
আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৪-২০২৫ সামনে রেখে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতারা বলেছেন, ‘জনগণের ভোটাধিকার খর্ব করে পুনরায় ক্ষমতায় বসার প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এবারের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। গণবিরোধী ধারায় বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার পুঁজিবাদী তথা নয়া-উদারনীতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মোড়কে গত বছর বাজেট উপস্থাপন করেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। এই বাজেট বৈষম্য আরও বাড়াবে।’ ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জরুরি সংস্কারের প্রত্যাশা করছেন সিপিবি নেতারা। গতকাল রোববার পুরানা পল্টনের মৈত্রী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা অধ্যাপক এম এম আকাশ। উপস্থিত ছিলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, প্রেসিডিয়াম সদস্য শাহিন রহমান, লক্ষ্মী চক্রবর্তি, যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ, চিকিৎসক ডা. ফজলুর রহমানসহ অনেকে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ঋণের সুদের হার ও ডলারের বিনিময় হার যথাসময়ে যথাযথভাবে না বাড়িয়ে বর্তমানে এক লাফে আইএমএফে’র চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ইলেকট্রিক শকের মতো এক লাফে এতটাই বাড়ানো হয়েছে যে, এর ফলে অর্থনীতি সংকোচনশীল প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়েছে। এতে দেশে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমবে, বেকারত্ব বাড়বে এবং দ্রব্যমূল্যও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অভাবে দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদক ও ভোক্তা দামের মধ্যে পার্থক্য বেড়েই চলছে। এবার কৃষি উপকরণের বাজারেও ঠিকমত ভর্তুকি বরাদ্দ ও বণ্টন না হলে গারিব ও বর্গা-চাষী ঠিকমত উৎপাদনও নাও করতে পারে। তখন কৃষি পণ্যের উৎপাদনের সংকট সৃষ্টি হলে, খাদ্য নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে সিপিবি। এসব ক্ষেত্রে জরুরি সংস্কার করা হবে প্রত্যাশা জানিয়ে আরও বলা হয়, ‘কতটুকু সংস্কার আগামী বাজেটে নেওয়া হলো এবং তার কতটুকু বাস্তবায়নের ক্ষমতা বাজেট বাস্তবায়ন এজেন্সিগুলির আছে, তা ৬ জুন বাজেট ঘোষণার পর নিশ্চয়ই সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাজেটের খসড়া ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত হয়ে গেছে। ওই অনুমোদিত দলিলটিই বাজেট ঘোষণায় প্রকাশিত হবে মাত্র। তাই আমরা জনগণকে জাতীয় ও শ্রেণি স্বার্থ সচেতন হয়ে আগামী দিনে শ্রেণি ও জাতীয় ন্যায্য অধিকারগুলি আদায়ের জন্য এগিয়ে আসতে আহ্বান জানাচ্ছি।’ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফএর কাছ থেকে মাত্র ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার শর্তের বিনিময়ে তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেই এই বাজেট প্রণয়ন করতে হবে সরকারকে। ইতোমধ্যে এর আলামতস্বরূপ বিদ্যুৎ জ¦ালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি করে তাদের শর্ত পূরণ করা হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং আরও তীব্র হবে পরিস্থিতি। বৈদেশিক দেনা বাড়ছে এবং ঋণ করে ঋণ পরিশোধের তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেনের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে শহরাঞ্চলে বৈষম্য সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের ভাষায় ‘কেউ থাকেন গাছতলায় আর কেউ থাকেন আকাশচুম্বি অট্টালিকায়’। এই হাল শুধু আয়ের ক্ষেত্রে সত্য নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনগণের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক অন্যান্য অধিকারের সকল ক্ষেত্রেই সত্য। বর্তমানে বাংলাদেশে সবক্ষেত্রে শুধু আকাশচুম্বী বৈষম্যই সৃষ্টি হয়নি, এই বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে যুগপৎ ‘অনুপার্জিত আয়’ এবং ‘শোষণ’ প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত তীব্র থেকে তীব্রতর করার মাধ্যমে। সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, অসৎ আমলা, অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসৎ রাজনীতিবিদ- এই শ্রেণি তিনটি শুধু লুটেরা পুঁজির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিভুজ শাসক শ্রেণির তিনটি বাহু নয়, তারা একইসঙ্গে আমাদের বর্তমান অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে বিভিন্ন ধরণের সংকটের স্রষ্টা। তারাই আমদানি-রপ্তানির আন্ডার ইনভয়েস, ওভার ইনভয়েস করেন, তারাই দুবাইয়ে বা মালয়েশিয়ায় বা বাইরের অন্যান্য দেশে নানা স্থাবর সম্পত্তি তৈরি করেন, তারাই দ্বৈত নাগরিকত্বের সূত্রে জাতীয় সুযোগ-সুবিধা সংগ্রহ করে অন্য জাতির অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতির কারণে এখন ভিয়েতনামের চেয়ে বাণিজ্য ব্যয় (পড়ংঃ ড়ভ নঁংরহবংং) অনেক বেশি হওয়ায় বিদেশি উৎপাদনশীল বিনিয়োগও সেখানে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় অন্যত্র ধাবিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম টানেল প্রকল্প ও রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের দুর্নীতি ও অপচয়ের দৃষ্টান্তের কথা সবারই জানা আছে, বলে উল্লেখ করা হয় লিখিত বক্তব্যে।