
উত্তাল দেশ
ধর্ষণের বিচার দাবি
- আপলোড সময় : ১০-০৩-২০২৫ ১০:০০:১৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১০-০৩-২০২৫ ১০:০০:১৮ পূর্বাহ্ন


* বিক্ষোভ শেষে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আল্টিমেটাম
* বিচারের দাবিতে ইবি শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ
* জাবি শিক্ষার্থীদের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ
* চট্টগ্রামে ধর্ষণের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন
* ধর্ষণ-নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে খোলা হচ্ছে হটলাইন
* মাগুরায় শিশু ধর্ষণে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ হাইকোটের
হাবিবুর রহমান
বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল সারাদেশ। ঢাকাসহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা গত শনিবার দিবাগত মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেছেন। গতকাল রোববারও ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি এবং নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। মাগুরায় শিশু ধর্ষণে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। জাবি শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্ষকদের কোনো স্থান হবে না। মাগুরায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধর্ষণ-নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে খোলা হচ্ছে হটলাইন। এছাড়াও মাগুরায় ৮ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। গতকাল রোববার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে মাগুরায় ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন ব্যারিস্টার মাহসিব হোসাইন। তিনি শিশুটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আর্জি জানান।
জানা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে ঢাকাসহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শনিবার মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ ও অবস্থান থেকে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে চব্বিশ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সেটি না হলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হবে বলে দাবি জানানো হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে হেনস্তার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের একজন কর্মচারীকে পুলিশ গ্রেফতারের পর তৌহিদী জনতা নাম দিয়ে একদল ব্যক্তি থানার সামনে অবস্থান নিয়ে হট্টগোল করে। পরে গত বৃহস্পতিবার ওই ব্যক্তি আদালতে জামিন পান। এ ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি দাবি করে বিবৃতি দিয়েছেন। এর মধ্যেই মাগুরায় একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। ওই শিশুর অবস্থা ‘ক্রিটিক্যাল’ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমন প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও নারী নির্যাতনের সাথে জড়িত নিপীড়কদের শাস্তির দাবিতে শনিবার মধ্যরাতে হল ছেড়ে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন ছাত্রীরা। পরে তাদের সাথে কয়েকটি হলের ছাত্ররাও যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও একই দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি, লোকপ্রশাসন, বাংলা, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিক্ষোভ করেছেন। গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসব বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ধর্ষকদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে মুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীদের। এ সময় তারা ‘আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, ধর্ষকদের ফাঁসি দে’, ‘হ্যাং দ্য রেপিস্ট, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ সেøাগান দেন। সমাবেশে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করা না পর্যন্ত ধর্ষকদের কেন বিচার শুরু হয় না, তা জানতে চান। অন্তর্বর্তী সরকার দলীয় সরকার না হওয়া সত্ত্বেও ধর্ষকদের শাস্তির ব্যবস্থা কেন করতে পারছে না, তা জানতে চান। শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘প্রত্যেক ধর্ষিত বোনের পাশে আমরা আছি। তাদের ধর্ষণের বিচারের জন্য আমরা রাস্তায় নামব।’
ঢামেকের অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব তার বক্তব্যে বলেন, যারা ধর্ষণ করে এবং যারা এদের মদদ দেয়, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এর আগে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ধর্ষণের সেঞ্চুরি করা হয়েছে। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপরাজেয় বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা প্রমুখ। সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারাও।
প্রতিবাদ সমাবেশে অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন বলেন, ‘২০০৫ সালে পূজার যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে তাকে যে ধর্ষণ করা হয়েছিল, যে করেছিল, সে কিন্তু এখন জেল থেকে বের হয়ে গেছে। তার মানে আমরা দেখছি, নির্যাতন শুধু ঘটতে দেয়া হচ্ছেই না, যাদের এটা থামানোর কথা, তারা চোখ বন্ধ করে আছে।’ বেলা সাড়ে ১১টা থেকেই বিক্ষোভ মিছিল করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিবাদ সমাবেশের পর দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে তারা অপরাজেয় বাংলায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সেখানে শিক্ষকশিক্ষার্থীরা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
