
ভারত গিয়ে খুন হওয়া বাংলাদেশের এমপি আনার হত্যা মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। হত্যা ঘটনার বর্ণনা ও অপরাধীদের স্বীকারোক্তি পেলেও তার দেহাবশেষ পাওনা না গেলে হত্যা মামলার বিচারকাজ অসম্পূর্ণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েও এখন পর্যন্ত এমপি আনারের লাশ খুঁজে পায়নি। এছাড়াও তার দেহের খণ্ডিত অংশ পাওয়া নিয়েও নানা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ হিসেবে জানা গেছে, ঘাতকরা এমপি আনারকে হত্যার পর লাশ গুম করতে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছে। সরকার পক্ষের একজন আইননজীবী বলেন, হত্যা মামলায় অবশ্যই দৃশ্যমান প্রমাণ থাকতে হবে। প্রথমত, সত্যতা লাগবে হত্যা মামলার ভিকটিম জীবিত নাকি মৃত। এরপর তিনি মারা যাওয়ার তথ্য থাকলে তার মৃত্যুর ঘটনার দৃশ্যত আলামত লাগবে। যদি হত্যার শিকার ব্যক্তি বা ভিকটিমের লাশ বা দেহ একেবারেই না পাওয়া যায়, তবে সেই হত্যা মামলা একটা পর্যায়ে এসে টেকানো যায় না। হত্যার বর্ণনা ও ঘটনায় অপরাধীরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে সেই মামলা প্রমাণ হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা হলেও একটা পর্যায়ে এই আসামিরাই বলে থাকেন, তাদের দিয়ে জোরপূর্বক জবানবন্দি শিখিয়ে বলানো হয়েছে। তখন হত্যার আলামত না থাকলে মামলার বিচার কাজে বেগ পেতে হয়। এক সময় দেখা যায় ঘটনা সত্য হলেও সঠিক প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। হত্যা মামলার ক্ষেত্রে দালিলিক এবং দৃশ্যমান প্রমাণ লাগবেই। চিকিৎসার জন্য ভারত গিয়ে হত্যার শিকার বাংলাদেশি সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনারের লাশ বা দেহের অংশ এখনো খুঁজে পায়নি ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে তার হত্যার ঘটনা নিশ্চিত হয়েছেন তারা। এ বিষয়ে দুই দেশেই পৃথক দুটি মামলাও দায়ের হয়েছে। গত ২২ মে এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন অজ্ঞাতনামা আসামি করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শেরেবাংলা নগর থানায় খুন করার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
অপরদিকে এমপি আনার খুনের ঘটনায় ভারতের কলকাতার নিউটাউন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ বাদী হয়ে ওই মামলা রুজু করে। গোয়েন্দা সংস্থাসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এমপি আনারের বিষয়টি নিজে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে গ্রেফতারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তথ্য বিনিময় ও অধিকতর তদন্তের জন্য ভারতীয় পুলিশের একটি দল ঢাকায় এসেছে। বাংলাদেশে থেকেও পুলিশের তিন সদস্যের একটি দল শিগগিরই কলকাতা যাবে। তবে হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পরও এবং দেশ ত্যাগের দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এমপি আনারের দেহ বা দেহের অংশ উদ্ধার হওয়া নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। ভারতে গ্রেফতার হওয়া আসামি কসাই জিহাদকে নিয়ে কয়েক দফা অভিযান চালালেও এখনো পর্যন্ত আনারের দেহের কোনো অংশই উদ্ধার করতে পারেনি দেশটির সিআইডি। জিহাদ বারাসাত আদালতের আদেশে ১২ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
ইতোমধ্যে এ ঘটনায় ২৩ মে (বৃহস্পতিবার) সৈয়দ আমানুল্লাহ, ফয়সাল আলী ও শিলাস্তি রহমানকে শেরেবাংলা নগর থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পরে তাদের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এই ঘটনায় জড়িত কসাই জিহাদ হাওলাদারকে কলকাতার চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ। জিহাদকে কলকাতার বারাসতের জেলা ও দায়রা আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে ১২ দিনের রিমান্ডে পাঠান। জিহাদ হাওলাদার মুম্বাইতে কসাইয়ের কাজ করতেন এবং এমপি আনারকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার বাড়ি বাংলাদেশের খুলনা জেলার বারাকপুরে। পশ্চিমবঙ্গের