ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

ঝরেপড়া শিক্ষার্থী বাড়ছে

  • আপলোড সময় : ১৭-১২-২০২৪ ১০:০৪:৪৮ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৭-১২-২০২৪ ১০:০৪:৪৮ অপরাহ্ন
ঝরেপড়া শিক্ষার্থী বাড়ছে
প্রতি বছরই আমাদের দেশে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করতেই ঝরে পড়ার সংখ্যা শুরু হয়। সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ে অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে যারা পাস করতে ব্যর্থ হন তাদের নামও রয়েছে ঝরে পড়ার তালিকায়। আবার অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগের অভাবে ঝরে পড়ছে। তবে প্রশ্ন হলো-কেন এত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে? এর প্রধান কারণ দরিদ্রতা। এছাড়া কারণ হিসেবে রয়েছে অভিভাবকের অসচেতনতা, মেয়েশিশুর প্রতি অবহেলা, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। বিশেষ করে, আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারই দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করে। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সন্তান একটু বড় হয়ে উঠলেই তাকে উপার্জনে পাঠান অভিভাবকরা। ফলে অনেকেই পড়ালেখা না করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে একরকম বাধ্য হয়েই। এ কারণেই কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আবার যারা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হতে পারেননি তারা অনেক সময় পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে এদের বড় একটি অংশ চলে যায় কর্মসংস্থানে। অনেকে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশেও যায়। এটা প্রায় প্রতি বছরই নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে শঙ্কার খবর হলো, এর সংখ্যাটা দিন দিন শুধুই বাড়ছে। অথচ দেশের সার্বিক অগ্রগতির পথে এটা একটি বড় বাধা।
জানা যায়, অষ্টম শ্রেণির গণ্ডি শেষ করে ২০২২ সালে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ২২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৩ শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এসএসসি) বসার কথা ছিল তাদের। কিন্তু চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বসছে ১৭ লাখ ১০ হাজার ২৯৬ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ মাধ্যমিক পর্যায়ে গত ২ বছরে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩৭ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, যা মোট শিক্ষার্থীর ২৩.৮০ শতাংশ। দুই বছরে বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ‘উদ্বেগজনক’ বলছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শতভাগ নিশ্চিত করা গেলেও মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। এ জায়গায় সরকারকে আরো বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
যদিও শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা ও ধরে রাখার জন্য সরকার প্রতি বছর উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই, খাবার দেওয়াসহ অন্যান্য খাতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এরপরও বিভিন্ন পর্যায়ে এত অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে-এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হবে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ২৯ হাজার ৭৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। তাদের মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১৭ লাখ ১০ হাজার ২৯৬ জন। অনিয়মিত পরীক্ষার্থী তিন লাখ ১১ হাজার ৫১৩ জন। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২১ সালে জেএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে নবম শ্রেণিতে (২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ) রেজিস্ট্রেশন করেছিল ২২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৩ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এবার এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে ১৭ লাখ ১০ হাজার ২৯৬ জন। অর্থাৎ, নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেও এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেনি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩৭ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ছাত্রী ৮ লাখ ৯১ হাজার ৭২১ জন এবং ছাত্র ৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৫ জন। অর্থাৎ, তারা শিক্ষার মূল স্রোত থেকে হারিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেছেন, এবার ঝরে পড়ার হার একটু বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ, ব্যাচটি করোনা-পরবর্তী ব্যাচ। যারা কম বিষয় বা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়। এবার যেহেতু পূর্ণ সিলেবাস এবং সব বিষয়ে পরীক্ষা হচ্ছে তাই তারা হয়তো কুলিয়ে উঠতে পারেনি। তার সঙ্গে বাল্যবিয়ে, কর্মজীবনে প্রবেশসহ অন্যান্য কারণ তো রয়েছে। শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ঝরে পড়ার প্রকৃত তথ্য নিরূপণ করা জরুরি। সেজন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ‘অতিমাত্রার শিক্ষাব্যয়’কে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, সমাজের অতিদরিদ্র ব্যক্তিটিও চান তার সন্তান লেখাপড়া করুক। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে দেশে যে ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, নোট-গাইড আর প্রাইভেট-কোচিংয়ের যে দৌরাত্ম্য চলছে, কম আয়ের পরিবারগুলো এ ধাক্কা সামলাতে পারছে না বলেই ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে।
