ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
‘একটি সড়ক দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’ শুধুই বিজ্ঞাপন আর স্লোগান

সড়কে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল

  • আপলোড সময় : ০৩-১২-২০২৪ ১০:২৮:৪০ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৩-১২-২০২৪ ১০:২৮:৪০ অপরাহ্ন
সড়কে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল
* ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় বিলীন দেড় শতাধিক পরিবার * ১২৩ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৪৬ স্বামী-স্ত্রী নিহত

‘একটি সড়ক দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’ বিজ্ঞাপন আর সেøাগানেই থেকে গেল। যখন সড়ক-মহাসড়কে কেউ আহত কিংবা নিহত হয়, সেই বুঝে এর ষন্ত্রণা কতটা ভয়ঙ্কর। তবে এ কান্নার যন্ত্রণা দুর্ঘটনা ঘটার আগে কেউ বুঝে না। দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে বেঁচে থাকার শেষ দিন পর্যন্ত বইতে হয় সেই কান্নার ভার। আর যিনি অকালে প্রাণ হারান, সেখানে ভুগতে হয় তার পরিবারকে। দিনের পর দিন নানা কারণে সড়ক দুর্ঘটনা, আহত ও নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। এমনই পরিস্থিতিতে প্রতি বছরই সারাদেশের পলিত হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রতিনিয়ত সড়কে ঝরছে শত শত তাজা প্রাণ। সেই পরিবারগুলো শুধু অসহায়ত্ব নিয়ে বাকী জীবন পাড় করছে।
সরকারের সদিচ্ছায় নির্ভর করছে সড়কের নিরাপত্তা : নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছার ওপর। আমরা সব সময় সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছি। এটি একটি জাতীয় ইস্যু। মানুষ সড়কে জীবন দিচ্ছে। এই ইস্যুতে সব দলকে এক হতে হবে যা অতীতে কখনো হয়নি। মঙ্গলবার নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা সড়ক নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গত সাড়ে তিন মাসে সড়ক নিরাপত্তায় কোনো কাজ হচ্ছে না। যেভাবে করা দরকার সেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ হচ্ছে না। অন্তর থেকে কাজ করতে হবে। আজকে যিনি সড়ক উপদেষ্টা রয়েছেন, তিনি এ সেক্টরে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি বলেন, আমাকে সব সময় একটি ট্যাগ দেয়া হয়েছে। আমি বিএনপির কাছে গেলে বিএনপির ট্যাগ, জামায়াতের কাছে গেলে জামায়াতের ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হতো অতীতে। ৩২ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছি। কিন্তু সড়কে বিশৃঙ্খলা থেকে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। ১১ বছরে সড়কে ঝরেছে লাখের বেশি প্রাণ : দেশের সড়কের অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক, কমছে না দুর্ঘটনা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে সড়কে দুর্ঘটনা ও বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। গেল ১১ বছরে ৬০ হাজার ৯৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে লাখের বেশি মানুষের, যাদের মধ্যে পথচারী ১৭ হাজার ১৫০ জন। মঙ্গলবার নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আলোচকরা এসব ঘটনাকে দুর্ঘটনা না বলে, হত্যাকাণ্ড আখ্যা দেন। সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সুপারিশ করেন, শুধু আইন নয়, দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগও। নিরাপদ সড়কের জন্য একটি কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব দেন তারা।
সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণকারিরা যা বললেন : সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করেন লিমন মিয়া নামে একজন চাকরি জীবি। এরপর কর্মক্ষমতা হারিয়ে চিকিৎসা করাতেই যেন দম ফুরিয়েছে তার। দুর্ঘটনা-পরবর্তী মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, পঙ্গুত্বের ভার আসলে কেউই নিতে চায় না। যে কর্মস্থলে চাকরি করতাম, দুর্ঘটনার পরপরই সেখান থেকে বেতন দেয়া বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসা করাতে হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবারকে। সবমিলিয়ে এখন মনে হয়, পঙ্গুত্ব আমার জীবনে বিশাল অভিশাপ হয়ে এসেছে। সংসারের হাল ধরতে ইন্টারের (এইচএসসি) পর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এখন নিজেই পরিবারের বোঝা হয়ে গেছি। শুধু লিমন নন, প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা বিভিন্ন কারণে দেশে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন শত শত মানুষ। বেঁচে থাকলেও তাদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের কালিতলা এলাকায় পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে ঠাকুরগাঁওয়ে ট্রাক চাপায় অটোরিকশা যাত্রী ফারহানা সরকার নামে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। আহত একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহত শিক্ষার্থী ফারহানা সরকার সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নের কালিতলা গ্রামের ফরহাদ হোসেনের মেয়ে। সে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
