অব্যাহতি দেয়া সেই বিচারক এখন দুদকের মহাপরিচালক
১৯৯৯ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপতরের মন্ত্রী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি জমি নিজ দলের এমপির প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেন তিনি। বিনিময়ে ৫৫ লাখ টাকা উৎকোচ নেন। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২০০৮ সালে মোশাররফকে প্রধান আসামি করে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০১৮ সালে মামলার বিচার শুরুর অভিযোগ গঠনের সময় তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন আদালত।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ে দলীয় প্রভাবে বিচার শুরুর আগেই তাকে অব্যাহতি দেন আদালত। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রভাবের কারণে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে অব্যাহতি দেয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেনি দুদক। যে বিচারক মামলার দায় থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন, সেই বিচারক মীর রুহুল আমিন বর্তমানে দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন)।
১৯৯৯ সালে চট্টগ্রাম শহরের মাস্টারপ্ল্যানে থাকা আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার কার পার্কিংয়ের নির্ধারিত সরকারি জমি অনেকটা জোর খাটিয়ে তিন তারকা হোটেল করার জন্য আওয়ামী লীগের এমপি রফিকুল আনোয়ারের প্রতিষ্ঠানকে লিজ বরাদ্দ দেন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। দুর্নীতির বিষয়টি ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুদকের নজরে আসে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর নগরীর ডবলমুরিং থানায় মামলা দায়ের করেন দুদকের ওই সময়ের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। মামলায় ঘটনার সময়ের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ওই সময়ে জাতীয় সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ার এবং তার ভাই ফখরুল আনোয়ারকে আসামি করা হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ১৬১, ১০৯ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ করা হয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, আলোচিত ১ দশমিক ৪৪ বিঘা জমির বিভিন্ন করসহ সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৬৯ লাখ ২০ হাজার ৭৮৯ দশমিক ৩৮ টাকা। প্রথমে আবেদনকারী হোটেল গোল্ডেন ইন চট্টগ্রামের নামে আবেদন করে তিন তারকা হোটেল করার জন্য জায়গাটি বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে মেসার্স সানমার হোটেলস লিমিটেডের নামে বরাদ্দপত্র পরিবর্তন করে নেয়। দ্বিতীয়পক্ষ সানমার প্রপার্টিজের ওই সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুক হক শাহীন ও তার স্ত্রীর নামে জায়গাটির লিজ মালিকানা প্রতিষ্ঠানের নামে হস্তান্তর করা হয়। এজন্য মাসুক হক জমির মূল্যসহ ৪ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩৭ দশমিক ৩৮ টাকা রফিকুল আনোয়ারসহ তিন ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের নামে পরিশোধ করেন। কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই ২ কোটি ৯২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৪৮ টাকা ভাগাভাগি করার প্রমাণ পায় দুদক। পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তে ওই টাকার মধ্যে ৫৫ লাখ টাকা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নেন বলে দুদক প্রমাণ পায়। কমিশনের অনুমোদন নিয়ে ২০০৮ সালের ৩০ জুলাই তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, জমির মূল্য বাদে ২ কোটি ৯২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৪৮ টাকা সানমার হোটেলস লিমিটেডের প্রথম পর্যায়ের মালিকপক্ষ রফিকুল আনোয়ারের নামে এএজেড গ্রিনলেজ এবং স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের ৯টি চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন দ্বিতীয় পর্যায়ের মালিক মাসুক হক।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, বর্ণিত প্লটটি সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের নামে (ফখরুল আনোয়ার ভ্রাতা গং) বরাদ্দ করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ ৫৫ লাখ টাকা নেন। ফখরুল আনোয়ারের এনসিসি ব্যাংক মাঝিরঘাট, চট্টগ্রাম শাখার ব্যাংক হিসাব থেকে অ্যাকাউন্ট-পে চেকের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের স্ত্রীর নামে ৫০ লাখ টাকা দেন এবং ৫ লাখ টাকা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে এমপি রফিকুল আনোয়ার নগদে দেন। তবে মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার পর মারা যান রফিকুল আনোয়ার। মামলার আগে মারা যান রফিকুল আনোয়ারের ভাই ফরিদুল আনোয়ার।
এদিকে ওই মামলায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ মামলাটি বাতিলের আবেদন করলে ২০০৮ সালে হাইকোটের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানিতে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের বেঞ্চ মামলাটি বাতিল করে দেন। পরে হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করে দুদক।
২০১৬ সালের ২৮ মে সেই লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে দেন। আসামিদের সংশ্লিষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। ২০১৬ সালের ৮ মে আপিল বিভাগের আদেশে বিচারের জন্য মামলাটি নিম্ন আদালতে আসে। পরে ২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন মামলার ১ নম্বর আসামি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের হওয়া দুদকের ওই মামলায় মামলার ১ নম্বর আসামি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত। ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি ওই শুনানির সময়ে আদালতের বিচারক ছিলেন মীর রুহুল আমিন। মীর রুহুল আমিন বর্তমানে দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ ছিল, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন আইন মন্ত্রণালয়ের প্রভাবে বিচারক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। এরপর দুদক ওই অব্যাহতি আদেশের বিরুদ্ধে বিগত সাড়ে ছয় বছরেও আপিল করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ছানোয়ার আহমেদ লাভলু কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে মামলার বিচার শুনানিতে উপস্থিত থাকা এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুদকের মামলার অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল ফখরুল আনোয়ারের ব্যাংক হিসাব থেকে ৫০ লাখ টাকা চেকের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তার স্ত্রীর নামে নিয়েছিলেন। আবার ওই সময়ের এমপি রফিকুল আনোয়ারের কাছ থেকে নগদে পাঁচ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন মোশাররফ। তাছাড়া নিজে মন্ত্রী থাকাকালীন প্রভাব খাটিয়ে কার পার্কিংয়ের প্লটটি সোনা রফিকের (রফিকুল আনোয়ার) প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেন তিনি। অথচ মন্ত্রী নাসিমের সময়ে আগের আবেদন নাকচ করে মন্ত্রণালয়।
আপিল না করার বিষয়ে জানতে চাইলে হাইকোর্টে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলেন, আমি কমিশনের নির্দেশনা অনুসারে হাইকোর্টে দুদকের মামলা পরিচালনা করি। কমিশন যখন যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়, সে অনুযায়ী কাজ করি। চট্টগ্রামের ওই মামলার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো নির্দেশনা কমিশন থেকে দেয়া হয়নি। তাছাড়া নথি না দেখে কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা এই মুহূর্তে সমীচীন হবে না।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, সানমার হোটেল লিমিটেডের গণপূর্তে প্লট নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে দুদকের মামলার ঘটনা আমরা জানি। ওই মামলায় কোন গ্রাউন্ডে আদালতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে অব্যাহতি দিয়েছেন সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। কিন্তু অভিযোগ আমলে নেয়ার মতো চার্জশিটে অপরাধের বর্ণনা থাকলে দুদক ওই আদেশের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে আপিল করতে পারেন।
এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) মীর রুহুল আমিন বলেন, আমি চট্টগ্রাম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক থাকাকালে দুদকের মামলায় মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে কোন গ্রাউন্ডে অব্যাহতি দিয়েছি সেটি আদেশের পর্যালোচনায় রয়েছে। তিনি বলেন, ওই আদেশের বিরুদ্ধে ওই সময়ে কেন দুদক আপিল করেনি সেটা আমি জানি না। কিন্তু আমি দুদকে পদায়িত হওয়ার সঙ্গে ওই আপিল না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কমিশন চাইলে ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি মামলাটিতে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত। এর আগে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ফখরুল আনোয়ার এবং রফিকুল আনোয়ারের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩০ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় দুদক। অভিযোগ গঠনের আগে ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল রফিকুল আনোয়ার মারা যান। ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনকালে ১ নম্বর আসামি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১এ ধারায় এবং মারা যাওয়ায় রফিকুল আনোয়ারকে আদালত অব্যাহতি দেন। পরে একমাত্র আসামি ফখরুল আনোয়ারের বিরুদ্ধে শুধু ৪০৯ ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন বিশেষ জজ আদালত। অভিযোগপত্রের ২৫ সাক্ষীর মধ্যে প্রসিকিউশন পক্ষ দুদক ১৫ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেন। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম দায়রা জজ এবং ভারপ্রাপ্ত বিশেষ জজ মো. ইসমাইল হোসেন মামলার রায়ে ফখরুল আনোয়ারকে খালাস দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, মামলার এজাহারকারী ১ নম্বর সাক্ষী বাদে বাকি সাক্ষীরা সবাই মামলা প্রমাণের জন্য আদালতে জোরালো সাক্ষ্য দেয়নি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক এবং গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিবেদন দেন। ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখের নোটশিটে সরকারের আর্থিক ক্ষতি না হওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে আসামিকে খালাস দেন।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, একমাত্র আসামি ফখরুল আনোয়ারকে রায়ে খালাস দেয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে দুদক। দুদকের আপিল গ্রহণ করে ২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট আসামি ফখরুল আনোয়ারকে ১৫ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এরপর ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। তবে হাইকোর্টের আপিলটি এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে জানা যায়নি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ছানোয়ার আহমেদ লাভলু বলেন, নথি না দেখে কোনো বক্তব্য দেয়া সম্ভব নয়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট আরেক আইনজীবী বলেন, ‘১৫ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হয়। সাক্ষী হিসেবে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেনদেনের চেক, ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ নথি মামলায় দুদক কর্মকর্তা জব্দ করেন বলে আদালতে তারা জানান। সাক্ষীরা বলেন, লেনদেনের চেক এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলো আসল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে আসামি সরকারি দলের প্রভাবশালী হওয়ায় সাক্ষীরা আদালতে যথাযথ সাক্ষ্য দিতে পারেননি। তাদের অনেকে মামলার বিষয়ে জানেন না জানিয়েছেন। কিন্তু ঘটনার দালিলিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

সরকারি জমি নিয়ে দুর্নীতি
মোশাররফকে অব্যাহতির ৬ বছরেও আপিল করেনি দুদক
- আপলোড সময় : ০৯-০৯-২০২৪ ১২:১২:২১ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৯-০৯-২০২৪ ১২:১২:২১ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