* মাঠে প্রবেশে মানা, মিছিল-জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা * মাঠ খালি করার সিদ্ধান্ত * জুবায়েরের অনুসারীদের মহাসড়ক অবরোধ * মাঠে বিজিবি মোতায়েন * ইজতেমা ময়দান ছাড়লেন মুসল্লিরা * টঙ্গীর সংঘর্ষ ছড়ালো ঢাকা মেডিকেলেও
সংঘর্ষের ঘটনায় সচিবালয়ে সাদ ও জুবায়েরপন্থিদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সংঘর্ষে চার জনের মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম
গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান দখল নিয়ে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের, মাওলানা জুবায়ের এবং মাওলানা সাদের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। এ সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তুরাগ তীরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, সেনাসদস্য ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ইজতেমা মাঠ ঘিরে তিন কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল এবং দুই জনের বেশি জমায়েত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে পুলিশ।
সেই সঙ্গে ইজতেমা মাঠে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ।
সংঘর্ষের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম সচিবালয়ে সাদ ও জুবায়েরপন্থিদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সংঘর্ষে চার জনের মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের টঙ্গীর ইজতেমা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-টঙ্গী বিভাগ) এন এম নাসিরুদ্দিন বেলা দুইটার দিকে বলেন, এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছি।
অবশ্য বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মো. মামুনুল হক উল্লেখ করেছেন, নিহত হয়েছেন চারজন। তিনি বলেছেন, এটা সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনা নয়। সাদপন্থীরা হামলা করে চারজনকে হত্যা করেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিনিধি জানান, টঙ্গীর ঘটনায় বেলাল হোসেন নামে ৫৫ বছর বয়সী একজন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, টঙ্গীতে সংঘর্ষের মধ্যে আহত বেলালকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ভোর সাড়ে ৫টায় ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এছাড়া আহত অবস্থায় ১১ জনকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-টঙ্গী বিভাগ) এন এম নাসিরুদ্দিন বেলা ২টার দিকে বলেন, এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছি। তবে তিনজনের মধ্যে শুধু একজনের লাশ টঙ্গী হাসপাতালে পাওয়া গেছে। তার নাম আমিরুল ইসলাম বাচ্চু।
নিহত বিল্লালের ছেলে আবদুল্লাহ আল জুবায়ের বলেন, তার বাবা তাবলিগ জামাতের মূল ধারার, তিনি কোনো গ্রুপের নন। টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মারামারিতে তার বাবা আহত হন। পরে ভোরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত বিল্লাল ফরিদপুর সদর কুঠিবাড়ি কমলাপুরের আবদুস সামাদ শেখের ছেলে। তিনি বাড্ডা বেরাইতে নিজ বাড়িতে থাকতেন তিনি। পেশায় তিনি তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ছিলেন।
টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. আমিরুল ইসলাম বাচ্চু (৭০) নামের এক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জে।
সংঘর্ষে তাইজুল ইসলাম নামের আরেক মুসল্লি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মাওলানা সাদের অনুসারীদের গণমাধ্যম সমন্বয়ক মো. সায়েম। তিনি বলেন, তাইজুলের বাড়ি বগুড়ায়।
নিহত অপর জনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আহতদের মধ্যে অন্তত ৩০ জনেরও বেশি রয়েছেন, যারা স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি হাবিব ইস্কান্দার বলেন, মঙ্গলবার ইজতেমা ময়দানে অবস্থান করছিলেন মাওলানা জুবায়ের আহমদের অনুসারিরা। পরে মাওলানা সাদ কান্ধলভির অনুসারিরা তুরাগ নদীর পশ্চিম তীর থেকে কামারপাড়া ব্রিজসহ বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে থাকেন।
এ সময় মাঠের ভেতর থেকে জুবায়ের অনুসারীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। জবাবে সাদের অনুসারীরাও পাল্টা হামলা চালায়।
একপর্যায়ে সাদপন্থীরা মাঠে প্রবেশ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ, সেনাসদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
পরে সংঘর্ষে হতাহতদের টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়।
ওসি আরও বলেন, এখন পরিস্থিতি শান্ত আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে।
তাবলীগ জামাতের সাদপন্থী মুরুব্বী সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম বলেন, ২০ ডিসেম্বর টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে আমাদের জোড় ইজতেমা শুরুর হওয়ার কথা ছিল। মাঠ প্রস্তুতির জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ মাঠের আশেপাশে রাস্তার পাশে এসে অবস্থান নিচ্ছিলেন।
