* স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নিলেই আন্দোলনের ইতি টানা হবে
* সাত কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থী ছাড়াও সড়কে নেমেছে ৩৫ প্রত্যাশীরা
* সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে ‘মুক্তি’ এবং স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ৪ ঘণ্টা ধরে অবরোধ করেছে সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। বন্ধ হয়ে যায় মিরপুর সড়কের যানচলাচল। সড়ক বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা কলেজে থেকে মিছিল নিয়ে সায়েন্সল্যাব মোড়ে এসে অবস্থান নেয়। এর আগে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে মিছিল করে তারা। শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের ফলে ওই এলাকায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। সড়কে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা ‘অধিভুক্তি নাকি মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি’, ‘শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, মানি না, মানব না’, ‘আর নয় দাসত্ব, হতে চাই স্বতন্ত্র’, ‘ঢাবির জায়গায় ঢাবি থাক, সাত কলেজ মুক্তি পাক’, ‘নিপীড়ন নাকি অধিকার, অধিকার, অধিকার’, ‘প্রশাসনের প্রহসন, মানি না মানব না’ স্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা বলেছে, সাত কলেজকে নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নিলে তবে এই আন্দোলনের ইতি টানা হবে। ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন মৌ বলেন, আমরা আমাদের সমস্যার সমাধান চেয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা থেকে শুরু করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে গেছি। তারা এ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেননি। তারা কমিটি বাতিল করে কোন সংস্কার কমিশন গঠন করেননি। আমরা রাজপথে আছি রাজপথ থেকেই সমাধান নিয়ে পড়ার টেবিলে ফিরতে চাই। আন্দোলনের অন্যতম প্রতিনিধি আব্দুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যত টাকা সাত কলেজ থেকে উপার্জন করে তার চেয়ে অনেক কম বিনিয়োগ তারা সাত কলেজের জন্যে করে। এই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের কাজে তাদের ‘ভোগান্তির শেষ থাকে না’। ‘এফিলিয়েটেড’ শব্দটি আগে সার্টিফিকেটে ছিল না, এখন জুড়ে দেয়া হয়েছে। এমন ৩৭টি সমস্যা আমরা চিহ্নিত করেছি। এসব সমস্যার সমাধান করতে আমরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় চাই। এই আন্দোলনে ঘিরে জনদুর্ভোগ নিয়ে রহমান বলেন, আমরা চাই না মানুষের কষ্ট হোক। আমাদের দাবি দ্রুত মেনে নিলে আমরা আর জীবনেও এভাবে রাস্তা অবরোধ করব না।
সাত কলেজের শিক্ষার্থী ছাড়াও গতকাল বুধবার বেলা ১২টা থেকে বিক্ষোভ করছে ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নেয়ামুল হক ও উপাধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমানের পদত্যাগ এবং আগের অধ্যক্ষ অধ্যাপক বেদর উদ্দিনকে পদে ফিরিয়ে আনার দাবিতে কলেজের মূল ফটকে বিক্ষোভ করেছেন। এর ফলে ধানমন্ডি সাত মসজিদ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেবেন না এবং ক্লাসেও ফিরবেন না তারা। তবে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও বলেছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থাকবেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে শহরজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর রোড, এলিফ্যান্ট রোড সংলগ্ন সব রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। সাত কলেজ এবং সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও সড়কে নেমেছেন ৩৫ প্রত্যাশীরা। তারা সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেয়া কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে সেই এলাকাতেও যানজট। শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে স্থবির যান চলাচলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পথচারীরা। শরিফুল ইসলাম নামের একজন পথচারী বলেন, আমরা কী দোষ করেছি। প্রতিদিন সড়ক অবরোধ করে জনভোগান্তি সৃষ্টি করে অথচ সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয় না। এই সরকার তো শিক্ষার্থীদের সরকার তাহলে কেন শিক্ষার্থীরা বারবার সড়কে নামছে। আমাদের দোষ হচ্ছে আমরা এই দেশের নাগরিক। কিছু হলেই আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হবে। আমাদের আগেও দুর্ভোগ ছিল, এখনও আছে। সুলতানা বেগম নামের একজন পথচারী বলেন, আমার মেয়ের পরীক্ষা আছে। তাড়াতাড়ি পরীক্ষার হলে যেতে হবে নয়তো পরীক্ষার হলে ঢুকতে পারবে না। তাই রিকশা থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছু থেকে কিছু হলেই সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের যে অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা বন্ধ করতে হবে। আগে দাবি দাওয়া ছিল প্রেসক্লাব কেন্দ্রিক। সেখানে সবাই তাদের দাবি আদায়ের জন্য প্লে কার্ড বা ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়াতেন। এখন সবাই সড়ক অবরোধ করে। এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থেকে যাবে। সায়েন্সল্যাব এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চালক সাব্বির হোসেন বলেন, সকাল সকাল হোন্ডাটা নিয়ে বের হয়েই একটা যাত্রী পেয়েছি। কিন্তু সায়েন্সল্যাব এসেই আটকে গেছি। সড়ক অবরোধের কারণে যাত্রী অতিষ্ঠ হয়ে নেমে চলে গেছে। আমি তিন ঘণ্টা ধরে এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। শিক্ষার্থীদের অনেক রিকোয়েস্ট করার পরেও তারা আমার হোন্ডাটা যেতে দেয়নি। দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ এখনও এক টাকাও ইনকাম করতে পারিনি, দুঃখের কথা আর কাকে বলবো।
সাত কলেজের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক সমস্যা নিরসনে গত ২৪ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিকে সুপারিশ দিতে ৬ সপ্তাহ সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এই কমিটি বাতিল করে অবিলম্বে কমিশন গঠনের দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাতটি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কলেজগুলো হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এর আগে গত ২১ ও ২৩ অক্টোবর এবং মঙ্গলবার সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে বিক্ষোভ করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে স্থবির ঢাকা
- আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৪ ১১:৫৩:১৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩১-১০-২০২৪ ১২:০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