
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে প্রশাসনের কর্মকর্তারা। মূলত অপরাধের কঠোর শাস্তি না হওয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। কারণ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বড় অপরাধ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেতন কর্তন বা তিরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে শাস্তি। অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি না হওয়ায় প্রশাসনে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আচরণ) বিধিমালা সংস্কার করে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা জরুরি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রশাসনের কমকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠছে। বিগত ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কর্মকর্তার নামে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ১০ জন সহকারী সচিব, আটজন সিনিয়র সহকারী সচিব, সাতজন উপ-সচিব, একজন যুগ্ম-সচিব ও একজন অতিরিক্ত সচিবের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ওই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে তদন্ত শেষে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তা প্রকাশ করা হয়নি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জনগণের সেবক। সেবক হিসেবে সেবা দেয়ার জন্য তাদের অনেক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তবু প্রশাসনে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা কেন বারবার ঘটছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া দরুরি। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলে কর্মকর্তারা সতর্ক হবেন। সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমাম আল রাজী টুলুর বিরুদ্ধে গত ২০ মার্চ রাশেদা খানম নামের এক বৃদ্ধাকে নিজ কার্যালয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। উচ্ছেদ অভিযান কেন্দ্র করে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় রাশেদার ছেলেকে আটক করতে গিয়ে তাকে না পেয়ে রাশেদাকে আটক করে আনা হয়। গত ১৪ মার্চ খবর সংগ্রহ করতে গেলে পাঁচ সাংবাদিককে নিজ কার্যালয়ে আটকে রেখে হুমকি দেন লালমনিরহাট সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ-আল-নোমান। পরে খবর পেয়ে ওই জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) টি এম এ মমিন সেখানে গিয়ে সাংবাদিকদের মুক্ত করেন। অবশ্য তার পরদিন আবদুল্লাহ নোমানকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় বদলি করা হয়। গত ৮ মার্চ শেরপুরের নকলায় ইউএনও কার্যালয়ে তথ্য চাইতে গেলে স্থানীয় এক সাংবাদিককে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসদাচরণের অভিযোগে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ ওঠে, তথ্য চাওয়ায় ওই সাংবাদিকের ওপর ক্ষুব্ধ হন ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন। পরে অবশ্য ওই সাংবাদিক জামিনে মুক্তি পান। গত ১২ মার্চ চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেখানকার একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে তর্কে জড়ান। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওই ব্যবসায়ীর কাগজপত্র দেখতে চান। তখন ব্যবসায়ী বলেন, ‘হোল্ড অন’। শব্দটি ভালোভাবে নেননি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়ম করায় মো. রাকিবুজ্জামানের বেতন কমানো হয়েছে। তাকে শাস্তি দিয়ে গত বছর ১৬ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এসিল্যান্ড থাকার সময় যমুনেশ্বরী নদীর বালু উত্তোলনে একজনের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়ায় দুই বছরের জন্য বেতন গ্রেডের নিম্নতম ধাপে অবনমনের শাস্তি দেয়া হয় তাকে। অবসরে যাওয়া কানুনগোর আইডি ব্যবহার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাতটি নামজারি মামলা অনুমোদন করেন বগুড়া সদরের সাবেক সহকারী কমিশনার-ভূমি (এসিল্যান্ড) বীর আমির হামজা। নামজারি মামলা অনুমোদনের পর সৃষ্ট নামজারি খতিয়ানে ওই কানুনগোর স্বাক্ষরও ব্যবহার করেন তিনি। এই গুরুতর অনিয়মেও গত ৯ এপ্রিল আমির হামজার বেতন কমানো হয়েছে মাত্র। পদ্মা সেতু প্রকল্পে সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমি বেআইনিভাবে অধিগ্রহণ দেখিয়ে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তখনকার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা প্রমথ রঞ্জন ঘটকের বিরুদ্ধে। বড় এই জালিয়াতির ঘটনায় গত ৪ এপ্রিল তাকে লঘু দণ্ড দেয়া হয়েছে। সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সহকারী সচিব পদে তার পদাবনতি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রমথ রঞ্জন ঘটক বর্তমানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে উপপ্রধান (হাইড্রোলজিস্ট) হিসেবে কর্মরত আছেন। দুমকী উপজেলার সাবেক ইউএনও আল ইমরান নিলাম ডাকের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকার বার্জ ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে তার বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এক বছর বন্ধ রেখে গত ৫ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একইভাবে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সাবেক উপপরিচালক এরশাদ উদ্দিনকে অসদাচরণের দায়ে দুই বছরের জন্য, কক্সবাজারের সাবেক এডিসি মোহাম্মদ জাফর আলমকে অসদাচরণ ও দুর্নীতির দায়ে তিন বছরের জন্য বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনমন করা হয়েছে। গত বছর জুন ও জুলাই মাসে তাদের এই শাস্তি দেয়া হয়। ভূমি সংস্কার বোর্ডের সাবেক সহকারী ভূমি সংস্কার কমিশনার, বর্তমানে বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামাল মোহাম্মদ রাশেদ পণ্য ও সেবা ক্রয় সংক্রান্ত আইন-বিধির নির্দেশনা লঙ্ঘন করায় গত ১৭ জানুয়ারি তাকে শাস্তি হিসেবে শুধু তিরস্কার করা হয়। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রুহল আমীন সেখানে কর্মরত অবস্থায় নিজের পদবি গোপন করে নিজের ও স্ত্রীর নামে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০২২-এর জন্য আবেদন করেছিলেন। পুরস্কার প্রদানসংক্রান্ত উপজেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি ওই আবেদনে জেলা ও বিভাগীয় কমিটির কাছে সুপারিশও করেছিলেন। এ ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় ‘অসদাচরণের’ দায়ে সম্প্রতি তাকেও দণ্ড হিসেবে শুধু তিরস্কার করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সূত্র আরো জানায়, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর গত বছর ২৩ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়জুন্নেছা আক্তার লঘু দণ্ড পেয়েছিলেন। শাস্তি দেয়ার ছয় মাস না যেতেই ১ আগস্ট ‘নবীন কর্মকর্তা’ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা (অব্যাহতি) পান তিনি। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন সাংবাদিক নির্যাতন করেও প্রভাব খাটিয়ে শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। নীলফামারী জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিনের বিরুদ্ধে বালুমহালের ইজারার টাকা সংক্রান্ত অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই বছরের জন্য তার বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের মতো লঘু দণ্ড দেয়া হয়। পরে তাকে এই লঘু দণ্ডাদেশ থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়। এদিকে প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির শাস্তি শুধুই তিরস্কার, এটা ভাবা যায় না। পৃথিবীর কোনো দেশে দুর্নীতির মতো অপরাধের জন্য তিরস্কারের মতো লঘু দণ্ডের বিধান নেই। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীরা দুর্নীতিপরায়ণ হলে তাঁদের তিরস্কারের মতো লঘু দণ্ড দিয়ে চাকরিতে বহাল রাখার বিধান রেখে ২০১৮ সালে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আচরণ) বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু হয়, তখন তার অপরাধটা কী, তা বিভিন্ন শুনানির মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হয়। বিভিন্ন কমিটি ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে। এরপর একজন কর্মকর্তা যখন দোষী সাব্যস্ত হন, তার অপরাধ অনুযায়ী গুরু বা লঘু শাস্তি পান। প্রশাসনে অসদাচরণের ঘটনা খুব বেশি নয়। তবু যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা হয়।