এদিকে দেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল করে ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ) ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শর্মি হোসেন ও নোভা আহমেদ এতে নেতৃত্ব দেন। এনএসইউর আট নম্বর গেট থেকে শুরু হয়ে আইইউবির সামনে দিয়ে ঘুরে আবারও এনএসইউর সামনে এসে সমাবেশটি শেষ হয়।
সমাবেশে শর্মি হোসেন নারীর প্রশ্নে বর্তমান সরকারের অবস্থান জানতে চান। পাশাপাশি ধর্ষণ প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান তিনি। সমাবেশে থাকা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেন, ‘আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। ধর্ষণের বিচার এক মাসের মধ্যে হচ্ছে, এমন দেখতে চাই।’
এদিকে মাগুরায় শিশু ধর্ষণে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। গতকাল রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়ক অবরোধ করেন। এর আগে বেলা ১২টার দিকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রধান ফটক সংলগ্ন সড়কে অবস্থান নেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ধর্ষকের বিচার ও নারীদের নিরাপত্তার দাবি সংবিলত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
অপরদিকে সারাদেশে ধর্ষণের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ধর্ষকদের ফাঁসির দাবিতে শনিবার মধ্যরাত থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাস। মাগুরার ৮ বছরের শিশু আছিয়াসহ অসংখ্য ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের ঘটনার জেরে এ আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ধর্ষকদের ফাঁসি ও তাদের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সেøাগান দিতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এ সময় প্রায় আড়াইশো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। মিছিলটি জব্বারের মোড় থেকে শুরু হয়ে উপাচার্যের বাসভবন, কৃষি কন্যা হল এবং কে. আর মার্কেট প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যালিপ্যাডে এসে শেষ হয়। এরপর দুপুর ১২ টায় আমতলা সংলগ্ন মুক্তমঞ্চে আবারও আন্দোলনের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে সন্ধ্যা ৬ টায় ধর্ষণ বিরোধী মশাল মিছিল করবে বাকৃবির বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা।
এছাড়াও মাগুরায় ৮ বছরের শিশু ধর্ষণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের দাবিতে মধ্যরাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ-মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার রাত পৌনে দুইটায় বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জমায়েত করে সেখান থেকে একটি মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাত পৌনে তিনটায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
গত ১৮ বছরের সকল ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত বিচার কার্যকর ও ফাঁসির দাবিতে গত শনিবার দিনব্যাপী গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় নাগরিক কমিটি, চট্টগ্রাম। কর্মসূচিতে সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের দাবিতে নিজেদের স্বাক্ষর প্রদান করেন।
এদিকে মাগুরায় ৮ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। গতকাল রোববার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে মাগুরায় ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন ব্যারিস্টার মাহসিব হোসাইন। তিনি শিশুটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আর্জি জানান। পরে ধর্ষণের শিকার শিশুটির সব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ সময় হাইকোর্ট বলেন, ধর্ষণের শিকার শিশুটির ছবি যারা প্রকাশ করছেন তারা আইন ভাঙছেন। এটা অন্যায়। ছবি নির্ধারিত সময়ে না সরালে নতুন আদেশ দেয়া হবে। এদিকে ধর্ষণের ঘটনার তিন দিন পর ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে গত শনিবার মাগুরা সদর থানায় মামলা করেছেন। এতে আসামি করা হয়েছে চারজনকে। তাদের সবাইকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলো-শিশুটির ভগ্নিপতি সজিব শেখ, সজিবের ভাই রাতুল শেখ, বাবা হিটু শেখ ও মা জাবেদা বেগম। এজাহারে বলা হয়েছে, আট বছরের শিশুটিকে ধর্ষণ করে তার বোনের শ্বশুর হিটু শেখ। মামলার এজাহারে শিশুটির মা উল্লেখ করেন, ওই দিন রাতে বড় মেয়ের স্বামীর সহায়তায় তার বাবা হিটু শেখ শিশুটিকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি হিটুর স্ত্রী ও আরেক ছেলেও জানতেন। ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য তারা শিশুটিকে হত্যাচেষ্টা করে। এজাহারে আরও বলা হয়, চার মাস আগে বড় মেয়ের সঙ্গে সজিবের বিয়ে হয়। এর পর থেকে বড় মেয়েকে তার শ্বশুর অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। বিষয়টি ওই পরিবারের সবাই জানলেও প্রতিবাদ কেউ করেনি। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, চার মাস আগে মাগুরা পৌর এলাকার এক তরুণের সঙ্গে শিশুটির বড় বোনের বিয়ে হয়। ওই বাড়িতে বোনের স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও ভাশুর থাকতেন। বিয়ের পর থেকে বড় মেয়েকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন তার শ্বশুর। বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যরা জানতেন। এ নিয়ে ঝগড়াও হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ১ মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যায় আট বছরের শিশুটি। এজাহারে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাদী উল্লেখ করেন, গত বুধবার রাত ১০টার দিকে খাবার খেয়ে বড় বোন ও তার স্বামীর সঙ্গে একই কক্ষে ঘুমায় শিশুটি। দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে বড় বোন ঘুম থেকে