আমাদের এ প্রস্তুতি দেখে জোবায়ের পন্থীরা বাইরে থেকে গাড়ি ভরে গিয়ে আমাদের লোকজনের উপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং আমাদের লোকজন ইজতেমা ময়দানে ঢুকে পড়ে। পরে সেখানে দুই গ্রুপের মধ্যে আবার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল করিম খান জানান, সংঘর্ষের পর এলাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি শান্ত করতে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) মোতায়েন করা হয়।
বিজিবির সদর দফতর থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হওয়ার পর টঙ্গীতে চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতি প্লাটুনে গড়ে ৩০ জন বিজিবি সদস্য রয়েছেন।
এছাড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টঙ্গী ইজতেমা ময়দান এবং তার আশেপাশের তিন কিলোমিটার এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। বিজিবি মোতায়েনের পর, চারপাশে তীব্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরন্তর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
গাজীপুরের টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান দখল নিয়ে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার বিচার ও ময়দান বুঝিয়ে দেয়ার দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরা।
সকাল ১০টার দিকে জেলার শ্রীপুর উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মুলাইদের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় তারা এ অবরোধ শুরু করেন বলে জানিয়েছেন শ্রীপুর থানার ওসি খন্দকার জয়নাল আবেদীন মন্ডল।
অবরোধে যান চলাচল বন্ধ থাকায় মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের তৈরি হয়।
অবরোধে থাকা মাওলানা ইকরামুজ্জামান বাতেন বলেন, রাতে তাহাজ্জুত নামাজের সময় আমাদের সাথীদের শহিদ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে শ্রীপুরের আলেম সমাজ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে। মুরুব্বিদের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমাদের বিক্ষোভ চলবে।
বিক্ষোভরত মুরুব্বিরা বলেন, রাতে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে থাকা জুবায়েরের অনুসারীদের মারধর করে বিতাড়িত করা হয়েছে। এ সময় পবিত্র ইজতেমা ময়দান রক্তাক্ত করা হয়েছে।
যতক্ষণ না পর্যন্ত মাওলানা সাদের অনুসারীদের কাছ থেকে মাঠ উদ্ধার করে জুবায়েরের অনুসারীদের বুঝিয়ে দেয়া হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার ওসি খন্দকার জয়নাল আবেদীন মন্ডল বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে আছি। তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে।
এদিকে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার প্রেক্ষাপটে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠ খালি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর উপস্থিতিতে তাবলিগের সাদপন্থিদের এক বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
পরে একই জায়গায় তাবলিগের জুবায়েরপন্থিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। আইজিপি বাহারুল আলমসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও বৈঠকে উপস্থিত আছেন।
প্রথম দফার বৈঠকের পর সাদপন্থিদের প্রতিনিধি রেজা আরিফ উপদেষ্টার উপস্থিতিতেই বলেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অনুরোধে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হতাহতের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। আমরা মাঠ ছেড়ে দিচ্ছি।
তিনি বলেন, অতীতে আমরা সরকারের সমস্ত কথা রেখেছি, সরকারের এই কথাটুকুও আমরা রাখছি। আমরা এরই মধ্যে সেখানে উপস্থিত সাথীদের বলে দিয়েছি মাঠ ছেড়ে দেয়ার জন্য। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের সহযোগিতা করছে।
এখন এখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সরকার মাঠের দায়িত্ব নেবেন, কেউ এখন মাঠে থাকবে না।
তাবলিগের জুবায়েরপন্থিদের উদ্দেশে রেজা আরিফ বলেন, উনাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সরকারি সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিয়েছি, উনারাও যেন ইসলামের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে কোনো রকম সমস্যার চেষ্টা না করেন। উনারা যেন রাস্তায় নেমে না আসেন, উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার না করেন।
সাদপন্থিদের মুরুব্বি আরিফ রেজা বলেন, যারা আহত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন, তারা কোন পক্ষের কে ছিলেন না ছিলেন তার চেয়ে এই মুহূর্তে অনেক বেশি জরুরি যারা মারা গেছেন, আল্লাহ তাদের মাফ করে দিন। অনেক বেশি জরুরি সবাই যেন সহজে বেরিয়ে যায়, কোনো প্রবলেম যেন না তৈরি হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার মুসলমান হিসেবে দেশের নাগরিক হিসেবে দুঃখ প্রকাশ করছি। যা হয়েছে এটা অনুচিত হয়েছে। মুসলমান মুসলমান মারামারি, তবলীগের সাথীরা মারামারি এটা অবশ্যই উচিত হয়নি। ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ড যেন না হয়, সে চেষ্টা আমাদের থাকবে।
