ঠিকাদার জালিয়াতি করলে তাকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই থাকতে হবে। চাপ দিয়ে লাভ হবে না
ফাওজুল কবির খান, উপদেষ্টা
সড়ক, রেল ও সেতু বিভাগ
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরে ফিরতে তৎপর হয়ে আন্দোলনে নেমেছে কালো তালিকাভুক্ত ৪৭ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলসহ ১০ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী বরাবর। তিন কার্যদিবসের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়িত না হলে সড়ক ভবন ঘেরাও করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন ঠিকাদারেরা। সে হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার ঘেরাও কর্মসূচি পালন করার কথা। এ নিয়ে সওজ ভবনে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। তবে এ বিষয়ে সড়ক, রেল ও সেতু বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান গণমাধ্যমে বলেছেন, তিনি বিষয়টি অবগত আছেন। কোনো ঠিকাদার জালিয়াতি করে থাকলে তাকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই থাকতে হবে। চাপ দিয়ে কোনো লাভ হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে তারা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে একচেটিয়া ঠিকাদারি কাজ পেয়েছেন। তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণও মিলেছে। এরপর ৪৭টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর। এখন সরকার পরিবর্তনের পর এই জালিয়াতিতে যুক্ত ঠিকাদারেরা ফিরে আসার জন্য চাপ শুরু করেছেন।
গত রোববার তেজগাঁওয়ে সওজের প্রধান কার্যালয়ে এসব ঠিকাদার বিক্ষোভ করেন। এরপর প্রধান প্রকৌশলী বরাবর দেয়া এক স্মারকলিপিতে ১০ দফা দাবি পেশ করেন তারা। তিন কার্যদিবসের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়িত না হলে সড়ক ভবন ঘেরাও করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন ঠিকাদারেরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রধান প্রকৌশলী ঠিকাদারদের নিয়ে বৈঠক করার কথা থাকলেও বৈঠক হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বৈঠকের বিষয়ে দৈনিক জনতার পক্ষ থেকে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার হালিমুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। এ বিষয়ে কথা কলার সুযোগ আমার নেই।
সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ এক যুগ ধরে ই-টেন্ডারিং পদ্ধতির দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে এবং জাল সনদ জমা দিয়ে একচেটিয়া ঠিকাদারি করে আসছেন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা। গত বছরের ১৪ অক্টোবর ‘সড়কের শতকরা ৫১ কাজ পেয়েছেন ‘প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ’ শতকরা ৫ ঠিকাদার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সড়কে গুটিকয়েক ঠিকাদারের বেশির ভাগ কাজ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গত বছরের ৬ নভেম্বর উচ্চ আদালতে একজন আইনজীবী রিট আবেদন করেন।
আদালতের নির্দেশে গত ১৯ নভেম্বর সওজ তদন্ত কমিটি গঠন করে। সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম রেজাউল করিমকে প্রধান করে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গত জানুয়ারি মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। ফেব্রুয়ারি থেকে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়। এরপর ৪৭টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাল সনদ জমা দিয়ে কাজ পাওয়ার অভিযোগে তাদের কালোতালিকাভুক্ত করে সওজ। এরপর ঠিকাদারেরা আদালতে গিয়েও নিষেধাজ্ঞা তুলতে পারেননি। এখন সরকার পরিবর্তনের পর তারা আবার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগ শুরু করেছেন।
সওজ সূত্র জানিয়েছে, কালোতালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সড়কের ৯০ শতাংশের বেশি ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করত। যদিও সড়কে কাজ করা ঠিকাদারের মোট সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ১০০।
সূত্র আরও জানায়, সওজের তদন্তে পাঁচ ধরনের জালিয়াতি পাওয়া যায়। এগুলো হলো- জাল কর্মসম্পাদন সনদ জমা দেয়া। অর্থাৎ যে ঠিকাদারি কাজ তারা করেনি, সেগুলোও উল্লেখ করেছে। টাকার অঙ্কে কাজের পরিমাণ বেশি দেখানো। কাজ শেষ করেছে দেরিতে, কিন্তু দেখিয়েছে তারা যথাসময়ে কাজ করেছে। আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে একটি দরপত্রে একই সনদ বারবার জমা দেয়া এবং যৌথ উদ্যোগের ভুয়া তথ্য জমা দেয়া।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদফতর, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিয়েছে, যার মধ্যে জাল সনদ রয়েছে।
সওজের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, জালিয়াতির মাধ্যমে এক যুগ ধরে একচেটিয়া কাজ পাওয়া এসব ঠিকাদার নিজেদের বঞ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এমনকি যেসব কর্মকর্তা জালিয়াতি ধরে ব্যবস্থা নিয়েছেন, তাদের বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লোক হিসেবে চিহ্নিত করে চাপে রাখার কৌশল নিচ্ছেন। এসব ঠিকাদারের পেছনে সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পর্যায়ের বেশ কিছু কর্মকর্তাও রয়েছেন। মূলত এসব কর্মকর্তাই চিহ্নিত কিছু ঠিকাদারকে একচেটিয়া কাজ পেতে সহায়তা করেছেন। নিজেরাও সুবিধা নিয়েছেন।
সওজ সূত্র জানায়, প্রধান প্রকৌশলীর কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে নয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সই করেছেন। গত এক যুগে যে ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সওজে সবচেয়ে বেশি কাজ পেয়েছে, এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক স্মারকলিপিতে সই করেছেন। সেই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এনডিই, মাসুদ হাইটেক, রিলায়েবল বিল্ডার্স, এম এস সালেহ আহমেদ ও হাসান টেকনো। বাকি চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও গত এক যুগে সওজে বিপুল পরিমাণ ঠিকাদারি কাজ করেছে। এগুলো হলো সাগর ইনফো বিল্ডার্স, জে এন্টারপ্রাইজ, এম এ ইঞ্জিনিয়ারিং ও মো. খোরশেদুজ্জামান।
ঠিকাদারেরা যে ১০ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ দেয়া ও কোনো দলীয় ক্ষমতা বা দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ নিয়ে কোনো রকম বৈষম্য না করা, কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অপসারণ করতে হবে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার জন্য অযৌক্তিকভাবে অভিজ্ঞ ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে নেয়া বেআইনিভাবে অযোগ্য ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে, স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদের বাহক ওবায়দুল কাদের ও তার স্ত্রীর দালাল কর্মকর্তাদের অপসারণ করতে হবে। এ ছাড়া এক বছর ধরে শুদ্ধি অভিযানের নামে যে ‘অশুদ্ধি’ অভিযান চালিয়েছে, তা বাতিল করতে হবে, জিওবি ফান্ড টেন্ডার ‘এ’ প্রাইজ অ্যাডজাস্টমেন্ট পদ্ধতি চালু করতে হবে, গত এক বছরে ৪৭ জন প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারকে বেআইনিভাবে অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে, বর্তমানে আহ্বান করা চলমান দরপত্র জরুরি ভিত্তিতে স্থগিত করতে হবে।
সওজের সূত্র বলছে, সওজের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দায়িত্ব নিয়েই জালিয়াতি করে কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। আর প্রকিউরমেন্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদসহ কিছু কর্মকর্তা প্রধান প্রকৌশলীকে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছেন। এখন জালিয়াতি করা ঠিকাদারেরা তাদেরই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

সড়ক ও জনপথ : প্রতিষ্ঠানগুলো সড়কের ৯০ শতাংশের বেশি ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণে
আন্দোলনে কালো তালিকাভুক্ত ৪৭ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
- আপলোড সময় : ২২-০৮-২০২৪ ০২:০৪:৪৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৮-২০২৪ ০২:০৪:৪৭ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