গোয়েন্দা বিভাগের (সিআইডি) জিজ্ঞাসাবাদে কসাই জিহাদ জানিয়েছেন, আনারকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করতে জিহাদকে ভাড়া করেন খুনিরা। লাশ গুম করতে ৫ হাজার রুপি চুক্তিতে আনারের লাশ অন্তত ৮০ টুকরা করেন জিহাদ। পরে তা ফেলা হয় খালসহ বিভিন্ন স্থানে। সিআইডির ধারণা, এমপি আনারের মরদেহের খণ্ডিত অংশ এরইমধ্যে হয়তো চলে গেছে বিভিন্ন জলজ প্রাণীর পেটে। এতে করে তার দেহাংশ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সিআইডি বলছে, আনারকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বলেন, হত্যা মামলায় লাশ বা দেহাবশেষ না পেলে সেই মামলা একটা সময় টিকবে না। মামলার বিচার কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অপরাধীরা অপরাধ সংগঠিত করে থাকলেও তারা পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এক্ষেত্রে বেশি থাকে। তানজিম আল ইসলাম আরও বলেন, অপরাধীরা আদালতে হত্যার স্বীকারোক্তি দিলে সেটা মামলার চার্জশিটে কাজে লাগবে, এতে করে চার্জশীট হতে পারে, তবে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন লাগবেই। এছাড়া মৃতদেহের আলামত লাগবে।
এমপি আনার হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবশ্যই এমপি আনারের হত্যা মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হলে তার লাশ বা দেহের অংশ লাগবে। মরদেহের অংশ ছাড়া হত্যা মামলার বিচার কাজ অসম্পূর্ণ হবে। এদিকে হত্যার ঘটনায় জড়িত কয়েকজন গ্রেফতার হলেও এখন পর্যন্ত হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে পারেনি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ধারণা করছে, ব্যবসায়িক লেনদেন, আধিপত্য বিস্তারের কারণসহ অনেক কিছু থাকতে পারে এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে। ইতোমধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটনে ডিবি পুলিশের তিন সদস্যের একটি টিম ভারত যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ডিএমপির এক পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) বলেন, লাশ বা দেহের অংশ বা দেহাবশেষ পাওয়া না গেলেও অপরাধীদের স্বীকারোক্তি এবং হত্যার আলামত পেলে খুন এবং লাশ গুমের অপরাধে চার্জশীট প্রস্তুত করা যাবে। সেই সূত্র ধরেই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করা যাবে। যেহেতু আসামিরাই স্বীকার করেছেন এবং তাদের বর্ণনামতে কিছু আলামত পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় ময়নাতদন্ত না করা গেলেও ডিএনএ রিপোর্ট এবং অপরাধীদের বর্ণনা অনুযায়ী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যায়। মামলার আসামিরা আদালতে অপরাধ স্বীকার করার পর এক সময় বলে থাকেন পুলিশ তাদের মারধর করে অপরাধ স্বীকার করিয়েছেন, সেক্ষেত্রে কী হবে- এমন প্রশ্নে শহিদুল হক বলেন, আসামিরা যখন আদালতে বিচারকের কাছে জবানবন্দি প্রদান করে থাকেন, তখন তার সঙ্গে কোনো পুলিশ থাকে না। জবানবন্দি গ্রহণের সময় আসামিদের বলা হয়, তিনি সজ্ঞানে জবানবন্দি দিচ্ছেন কিনা। ওই সময় পুলিশ বা কারো ভয়ভীতি দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। আদালতে দেয়া সেই জবানবন্দি পরবর্তীতে পাল্টানোর কোনো সুযোগ নেই। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত দিয়ে গত ১২ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ যান ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে তিনি দর্শনা চেকপোস্ট পার হয়ে ভারতের গেদে স্টেশনে প্রবেশ করেন। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে অল্প সময়ের মধ্যে একটি লাগেজ নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত রিকশায় রওনা হন। ভারতের রাজ্য সরকারের শুল্ক দপ্তরের এক কর্মকর্তার মালিকানাধীন কলকাতার নিউ টাউনের সঞ্জিবা গার্ডেনের ৫৬ বিইউ ফ্ল্যাটেই এমপি আনারকে হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। সেই ফ্ল্যাটেই গত ১৩ মে উঠেছিলেন এমপি আনার।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এমপি আনার ওই ফ্লাটে একাই গিয়েছিলেন। এরপরই ওই ফ্ল্যাটে ঢোকেন একজন নারীসহ পরপর তিনজন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তিনজন বের হয়ে যায়।
