দীর্ঘ ২০ বছর সংসার করার পরও স্বামীর বিস্বস্ততা অর্জন করতে পারেনি গৃহবধূ আফরিন জাহান। নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে দুই সন্তানের দিকে তাকিয়ে স্বামী মমিরুজ্জামান মনিরের কর্তৃক একাধিকবার শারীরিক নির্যাতনের পরও সংসার করার ইচ্ছে থাকলে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে উঠেনি। এরই মধ্যে বাবার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা এনে দেয়ার পরও প্রতিনিয়ত নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে আফরিন জাহানের। গত কয়েক দিন আগে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিন থানার কাচিয়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা আরিফুজ্জামানের মেয়ে আফরিন জাহান।
লিখিত অভিযোগে আফরিন জানান, একই এলাকার মো. এমরান হোসেন মাতব্বরের ছেলে মো. মনিরুজ্জামান মনিরের সাথে বিগত ৫ মে ২০০৫ সনে দুজনের ভালোবাসার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা কাবিন মূলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভালোভাবেই তাদের সংসার চলে আসছিল। কিন্তু সে সময়ে মনিরুজ্জামানের আসল রূপ চেনা যায়নি। তার বাবা ছিলেন পুলিশের সামান্য একজন কনস্টেবল। তাছাড়া সে সময়ে বোরহান উদ্দিন থানায় মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক অস্ত্র মামলা ছিল। অস্ত্র মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য গ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন। আর এখানেই পরিচয় ঘটে তার সাথে। মনিরুজ্জামান ঢাকা এসে ভবঘুরে বেড়াত। শিক্ষাগতযোগ্যতা কিছুই নেই। বাসার দারোয়ান হিসেবে তার প্রথম কর্ম শুরু হয়। তারই বাসার কেয়াটারেকার থাকা সময়কালীন নানা অপকর্মে তিনি জড়িত হয়ে পড়েন। তখন থেকে মাদক বেচা-কেনা ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্ম কাজে জড়িত হয়ে পড়ার কারণে বাসা থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। তখন মনিরুজ্জামান আরো বেপারোয়া হয়ে পড়েন। বড় বড় ব্যবসায়ীদেরকে অপহরণ করে উৎকোচ আদায় করতেন মনিরুজ্জামান। ঢাকার বড় ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করেন। এরপর আর তাকে পিছনে তাকাতে হয়নি। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর মনিরুজ্জামান যুবলীগের পদ পান। এই সোনার হরিন পদটি পাওয়ার পর তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যুব লীগ নেতা ইসামাইল হোসেন সম্রাট-এর সান্নিধ্যে গিয়ে ওপেন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজিসহ নানা অপরাধ করে হাতিয়ে নেন শত শত কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৫ বছর মনিরুজ্জামান কেরাণীগঞ্জ এলাকায় ৩৩ কাঠার কয়েকটি প্লট, ঢাকা মিরপুরে ৬তলা বাড়ি, রামপুরা বনশ্রীতে বাড়ি, গাজীপুর এলাকায় নালজমি। নিজ গ্রামের বাড়িতে ২টি বাড়ি, নারায়গণগঞ্জে রয়েছে গার্মেন্টস। এছাড়াও নামে বেনামে বহু সম্পত্তি রয়েছে। রাজউকের যত টেন্ডার হতো তার বড় একটি অংশ তাকে দিতে হতো।
আফরিন জাহান আরো জানান, এত কিছুর পরও তার আরো সম্পদের আসায় একের পর এক অপরাধ করে বেড়াতেন। শূন্য থেকে শত কোটি টাকার মালিক মনিরুজ্জামান এখন চারটি গাড়ি ব্যবহার করেন। তিনি নিজে যে গাড়িটি ব্যবহার করেন তার দাম কোটি টাকা। তার এত অবৈধ সম্পদ রয়েছে তা কাউকেই জানতে দিতেন না। আর হঠাৎ করে এত সম্পদ হওয়ার নেপথ্য জানতে চাইলে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। মনিরুজ্জামানের বাহিনী নিয়ে প্রতিদিন রাতে তার নিজ ফ্ল্যাটেই মদের আসর বসাতেন। এমন কি নিজের সন্তানকেও তিনি মাদকের আসক্ত করে তুলেছেন।
গত ৫ আগস্টের পর মনিরুজ্জামান দীর্ঘ সময় পলাতক ছিলেন। কারণ তিনি যুবলীগের নেতা সম্রাটের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন। ৬/৭ মাস পর মনিরুজ্জামান বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ৩য় যুগ্ম সাধারণ সম্পদক পদ নিয়ে এখন আবারো লোকালয়ে এসে তার অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। আফরিন জাহান জানান, মনিরুজ্জামানের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি গত বছর তাকে ডিভোর্স দেন। কিন্তু ডিভোর্সের পর তার ওপর আরো নির্যাতন অত্যাচার বেড়ে যায়। এমন কি অস্ত্রসহ রায়েরবাগ তার বাবার বাসায় গিয়ে পরিবারসহ সবাইকে মারার হুমকি দেন। মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় একাধিক বার জিডি করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোন সুরাহা পাননি তিনি। এখন শুধু মেয়েকে নিয়ে বাবার আশ্রয়ে বসবাস করেন আফরিন জাহান। আওামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতা মনিরুজ্জামান এখন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন পার্টিতে যোগাদান করে ৩য় সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়ে যান। তার শত শত অপকর্ম ঢাকা পড়ে। তিনি এত অপরাধ করার পরও আইন প্রয়োগকারী সদস্যরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। সাংবাদিক সম্মেলনে আফরিন জাহান জানান, স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাকে ডিভোর্স দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন তাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এমন কি তার বাবার বাড়িতেও নিরাপদ নেই। যেকোন সময়ে মনিরুজ্জামান ও তার বাহিনী দ্বারা তিনি বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টার সহায়তা কামনা করেন আফরিন জাহান।