এদিকে, গত ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরবাইক, অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস এবং অ্যাম্বুলেন্স আরোহী হিসেবে একসাথে পুরো পরিবার বা এক পরিবারের অধিক সদস্য নিহতের প্রবণতা বাড়ছে। এসময় দেড় শতাধিক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোটরবাইক আরোহী ও অটোরিকশা যাত্রী হিসেবে স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের ২ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার একটি পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোটরবাইক আরোহী হিসেবে স্বামী-স্ত্রী নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১২৩টি এবং পিতা-পুত্র নিহতের ঘটনা ঘটেছে ৮৪টি। অর্থাৎ ১২৩টি বাইক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী নিহত হয়েছেন ২৪৬ জন এবং ৮৪টি দুর্ঘটনায় পিতা-পুত্র নিহত হয়েছেন ১৬৮ জন। অটোরিকশা যাত্রী হিসেবে স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের ২ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১৩৭টি। ৩ জন নিহতের ঘটনা ৭৮টি, ৪ জন নিহতের ঘটনা ৬২টি, ৫ জন নিহতের ঘটনা ৩৮টি, ৬ জন নিহতের ঘটনা ২৬টি এবং ৭ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১১টি। মোট ৩৫২টি পরিবারের ১১৭৯ জন নিহত হয়েছে। মাইক্রোবাসের আরোহী হিসেবে একই পরিবারের ২ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি, ৩ জন নিহতের ঘটনা ২২টি, ৪ জন নিহতের ঘটনা ১৭টি, ৫ জন নিহতের ঘটনা ১১টি, ৬ জন নিহতের ঘটনা ৮টি এবং ১১ জন নিহতের ঘটনা ১টি। মোট ৭৫টি পরিবারের ২৮০ জন নিহত। প্রাইভেটকার আরোহী হিসেবে একই পরিবারের ২ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ২৪টি। ৩ জন নিহতের ঘটনা ২১ টি, ৪ জন নিহতের ঘটনা ১৭ টি, ৫ জন নিহতের ঘটনা ১৪ টি। মোট ৭৬টি পরিবারের ২৪৯ জন নিহত। অ্যাম্বুলেন্স আরোহী হিসেবে ৩ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ৯টি, ৪ জন নিহতের ঘটনা ৫টি, ৫ জন নিহতের ঘটনা ৩টি, ৮ জন নিহতের ঘটনা ১টি। মোট ১৮টি পরিবারের ৭০ জন নিহত।
দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করে লবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, সড়ক অবকাঠামো বিস্তৃত হওয়ায় পরিবারের সকলে একসাথে বেড়াতে বা কোনো কাজে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল, অধিকাংশ মাইক্রোবাস এবং অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকায় দুর্ঘটনা বেড়েছে। ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়া মোটরযান চলাচল করাতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের চলাচল নজরদারি বাড়ানো দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশে সড়কে যেটা হয়, তা দুর্ঘটনা না, এটা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। গত দুই মাসে বর্তমান সরকারও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে পারেনি। পরিবহন খাতের সিন্ডিকেট ভাঙেনি, বরং হাতবদল হয়েছে। একইসুরে কথা বলেছেন এবি পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, প্রতিদিন মৃত্যুর শঙ্কা নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয়। এখনো লাফিয়ে লাফিয়ে বাসে উঠতে হয়। সড়কে শৃঙ্খলা আনা কি খুব কঠিন কাজ? সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিবহনশ্রমিকদের মাসিক বেতনকাঠামোর আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া আমলাদের কারণেও সড়কে শৃঙ্খলা নেই। সড়কে গণহত্যার দায়ে আমলাদেরও দায়বদ্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার থাকলেও সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে রোড সেইফটি ইউনিট গঠিত হলেও মূলত তারা টিভি মিডিয়ায় কথা বলা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তাদের কোনো গবেষণা কার্যক্রম নেই।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স