রাজধানীতে মেট্রোরেলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গতকাল বুধবার বিপাকে পড়েন হাজারো যাত্রী। বিশেষ করে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বিকল্প যানবাহনের অভাবে সড়কে দাঁড়িয়ে হতাশায় ভুগেছেন। মেট্রোরেলের এমন যান্ত্রিক ত্রুটি নগরবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন মেট্রোরেলে চড়ে যাতায়াত করা যাত্রীরা এদিন চরম দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে অসুস্থ, নারী ও শিশুদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। কারিগরি ত্রুটির কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধের এই পরিস্থিতি রাজধানীর জনজীবনে এক নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
মিরপুর থেকে শাহবাগে হাসপাতালের দিকে রওনা দেওয়া সায়রা আক্তার নামের এক নারী এই ভোগান্তির অন্যতম শিকার হন। তার পায়ে ব্যথা ছিল, তাই তিনি চিকিৎসার জন্য যাচ্ছিলেন। কিন্তু ট্রেনের হঠাৎ থেমে যাওয়ায় আগারগাঁও স্টেশনে অসুস্থ শরীরেই নামতে বাধ্য হন। এরপর বাস বা সিএনজি চালিত অটোরিকশা ধরতে না পেরে শেষমেশ ফুটপাতেই বসে পড়েন। জ্যামের কারণে সিএনজিও পাচ্ছি না। আর দুই-একটা যা পাই, তাও ভাড়া চায় ৪০০ টাকার বেশি, ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন সায়রা আক্তার। এমন পরিস্থিতি শুধু তার একার নয়; একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন অনেক যাত্রী।
একই স্টেশনে বাবার কোলে চড়া তিন বছরের ফাবিহাকেও কাঁদতে দেখা যায়। তার বাবা সেলিম খান বলেন, তাদের গন্তব্য ফার্মগেট। কিন্তু পথে বাস কম থাকায় প্রচণ্ড গরমে মেয়েকে নিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন। সেলিম খান জানান, এই গরমে ছোট বাচ্চাটারে নিয়া পড়ছি ঝামেলায়। আশেপাশে কিছুই নাই যে বসমু। এক ঘণ্টা ধইরা এক জায়গায় দাঁড়াইয়া আছি। এইভাবে জানি না কতক্ষণ থাকমু। একটা গাড়ি পাই না, বাচ্চাটা আমার কানতাছে।
এই অবস্থায় যারা প্রতিদিন মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন, তারা এদিন পড়েন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে। রাস্তায় যানজট ছিলই, তার ওপর আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেল থেকে একসঙ্গে এত যাত্রী নেমে আসায় পরিবহন সংকট দেখা দেয়। ফলে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা পেতে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাজধানীর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল রুটে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকলেও উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও অংশে ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল।
মেট্রোরেলের এই যান্ত্রিক ত্রুটি নগরবাসীর জীবনযাত্রায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। অফিসে যাওয়ার জন্য অপেক্ষারত ফজলে রাব্বি জানান, তার অফিসে ঢোকার সময় পেরিয়ে গেছে। রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট থাকায় কোনো গাড়ি নড়ছে না। তিনি বলেন, আমি যাব মতিঝিল। কিন্তু বাস, সিএনজি, বাইক কিছুই তো পাচ্ছি না। একটি বাসে ওঠার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ১০ জন মানুষের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেও উঠতে পারিনি। তার মতো আরো অনেকেই এদিন একই সমস্যায় পড়েন।
ফার্মগেট স্টেশনে ট্রেনের নিচে থাকা ভায়াডাক্টের তিনটি লেনের একটি স্প্রিং ডিসপ্লেস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের এমডি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা মেট্রোরেল চালানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
মেট্রোরেল অবকাঠামোর ‘বিয়ারিং প্যাড ডিসপ্লেসমেন্ট’ সমস্যার কারণেই মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রাখা হয় বলে জানান প্রকল্পের এক প্রকৌশলী। তিনি বলেন, মেট্রোরেল অবকাঠামোর একটি বিয়ারিং প্যাডের ডিসপ্লেসমেন্ট হয়েছে। এটি ভায়াডাক্টের নিচে ও পিলারের ওপরে থাকে। এ কারণে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। মেরামত শেষে এ অংশে আবার মেট্রোরেল চালু হবে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিএমটিসিএলের কর্মীরা সরে যাওয়া বিয়ারিং প্যাডটি মেরামতের কাজ শুরু করেন। দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত এই কাজ চলছিল।
আগারগাঁও মোড়ে সেসময় গণপরিবহন একেবারেই কম ছিল। এ অবস্থায় শত শত যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে বিকল্প পরিবহনের খোঁজে ছুটতে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশই হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। অনেককেই দেখা গেল পিকআপ, অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে উঠে পড়তে। যারা তা পারছিলেন না, তারা পায়ে হেঁটেই রওনা হন। তবে নারী, প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য এ দুর্ভোগ ছিল বিশেষভাবে কষ্টকর। তাদের আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জানায়, অনিবার্য কারণবশত আজ (বুধবার) সকাল ৯টা ৪০ মিনিট হতে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। তবে উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও অংশে ট্রেন চলাচল অব্যাহত আছে। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলে জানানো হবে। দুপুর ১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ছিল।
এ অবস্থায় নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রতিদিন যারা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে মেট্রোরেলের ওপর নির্ভর করেন, তাদের এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে আরো সচেতন হওয়ার তাগিদ দেন অনেকেই।
যাত্রীদের মতে, মেট্রোরেল চালুর পর থেকে যাত্রীসংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মেট্রোরেলের কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব। ফলে নগরবাসীর যাতায়াত দুর্ভোগও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

আবারও মেট্রোরেল চলাচলে বিপর্যয়
- আপলোড সময় : ১৮-০৯-২০২৪ ০৯:৪৫:০৬ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৮-০৯-২০২৪ ১০:০২:৫৬ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