জতেমা মাঠে হামলা ও সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
এ ঘটনায় মামলা হবে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, মামলার পর জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষ মাওলানা জুবায়েরপন্থী ও সাদপন্থীদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমি প্রথমেই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমাদের যে চারজন ভাই গতরাতে শহীদ হয়েছেন, আল্লাহ যেন তাদের বেহেশত নসিব করেন। আর যারা আহত হয়েছেন, তারা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাদের সুকিচিৎসার জন্য যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে হয় আমরা অবশ্যই নেব।
এদিকে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার প্রেক্ষাপটে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠ ঘিরে তিন কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল এবং দুই জনের বেশি জমায়েত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে পুলিশ।
সেই সঙ্গে ইজতেমা মাঠে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ।
গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার নাজমুল করিম খান স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলা হয়, দুপুর ২টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
এছাড়া ওই এলাকায় কোনো ধরনের অস্ত্র, ছুরি, লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য বা এ জাতীয় কোনো পদার্থ বহন করা যাবে না এবং লাউড স্পিকার বা এ জাতীয় কোনো যন্ত্র দ্বারা উচ্চস্বরে কোনো শব্দ করা যাবে না।
নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করা হয়েছে গণবিজ্ঞপ্তিতে।
এটিকে টঙ্গীর লাগোয়া ঢাকা মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকাকেও একই ধরনের বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।
গণবিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ বলেছে, বুধবার দুপুর ২টা থেকে কামারপাড়া, আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা সেক্টর-১০ এবং তৎসংলগ্ন তুরাগ নদীর দক্ষিণ পশ্চিম এলাকায় যে কোনো প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকবে।
এই ঘোষণার পর ইজতেমা ময়দান ছাড়তে শুরু করেন মুসল্লিরা। তাদের শামিয়ানা কাঁধে নিয়ে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পিকআপে করে কিংবা পায়ে হেঁটে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে দেখা গেছে।
এদিকে টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান দখলকে কেন্দ্র করে মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদের অনুসারিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে।
সাদপন্থীদের দাবি, কামারপাড়া থেকে স্লুইচ গেইট পর্যন্ত সড়কে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় রাত সাড়ে তিনটার দিকে জোবায়েরপন্থিরা তাদের দিকে ‘ইট পাটকেল, জলন্ত মশাল’ নিয়ে হামলা করে।
অন্যদিকে জুবায়েরপন্থিরা দাবি করছেন, ইজতেমার মাঠে অবস্থানকালে রাত সাড়ে তিনটায় ‘ছুরি, ক্ষুর, হাতুড়ি, ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালান সাদপন্থিরা।
টঙ্গীর সংঘর্ষ ঢাকা মেডিকেলেও ছড়িয়ে পড়ে। মাওলানা সাদ ও জুবায়েরপন্থিদের মধ্যে সংঘর্ষে আহতদের অনেককেই চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। পরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণেও সংঘর্ষে জড়ায় এই দুই পক্ষ। এ অবস্থায় হাসপাতালে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেনাবাহিনী, র?্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
জানা গেছে, টঙ্গী থেকে আহতদের ঢাকা মেডিকেলে আনা হলে তাদের মধ্যে বেলাল হোসেন (৫৫) নামে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আহতদের মধ্যে একজন জরুরি বিভাগের ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড ক্যাজুয়াল্টিতে (ওসেক) লাইফ সাপোর্টে আছেন। হতাহতরা কোন পক্ষের, তা নির্ধারণে সকাল থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হাসপাতালের ভেতরেই কয়েক দফায় সংঘর্ষে জড়ান তাবলিগের এ দুই পক্ষের সমর্থকরা। পরে হাসপাতালে সেনাবাহিনী, র?্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, টঙ্গী এলাকা থেকে দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় হাসপাতালে এখন পর্যন্ত আহত ৪০ জন এসেছেন। এদের মধ্যে বেলাল হোসেন নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। একজন জরুরি বিভাগের ওসেকে লাইফ সাপোর্টে আছেন। সংঘর্ষের পর অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে হাসপাতালে সেনাবাহিনী, র?্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলেও জানান ঢামেক পুলিশ কর্মকর্তা।
তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষ দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভি এবং বাংলাদেশের কাকরাইল মারকাজের মাওলানা জুবায়ের আহমদের অনুসারীদের বিরোধের শুরু ২০১৯ সালে।
আগে এক মঞ্চ থেকে একবারই বিশ্ব ইজতেমা হলেও মতভেদের কারণে দুই পক্ষ বিশ্ব ইজতেমা দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাঝে কোভিড মহামারীর কারণে ইজতেমা দুই বছর বন্ধ থাকে। ২০২২ সাল থেকে ফের ইজতেমা হচ্ছে দুই পর্বের আয়োজনে।
সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে এবারও টঙ্গীর তুরাগ তীরে দুই পর্বে হবে তাবলীগ জামাতের সবচেয়ে বড় জমায়েত বিশ্ব ইজতেমা।
আগামী বছর প্রথম পর্বে ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ইজতেমায় অংশ নিবেন ‘জুবায়েরপন্থিরা’ এবং দ্বিতীয় পর্বে ৭ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি অংশ নিবেন ‘সাদপন্থিরা’।
গত ১৭ নভেম্বর এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রথম পর্বের আয়োজকরা তাদের আয়োজন শেষে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত বিশ্ব ইজতেমার মাঠ প্রস্তুতি সংক্রান্ত কমিটিকে ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার মধ্যে ইজতেমার মাঠ বুঝিয়ে দেবেন।
দ্বিতীয় পর্বের আয়োজনকারীরা একই দিন বিকালে কমিটির কাছ থেকে ইজতেমার মাঠ বুঝে নেবেন। দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা শেষে ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তারা কমিটির কাছে মাঠ হস্তান্তর করবেন।
তবে সম্প্রতি তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের জেরে তাদের মধ্যে চলমান বিবাদ নতুন রূপ পায়।
গত ৫ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘ওলামা-মাশায়েখদের ইসলামি মহাসম্মেলন’ থেকে সাদপন্থিদের নিষিদ্ধ করাসহ ৯ দফা দাবি জানান জুবায়েরপন্থিরা, যারা নিজেদের ‘শুরায়ে নিজাম’ পরিচয় দিয়ে থাকেন।
এরপর ১২ নভেম্বর কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মাঠে সাদপন্থিদের প্রবেশের সুযোগ দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা অচলের হুঁশিয়ারি দেন জুবায়েরপন্থিরা।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই দুই পক্ষের ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ গত ১৫ নভেম্বর ঢাকার কাকরাইল মসজিদে সাদপন্থিদের ব্যাপক জমায়েত দেখা যায়।
‘চার সপ্তাহ থাকবেন জুবায়েরপন্থিরা আর দুই সপ্তাহ থাকবেন সাদপন্থিরা’ এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন কাকরাইল মসজিদে দুই সপ্তাহের অবস্থান শুরু করেন সাদপন্থিরা।
এর মধ্যে গত ২৯ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে ৫ দিনের জোড় ইজতেমা পালন করেন কাকরাইল মারকাজের মাওলানা জুবায়ের অনুসারীরা।
এরপর ইজতেমা মাঠে ২০ ডিসেম্বর থেকে ৫ দিনের জোড় ইজতেমা পালনের ঘোষণা দেন দিল্লির মাওলানা সাদের অনুসারীরা।
তবে সাদের অনুসারীদের জোড় ইজতেমা করতে না দেওয়ার দাবিতে ১৩ ডিসেম্বর টঙ্গী-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিল মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরা।
সমাবেশের পর দাবি আদায়ে গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার বরাবর স্মারকলিপিও দেন বিক্ষোভকারীরা।
সাদ অনুসারীদের ইজতেমা মাঠে জোড় পালন করতে সরকার থেকেও অনুমতি নেই এমন দাবি করে ইজতেমা মাঠ না ছাড়ার ঘোষণা দেন তারা।
পরে ২০২৫ সালের বিশ্ব ইজতেমা সফল এবং ২০ ডিসেম্বর থেকে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমায় মাওলানা সাদের উপস্থিতির দাবি জানায় তার অনুসারীরা। তারা রোববার সকালে টঙ্গী কামারপাড়া রোড এলাকায় সমাবেশ করে জোড় ইজতেমার অনুমতি এবং ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে আনতে সরকারের প্রতি সময় বেঁধে দেন। তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
পরে বিকেল ৩টার দিকে টঙ্গী কামারপাড়া রোড এলাকায় তাবলিগের শুরায়ি নেজামের আহ্বানে উলামা মাশায়েখ ও তৌহিদী জনতার ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সেখানে মূলত মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেই সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ইজতেমা নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখশ চৌধুরী ও জিএমপির কমিশনার নাজমুল করিম খান আওয়ামী লীগের দোসর। তাদের অপসারণ করতে হবে।
সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে আমরা ইজতেমা ময়দানে আছি। যে কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দায় ওই দুইজনকে নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এর আগে ২০১৮ সালেও টঙ্গীতে জোড় ইজতেমাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন দুই শতাধিক।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ইজতেমা মাঠ দখল নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ৪
- আপলোড সময় : ১৮-১২-২০২৪ ০৯:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৮-১২-২০২৪ ১১:৫৮:০৫ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