জানা গেছে, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ১১ লাখ ৭৪ হাজার ১৭ মেয়ে। এসএসসির পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছে ৮ লাখ ৯১ হাজার ৭২১ জন। অর্থাৎ, ঝরে পড়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ২৯৬ জন। অন্যদিকে, নবম শ্রেণিতে ছেলেরা রেজিস্ট্রেশন করেছিল ১০ লাখ ৭০ হাজার ৭১৬ জন। তাদের মধ্যে এসএসসিতে ফরম পূরণ করেছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৫ জন। ঝরে পড়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ১৪১ জন। ছেলেদের তুলনায় মেয়ে ৩০ হাজার ১৫৫ জন বেশি ঝরে পড়েছে। শিক্ষাবিদরা বলেছেন, এ স্তরের মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে। এছাড়া, শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অনেকে ঝরে পড়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সংখ্যাগত হিসাবে ঝরে পড়ার হারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সবচেয়ে এগিয়ে। ২০২২ সালে এ বোর্ডে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬২৬ জন নিবন্ধন করলেও পরীক্ষা দিচ্ছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৯২০ জন। ঝরে পড়েছে ১ লাখ ৭০৬ জন। এভাবে রাজশাহী বোর্ডে ঝরে পড়েছে ৩৫ হাজার ২৯১ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ৫৪ হাজার আটজন, যশোর বোর্ডে ৪৪ হাজার ৫২২ জন, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৩৫ হাজার ১৩৭ জন, বরিশাল বোর্ডে ১০ হাজার ১২৫ জন, সিলেট বোর্ডে ২৭ হাজার ২০১ জন, দিনাজপুর বোর্ডে ২৭ হাজার ৪৯২ জন, ময়মনসিংহ বোর্ডে ১৬ হাজার ৫৭৩ জন ঝরে পড়েছে। মাদ্রাসা বোর্ডে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৪০৮ জন নিবন্ধন করলেও পরীক্ষা দিচ্ছে ২ লাখ ৩২ হাজার ২৪৯ জন। টেকনিক্যাল বোর্ডে ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৭৯ জন নিবন্ধন করলেও পরীক্ষা দিচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫৬ জন। শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া বিষয়ে কেউ কেউ বলছেন, উন্নয়ন মানে দেশের গুটিকয় মানুষের উন্নয়ন নয়। গুটিকয় মানুষের উন্নয়নের সঙ্গে গড় উন্নয়ন বিবেচনা করে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। উন্নত রাষ্ট্রের জন্য আমাদের গণ-উন্নয়ন চাই। সরকারকে গণ-উন্নয়নমুখী হতে হবে। তারা এও বলেন, বর্তমানে সরকার বড় বড় মেগা প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। উন্নয়নের ফিরিস্তি শুনছি নিত্যদিন। নিম্নবিত্ত কিংবা বিত্তহীনদের দিকে সরকারের যে মনোযোগ একেবারেই নেই তা নয়। কিন্তু সেটি অপ্রতুল। সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ে সরকার যে বরাদ্দ দেয়, তা সামান্য। সেটি সরকার চাইলে বাড়াতে পারে। কিন্তু যে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে, তাদের বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ একেবারেই চোখে পড়ছে না।
ঝরে পড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, দিনদিন যেভাবে সংসার খরচ বাড়ছে, সেখানে সংসার পরিচালনা করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারমধ্যে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারছিলাম না, এজন্য তাদের স্কুলে না পাঠিয়ে বিভিন্ন কাজে লাগাচ্ছি। যাতে সংসার পরিচালনা একটু সহজ হয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, এমনিতেই আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার মধ্যে শিক্ষা ব্যয় দিনদিন বাড়ছেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঝরে পড়া এক শিক্ষার্থী বলেন, খুব ইচ্ছা ছিল পড়াশুনা করে ভাল চাকরি করব। কিন্তু পরিবারের অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করতে হচ্ছে। শুধু আমি নই, আমরা অনেক বন্ধুই পড়াশোনা বাদ দিয়ে এখন কাজ করছি।
শিক্ষাবিদরা বলেছেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী রোধে সরকারকে আরো বেশি উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেহেতু এটা একটি বড় ধরনের সমস্যা। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ নিজ সন্তানকে যদি গড়ে তোলার দায়িত্ব তারা বোধ না করে, তবে শত চেষ্টাতেও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই সরকারের উচিত এ বিষয়ে অভিভাবকদের অনুপ্রাণিত করা। যাতে তাদের সন্তানরা স্কুলমুখী হয়। এছাড়া যথাযথ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচার-প্রচারণা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স