জেগে দেখেন, ছোট বোন পাশে নেই, মেঝেতে পড়ে আছে। তখন শিশুটি বড় বোনকে জানায়, তার যৌনাঙ্গে জ্বালাপোড়া হচ্ছে। কিন্তু বড় বোন মনে করে, শিশুটি ঘুমের মধ্যে আবোল-তাবোল বকছে। এরপর সকাল ছয়টার দিকে শিশুটি আবার বোনকে যৌনাঙ্গে জ্বালাপোড়ার কথা বলে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বোনকে জানায়, রাতে দুলাভাই (বোনের স্বামী) দরজা খুলে দিলে তার বাবা (শ্বশুর) তার মুখ চেপে ধরে তার কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন। সে চিৎকার করতে গেলে তার গলা চেপে ধরা হয়। পরে তাকে আবার বোনের কক্ষের মেঝেতে ফেলে রেখে যায়। বোন বিষয়টি মোবাইল ফোনে তার মাকে জানাতে গেলে সজীব ফোন কেড়ে নিয়ে মারধর করেন। ঘটনা কাউকে জানালে হত্যার হুমকি দেন। পরে দুই বোনকে দুই কক্ষে আটকে রাখা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিশুটি আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে সজিবের মা মাগুরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে শিশুটিকে হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যান তিনি। মেয়েটির বড় বোন সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার ২০ দিন আগে সন্ধ্যায় বাড়িতে কেউ ছিল না। তিনি ঘরে আলো জ্বালিয়ে টয়লেটে যান। সেখান থেকে ফিরে দেখেন ঘরে আলো বন্ধ। এসময় হঠাৎ একজন পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। উচ্চতা ও অন্যান্য বিষয় দেখে তিনি বুঝতে পারেন, জড়িয়ে ধরা ব্যক্তি তার শ্বশুর হিটু শেখ। বিষয়টি স্বামী সজিবকে তিনি জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। পরে বাবার বাড়ি চলে যান। আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চাইছিলেন না। বাবা-মা বুঝিয়ে ছোট বোনকে সঙ্গে করে পাঠিয়ে দেন শ্বশুর বাড়ি। পরিবার জানায়, আট বছরের শিশুটিকে গত বুধবার ধর্ষণের শিকার হয়। প্রথমে তাকে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও তার অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে অচেতন অবস্থায় শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে গত শুক্রবার রাতে শিশুটিকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে বিকেল ৫টার দিকে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়।
ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি হটলাইন খুলছে। একই সঙ্গে ধর্ষণের মামলা তদারকের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সেল খোলা হচ্ছে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে সমসাময়িক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ কথা জানান। এসময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আইন উপদেষ্টা বলেন, রাস্তাঘাটে যে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি হয়, এ ব্যাপারে প্রতিকার নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত একটি আলাদা হটলাইন দেয়া হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি জানিয়ে দেয়া হবে। এটি হবে টোল ফ্রি। তিনি বলেন, হটলাইন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে। অভিযোগ জানানো যাবে। এটি তদারকি করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটা ডেডিকেটেড সেল থাকবে। আসিফ নজরুল আরও বলেন, একই সঙ্গে ধর্ষণের মামলাগুলো তদারক করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে একটি আলাদা সেল থাকবে। যেখানে মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে অযথা কালক্ষেপণ যেন না করা হয়, সেটি দেখা হবে।
দিনাজপুরের শিশু ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাইফুল ইসলামের জামিন আপিল বিভাগে বাতিল হয়েছে বলেও জানান আইন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অনেক সময় প্রত্যাশামাফিক আমরা কাজ করতে পারি না। সেটা নিয়ে যন্ত্রণা থাকে, আত্মদহন থাকে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে এখন যে নারীর প্রতি সহিংসতা হচ্ছে, নির্যাতন হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছে- এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। এই সরকারের পুরো প্রশাসন এসব মামলায় সুবিচার নিশ্চিত ও সব ধরনের যৌন হয়রানি বন্ধের সব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর।
প্রধান উপদেষ্টার দফতরে আজকের মিটিং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে হয়েছে জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, আমরা প্রত্যেকেই আপনাদের মতো ডিস্টার্ব। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের আরও অনেক কঠোর হতে হবে। এখান থেকে যে কোনো ধরনের মব জাস্টিসকে কঠোরভাবে দমন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, দেশে ধর্ষকদের কোনো স্থান হবে না। মাগুরায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে কাজ করবে সরকার। একইভাবে যদি দেশের কোথাও নারীর প্রতি কোনো সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে, তাদের সম্পূর্ণভাবে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
তিনি বলেন, ‘ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধর্ষণসহ সব ধরনের নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। এ যাবৎ নারীর প্রতি যত সহিংসতা হয়েছে সেগুলোর তালিকা করে দ্রুত তদন্ত সম্পন্নপূর্বক আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দিয়েছি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ নারীরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ঘরে-বাইরে দায়িত্ব পালন করবে। এতে যারা তাদের বাধা দিতে আসবে, সহিংসতা করতে আসবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না। ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