সূত্রে জানা গেছে, এক সময় দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন আনার। অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য পাচারের হোতা হিসেবেও পুলিশের খাতায় নাম ছিল তার। ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড আসামিও ছিলেন এমপি আনার। ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড আসামি হিসেবে পুলিশ একবার তাকে আটক করলেও তার ক্যাডাররা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল বলেও জানা গেছে। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যৌথবাহিনীর অপারেশনের সময় আত্মগোপনে ছিলেন আনার। আনারের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং চরমপন্থিদের আশ্রয় ও হত্যার অভিযোগে ২১টি মামলা ছিল। নির্বাচনি হলফনামায় তিনি ২১টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেন। এমপি আনারের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল কয়েকজনের। স্বর্ণ চোরাচালান থেকে শুরু করে হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত রয়েছেন সাবেক দুই এমপি। স্বর্ণ চোরাচালানের অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে তাদের সঙ্গে আনারের দ্বন্দ্ব ছিল বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন তথ্যে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার বর্ণনায় কিলিং মিশনের প্রধান গ্রেফতারকৃত আমানুল্লাহ বলেছেন, আখতারুজ্জামান তাকে ৫ কোটি টাকার চুক্তিতে খুনের দায়িত্ব দেন। পরে আমানুল্লাহই ভাড়া করেন মোস্তাফিজুর রহমান ফকির ও ফয়সাল আলীকে। এই দুজনের বাড়ি খুলনার ফুলতলায়। পরে এদের দুজনের মাধ্যমে জিহাদ ও সিয়াম নামের আরও দুজনকে ভাড়া করা হয়। আনার ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনবার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরমধ্যে প্রথমবার ২০১৪ সালে বিনাভোটে এমপি হয়েছিলেন আনার। সংসদ সদস্য হওয়ার পর সব মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন তিনি।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহা-পুলিশ পরিদর্শক (আইজির) একেএম শহিদুল হক বলেন, হত্যা মামলায় যদি লাশ না-ও পাওয়া যায় তবুও তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি গুমের আলামত এবং সাক্ষ্য প্রমাণ যোগার করতে পারেন তাহলে ঘটনা প্রমাণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, সেই ক্ষেত্রে আসামিদের জবানবন্দিমতে তদন্ত করতে হবে যে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ঠিক আছে কিনা। পাশাপাশি হত্যার উদ্দেশ্যে লাশ গুমের প্রমাণ আগে করতে হবে। তাহলে চার্জশিট তৈরি করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যাবে। লাশ গুমের বিষয় প্রমাণ হলেই হত্যার ঘটনার বিচার করা যাবে। সেই ক্ষেত্রে অনেক সাক্ষ্য প্রমাণ লাগবে, বলেন পুলিশের এই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
অপরদিকে এমপি আনার খুনের ঘটনায় ভারতের কলকাতার নিউটাউন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ বাদী হয়ে ওই মামলা রুজু করে। গোয়েন্দা সংস্থাসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এমপি আনারের বিষয়টি নিজে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে গ্রেফতারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তথ্য বিনিময় ও অধিকতর তদন্তের জন্য ভারতীয় পুলিশের একটি দল ঢাকায় এসেছে। বাংলাদেশে থেকেও পুলিশের তিন সদস্যের একটি দল শিগগিরই কলকাতা যাবে। তবে হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পরও এবং দেশ ত্যাগের দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এমপি আনারের দেহ বা দেহের অংশ উদ্ধার হওয়া নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। ভারতে গ্রেফতার হওয়া আসামি কসাই জিহাদকে নিয়ে কয়েক দফা অভিযান চালালেও এখনো পর্যন্ত আনারের দেহের কোনো অংশই উদ্ধার করতে পারেনি দেশটির সিআইডি। জিহাদ বারাসাত আদালতের আদেশে ১২ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
