে। অনেকে নিজ উদ্যোগে বস্তায় বালু ভরে নদীতে ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে ভাঙন ঠেকাতে পাউবো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীসহ সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে দেড় শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে মানুষজন মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া কাজীপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার চর ও নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় চরাঞ্চলের ফসিল জমি তলিয়ে যাওয়া শুরু করেছে।
শাহজাদপুরের জালালপুর ইউনিয়নের আবদুস সালাম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে পদক্ষেপ না নিলে এ এলাকার অন্তত সাতটি গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।
এদিকে সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এরইমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ছোট নৌকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছেন বানভাসি মানুষ। অনেকেই আবার ফিরছেন গবাদিপশু নিয়ে। তবে বানের পানির স্রোত এতটাই বেশি ছিল যে নিম্নাঞ্চলের পানি ওঠা বসতভিটাগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। তবে বন্যার তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দোয়ারাবাজার, ছাতক ও সুনামগঞ্জ সদর। জেলার সাত উপজেলার সাড়ে ৬ লাখ মানুষ গত এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি থাকার পর এখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে শুরু করেছেন। গত কয়েক দিন পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি বাড়িঘর থেকে নেমে গেছে। জেগে উঠেছে বানের জলে তলিয়ে যাওয়া সড়কগুলোও। সেইসঙ্গে জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ সচল হয়েছে তাহিরপুর উপজেলার। এমনকি খুলে দেয়া হয়েছে জেলার সকল পর্যটন কেন্দ্রগুলো।
তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা বলেন, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এখন আমরা ঘরবাড়ি কীভাবে মেরামত করবো, আর কীভাবে সংসার চালাবো সেটা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আলাল মিয়া বলেন, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি একদম তছনছ হয়ে গেছে। এখন ঘর মেরামত করার জন্য টাকা কোথায় পাবো সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। পাবেল মিয়া বলেন, কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছি। এখন পানি কমেছে বাড়ি এসেছি। এসে দেখি বাড়ি আর বাড়ি নেই। ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
জানা গেছে, ১৭ জুন থেকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সাড়ে ছয় লাখ মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। গত চার দিন ধরে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর পাঁচটি পয়েন্টের মধ্যে ছাতক ছাড়া বাকি সব পয়েন্টে পানি বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই হাওরের পানি বিভিন্ন নদনদী দিয়ে নিষ্কাশিত হচ্ছে। ফলে আতঙ্কিত মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিন ঘণ্টা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হলেও নদ-নদীর পানি বাড়েনি। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মাওসিনরাম মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দ্রুত নেমে গেছে উঁচু এলাকার পানি। এখন নামছে নিচু এলাকার পানি। দুই দিন আগে সুনামগঞ্জ শহর থেকে বিদায় নিয়েছে বানের পানি। তবে অতি নিচু এলাকায় বন্যার স্তরের নিচের স্তরে যারা বাড়িঘর তৈরি করেছেন-তাদের ঘরের পানি নামছে দেরিতে। অতিনিচু এলাকার পানি নামতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানান স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, উজানের ঢল না নামলে বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কোনও কথা নয়। স্থানীয়ভাবে হালকা বা মাঝারি বৃষ্টি হলেও পানি বাড়বে না। তবে উজানে ভারী বর্ষণ হলে পানি কিছুটা বাড়তে পারে। জুনে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কোন শঙ্কা নেই।
জানা গেছে, উজানের ঢল না থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলেও তিস্তাসহ অধিকাংশ নদনদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে উজানের ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীসহ সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যার প্রভাবে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে নদীতীরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বাড়িঘরসহ বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে দরিদ্র মানুষজন মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সিলেট নগরীর অধিকাংশ জায়গা থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও ময়লা-আবর্জনা আর নোংরা পানিতে একাকার হওয়া বাসাবাড়ি, দোকানপাট পরিষ্কারে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। এ ছাড়া নগরীর শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপাড়, যতরপুর, শেখঘাট, তালতলা, জামতলাসহ অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে এখনো বন্যার পানি রয়েছে। সিলেট সদর উপজেলা এবং জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার বন্যাকবলিতরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে রয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করেছেন বন্যাকবলিতরা। সিলেট আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সজীব হোসাইন জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও বৃষ্টিপাত কমেছে। এ অবস্থায় সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে। বন্যার ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে পানিবন্দি মানুষরা আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও সেখানে গিয়ে তাদের পড়তে হয়েছে নতুন ভোগান্তিতে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবারের অভাব ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে বন্যাদুর্গতরা।
গতকাল সোমবার ফের তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে সিলেটে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। কোথাও কোথাও অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি ধীরে নামার কারণে বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। সিলেট জেলা প্রশাসনের গতকাল সোমবার সকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সোমবার পর্যন্ত সিলেটে ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৬৫ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। তাছাড়া জেলার ২৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৩ হাজার ২০৯ জন মানুষ অবস্থান করছেন।
সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরআগে রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত বাড়ায় সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা-কুশিয়ারার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি আরও বেড়েছে। তবে কয়েকটি পয়েন্টে অপরিবর্তিত রয়েছে।
পাউবো জানায়, সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে সোমবার সকাল থেকে একই অবস্থায় রয়েছে। সকাল ৬টায় এ পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপরে। বিকেল ৩টায়ও একই অবস্থায় রয়েছে। গতকাল এ পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপরে। সুরমার পানি সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে থাকলে সকাল ৬টায় ছিল ১০ দশমিক ৪৯ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিকেল ৩টায় সেটি আরও বেড়ে ১০ দশমিক ৫১ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারার পানি আমলশীদ পয়েন্টে সকাল ৬টায় বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। বিকেল ৩টায় তা আরও বেড়ে ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগে গতকাল ছিল বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপরে।
কুশিয়ারার পানির ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে সকাল থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। সকাল ৬টায় এ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। বিকেল ৩টায়ও একই অবস্থায় রয়েছে। গতকাল এ পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার ওপরে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ফেঞ্চুগঞ্জ ও শেরপুরে জুড়ি ও মনু নদী কুশিয়ারার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এ নদীর পানি নামার গতি খুবই কম। তাছাড়া এখন ভাটির দিকে প্রায় সব এলাকা প্লাবিত। তবে বৃষ্টিপাত কমে গেলে ও প্রতিদিন রোদ হলে বন্যার পানি কমে যাবে।
হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি কমলেও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ছয়টি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও মাধবপুর। এলজিআরডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, বন্যায় জেলায় ৫৭ কিলোমিটার পাকা সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী গদাই গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত বসতবাড়ি নদীর কিনারায় ভাঙনের মুখে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বাড়িগুলো নদীতে বিলীন হতে পারে। অনেকে নিজ উদ্যোগে বস্তায় বালু ভরে নদীতে ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে ভাঙন ঠেকাতে পাউবো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীসহ সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে যমুনা নদীর বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে দেড় শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে মানুষজন মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া কাজীপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলার চর ও নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় চরাঞ্চলের ফসিল জমি তলিয়ে যাওয়া শুরু করেছে।
শাহজাদপুরের জালালপুর ইউনিয়নের আবদুস সালাম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে পদক্ষেপ না নিলে এ এলাকার অন্তত সাতটি গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।
এদিকে সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এরইমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ছোট নৌকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছেন বানভাসি মানুষ। অনেকেই আবার ফিরছেন গবাদিপশু নিয়ে। তবে বানের পানির স্রোত এতটাই বেশি ছিল যে নিম্নাঞ্চলের পানি ওঠা বসতভিটাগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। তবে বন্যার তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দোয়ারাবাজার, ছাতক ও সুনামগঞ্জ সদর। জেলার সাত উপজেলার সাড়ে ৬ লাখ মানুষ গত এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি থাকার পর এখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে শুরু করেছেন। গত কয়েক দিন পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি বাড়িঘর থেকে নেমে গেছে। জেগে উঠেছে বানের জলে তলিয়ে যাওয়া সড়কগুলোও। সেইসঙ্গে জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ সচল হয়েছে তাহিরপুর উপজেলার। এমনকি খুলে দেয়া হয়েছে জেলার সকল পর্যটন কেন্দ্রগুলো।
তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা বলেন, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এখন আমরা ঘরবাড়ি কীভাবে মেরামত করবো, আর কীভাবে সংসার চালাবো সেটা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আলাল মিয়া বলেন, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি একদম তছনছ হয়ে গেছে। এখন ঘর মেরামত করার জন্য টাকা কোথায় পাবো সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। পাবেল মিয়া বলেন, কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছি। এখন পানি কমেছে বাড়ি এসেছি। এসে দেখি বাড়ি আর বাড়ি নেই। ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
জানা গেছে, ১৭ জুন থেকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সাড়ে ছয় লাখ মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। গত চার দিন ধরে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর পাঁচটি পয়েন্টের মধ্যে ছাতক ছাড়া বাকি সব পয়েন্টে পানি বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই হাওরের পানি বিভিন্ন নদনদী দিয়ে নিষ্কাশিত হচ্ছে। ফলে আতঙ্কিত মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিন ঘণ্টা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হলেও নদ-নদীর পানি বাড়েনি। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মাওসিনরাম মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দ্রুত নেমে গেছে উঁচু এলাকার পানি। এখন নামছে নিচু এলাকার পানি। দুই দিন আগে সুনামগঞ্জ শহর থেকে বিদায় নিয়েছে বানের পানি। তবে অতি নিচু এলাকায় বন্যার স্তরের নিচের স্তরে যারা বাড়িঘর তৈরি করেছেন-তাদের ঘরের পানি নামছে দেরিতে। অতিনিচু এলাকার পানি নামতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানান স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, উজানের ঢল না নামলে বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কোনও কথা নয়। স্থানীয়ভাবে হালকা বা মাঝারি বৃষ্টি হলেও পানি বাড়বে না। তবে উজানে ভারী বর্ষণ হলে পানি কিছুটা বাড়তে পারে। জুনে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কোন শঙ্কা নেই।