ইতোমধ্যে এ ঘটনায় ২৩ মে (বৃহস্পতিবার) সৈয়দ আমানুল্লাহ, ফয়সাল আলী ও শিলাস্তি রহমানকে শেরেবাংলা নগর থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পরে তাদের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এই ঘটনায় জড়িত কসাই জিহাদ হাওলাদারকে কলকাতার চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ। জিহাদকে কলকাতার বারাসতের জেলা ও দায়রা আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে ১২ দিনের রিমান্ডে পাঠান। জিহাদ হাওলাদার মুম্বাইতে কসাইয়ের কাজ করতেন এবং এমপি আনারকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার বাড়ি বাংলাদেশের খুলনা জেলার বারাকপুরে। পশ্চিমবঙ্গের গোয়েন্দা বিভাগের (সিআইডি) জিজ্ঞাসাবাদে কসাই জিহাদ জানিয়েছেন, আনারকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করতে জিহাদকে ভাড়া করেন খুনিরা। লাশ গুম করতে ৫ হাজার রুপি চুক্তিতে আনারের লাশ অন্তত ৮০ টুকরা করেন জিহাদ। পরে তা ফেলা হয় খালসহ বিভিন্ন স্থানে। সিআইডির ধারণা, এমপি আনারের মরদেহের খণ্ডিত অংশ এরইমধ্যে হয়তো চলে গেছে বিভিন্ন জলজ প্রাণীর পেটে। এতে করে তার দেহাংশ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সিআইডি বলছে, আনারকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বলেন, হত্যা মামলায় লাশ বা দেহাবশেষ না পেলে সেই মামলা একটা সময় টিকবে না। মামলার বিচার কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অপরাধীরা অপরাধ সংগঠিত করে থাকলেও তারা পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এক্ষেত্রে বেশি থাকে। তানজিম আল ইসলাম আরও বলেন, অপরাধীরা আদালতে হত্যার স্বীকারোক্তি দিলে সেটা মামলার চার্জশিটে কাজে লাগবে, এতে করে চার্জশীট হতে পারে, তবে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন লাগবেই। এছাড়া মৃতদেহের আলামত লাগবে।
এমপি আনার হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবশ্যই এমপি আনারের হত্যা মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হলে তার লাশ বা দেহের অংশ লাগবে। মরদেহের অংশ ছাড়া হত্যা মামলার বিচার কাজ অসম্পূর্ণ হবে। এদিকে হত্যার ঘটনায় জড়িত কয়েকজন গ্রেফতার হলেও এখন পর্যন্ত হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে পারেনি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ধারণা করছে, ব্যবসায়িক লেনদেন, আধিপত্য বিস্তারের কারণসহ অনেক কিছু থাকতে পারে এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে। ইতোমধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটনে ডিবি পুলিশের তিন সদস্যের একটি টিম ভারত যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ডিএমপির এক পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) বলেন, লাশ বা দেহের অংশ বা দেহাবশেষ পাওয়া না গেলেও অপরাধীদের স্বীকারোক্তি এবং হত্যার আলামত পেলে খুন এবং লাশ গুমের অপরাধে চার্জশীট প্রস্তুত করা যাবে। সেই সূত্র ধরেই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করা যাবে। যেহেতু আসামিরাই স্বীকার করেছেন এবং তাদের বর্ণনামতে কিছু আলামত পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় ময়নাতদন্ত না করা গেলেও ডিএনএ রিপোর্ট এবং অপরাধীদের বর্ণনা অনুযায়ী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যায়। মামলার আসামিরা আদালতে অপরাধ স্বীকার করার পর এক সময় বলে থাকেন পুলিশ তাদের মারধর করে অপরাধ স্বীকার করিয়েছেন, সেক্ষেত্রে কী হবে- এমন প্রশ্নে শহিদুল হক বলেন, আসামিরা যখন আদালতে বিচারকের কাছে জবানবন্দি প্রদান করে থাকেন, তখন তার সঙ্গে কোনো পুলিশ থাকে না। জবানবন্দি গ্রহণের সময় আসামিদের বলা হয়, তিনি সজ্ঞানে জবানবন্দি দিচ্ছেন কিনা। ওই সময় পুলিশ বা কারো ভয়ভীতি দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। আদালতে দেয়া সেই জবানবন্দি পরবর্তীতে পাল্টানোর কোনো সুযোগ নেই। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত দিয়ে গত ১২ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ যান ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে তিনি দর্শনা চেকপোস্ট পার হয়ে ভারতের গেদে স্টেশনে প্রবেশ করেন। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে অল্প সময়ের মধ্যে একটি লাগেজ নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত রিকশায় রওনা হন। ভারতের রাজ্য সরকারের শুল্ক দপ্তরের এক কর্মকর্তার মালিকানাধীন কলকাতার নিউ টাউনের সঞ্জিবা গার্ডেনের ৫৬ বিইউ ফ্ল্যাটেই এমপি আনারকে হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। সেই ফ্ল্যাটেই গত ১৩ মে উঠেছিলেন এমপি আনার।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এমপি আনার ওই ফ্লাটে একাই গিয়েছিলেন। এরপরই ওই ফ্ল্যাটে ঢোকেন একজন নারীসহ পরপর তিনজন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তিনজন বের হয়ে যায়।
সূত্রে জানা গেছে, এক সময় দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন আনার। অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য পাচারের হোতা হিসেবেও পুলিশের খাতায় নাম ছিল তার। ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড আসামিও ছিলেন এমপি আনার। ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড আসামি হিসেবে পুলিশ একবার তাকে আটক করলেও তার ক্যাডাররা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল বলেও জানা গেছে। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যৌথবাহিনীর অপারেশনের সময় আত্মগোপনে ছিলেন আনার। আনারের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং চরমপন্থিদের আশ্রয় ও হত্যার অভিযোগে ২১টি মামলা ছিল। নির্বাচনি হলফনামায় তিনি ২১টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেন। এমপি আনারের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল কয়েকজনের। স্বর্ণ চোরাচালান থেকে শুরু করে হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত রয়েছেন সাবেক দুই এমপি। স্বর্ণ চোরাচালানের অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে তাদের সঙ্গে আনারের দ্বন্দ্ব ছিল বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন তথ্যে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার বর্ণনায় কিলিং মিশনের প্রধান গ্রেফতারকৃত আমানুল্লাহ বলেছেন, আখতারুজ্জামান তাকে ৫ কোটি টাকার চুক্তিতে খুনের দায়িত্ব দেন। পরে আমানুল্লাহই ভাড়া করেন মোস্তাফিজুর রহমান ফকির ও ফয়সাল আলীকে। এই দুজনের বাড়ি খুলনার ফুলতলায়। পরে এদের দুজনের মাধ্যমে জিহাদ ও সিয়াম নামের আরও দুজনকে ভাড়া করা হয়। আনার ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনবার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরমধ্যে প্রথমবার ২০১৪ সালে বিনাভোটে এমপি হয়েছিলেন আনার। সংসদ সদস্য হওয়ার পর সব মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন তিনি।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহা-পুলিশ পরিদর্শক (আইজির) একেএম শহিদুল হক বলেন, হত্যা মামলায় যদি লাশ না-ও পাওয়া যায় তবুও তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি গুমের আলামত এবং সাক্ষ্য প্রমাণ যোগার করতে পারেন তাহলে ঘটনা প্রমাণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, সেই ক্ষেত্রে আসামিদের জবানবন্দিমতে তদন্ত করতে হবে যে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ঠিক আছে কিনা। পাশাপাশি হত্যার উদ্দেশ্যে লাশ গুমের প্রমাণ আগে করতে হবে। তাহলে চার্জশিট তৈরি করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যাবে। লাশ গুমের বিষয় প্রমাণ হলেই হত্যার ঘটনার বিচার করা যাবে। সেই ক্ষেত্রে অনেক সাক্ষ্য প্রমাণ লাগবে, বলেন পুলিশের এই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।