আদালত থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছে মানব পাচার মামলার অধিকাংশ আসামি। দেশের আদালতে ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত মাত্র ৫২৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর ৩১টিতে আসামিদের সাজা হয়েছে। আর খালাস পেয়েছে ৪৯৭টি মামলার আসামি। সাজার হার মাত্র ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৪ শতাংশ মামলার আসামিরাই খালাস পেয়েছে। মূলত মানব পাচারের মামলায় নিষ্পত্তি ও সাজার হার খুবই কম। বিগত ৫ বছরে একটি মামলায়ও কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়নি। ২০১৯ সালে ১৭ মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হলেও পরের ৪ বছরে আর কোনো মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয়নি। যদিও অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মানব পাচার আইনের মামলার বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তির নির্দেশনা রয়েছে। তবে বছরের পর ঝুলতে থাকায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ভুক্তভোগীরা এক সময়ে আসামিদের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হন। মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ কমিয়ে আনতে চাইলে দ্রুত বিচার শেষ করে অপরাধীদের সাজা প্রদান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মানব পাচারের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভিন্ন অবস্থা দেখা যায়। ওসব মামলার তদন্ত কার্যক্রম, মামলা পরিচালনা, আদালতে সাক্ষীর উপস্থিতি, সাক্ষীদের ভয়-ভীতি দেখানো, মামলা প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগ ও প্রভাব বিস্তার করাসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এ সংঘবদ্ধ মানব পাচারের অপরাধে সর্বোচ্চ সাজার বিধান আছে। এই আইনের ৭ নম্বর ধারায় বলা আছে, সংঘবদ্ধ মানব পাচারের অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা অনূন্য ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫ বছর অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। মানব পাচারের মামলার বিচারের জন্য ২০২০ সালের মার্চে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশালে সাতটি মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
সূত্র জানায়, বিগত ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ৫ বছরে ট্রাইব্যুনালসহ দেশের আদালতগুলোতে মানব পাচারসংক্রান্ত তিন হাজার ৭০৪টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৮৮০টি। তদন্তাধীন রয়েছে ৮২৮টি মামলা। ওসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৩৪ হাজার ৫০৯ জন। সেখানে ৫ বছরে ১৫ হাজার ৩৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি ও সাজার তথ্যে বছরভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়- ২০২৩ সালে সব থেকে বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ওই বছর ৪৩৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ওই বছর ২১ মামলায় আসামিরা সাজা পায় আর ৪১৫টি মামলার আসামিরা খালাস পায়। তবে ওই বছর একটি মামলাতেও কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা হয়নি। ২০২২ সালে ৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়, সেখানে সব মামলার আসামিরা খালাস পান। আবার ২০২১ সালে মামলা নিষ্পত্তি হয় মাত্র দুটি। সে বছরও সব আসামি খালাস পায়। ২০২০ সালে ১৪টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। ওই বছর মাত্র একটি মামলায় আসামিদের সাজা হয় আর বাকি ১৩টি মামলার আসামিরা খালাস পায়। ২০২৩ সালের আগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২০১৯ সালে। ওই বছর ৩৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়, যেখানে ৯টি মামলায় আসামিরা সাজা পায় ও ৩০টি মামলার আসামিরা খালাস পায়।
সূত্র আরো জানায়, ঢাকায় মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ২৫৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪৫টি মামলার আসামিদের সাজা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে এবং ৯৬ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। ট্রাইব্যুনালে ২০২৩ সালের ২২৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে ১৪টি মামলায় সাজা হয়েছে। ২০২২ সালে ৫৭৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে সাজা হয়েছে ১৪টি মামলায়। ২০২১ সালে ৪১৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়, যেখানে সাজা হয়েছে ১৭টি মামলায়। এ ছাড়া ২০২০ সালের ১২ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে সব আসামি খালাস পেয়েছে।
এদিকে আইনজীবীদের মতে, বিদেশে যাওয়া থেকে মানব পাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত অন্তত ৬টি ধাপে অপরাধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে মানব পাচারের শিকার হন, কার মাধ্যমে চক্রের সঙ্গে পরিচয়, ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি; জোরপূর্বক অপহরণ কিংবা কোনো অসহায়ত্বকে পুঁজি করে পাচার করা হয়েছে কিনা এবং কোন পথে পাচার করেছে-সেসব তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা ও দূতাবাসের সঙ্গে পুলিশকে যোগাযোগ করে তদন্ত এগিয়ে নিতে হয়, যা করতে বেশ সময় লাগে। সব প্রক্রিয়ায় যদি শক্ত প্রমাণ না আসে এবং প্রমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকে, তখনই আসামিরা সহজে খালাস পেয়ে যায়। অনেক মামলার বাদীই হয়ে থাকেন অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানো শ্রমিক বা কর্মী। সেক্ষেত্রে মামলাটি দণ্ডবিধির প্রতারণা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ এর অষ্টম অধ্যায়ে বর্ণিত অপরাধগুলোর আলোকে হওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশের অতি উৎসাহী ভূমিকা এবং অনেক সময় আইনজীবীদের ভুলের কারণে মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইনে মামলা করার ফলে মানব পাচার আইনের অপরাধের উপাদান অনুপস্থিত থাকে। এটিও খালাস পাওয়ার অন্যতম কারণ। আর মানব পাচারের মামলার ভুক্তভোগীরা খুবই অসহায় আর আসামিরা অনেক প্রভাবশালী হয়ে থাকে। এ কারণে মামলা থেকে বিচার চলা পর্যন্ত নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়ে একসময় বাদী আপোশ করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া বিচারকদের ওপর মামলার চাপ অনেক। পাশাপাশি চার্জশিট থেকে শুনানি পর্যন্ত যথাযথ নথিপত্র না থাকা এবং সরকারি আইনজীবীদের আন্তরিকতারও অভাব রয়েছে। তাছাড়া মানব পাচার মামলার সাক্ষী ঠিকমতো আদালতে আসেন না। আবার মামলা তোলার জন্যও আসামিরা চাপ দিতে থাকেন। যথাসময়ে মামলা করা ও ঠিকমতো তদারকির মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে মামলা নিষ্পত্তি ও আসামিদের শাস্তির হার বাড়বে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মাদ আলী জানান, অনেক মামলা চার্জশিটের পর বিচার শুরুর আগেই পাচার চক্র তথা এজেন্টরা আপস-মীমাংসা করে ফেলে। আর সিআইডি নিয়মিত পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করলে তারা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আপোশ করে সেই নথি আদালতে দাখিল করে মামলা তুলে নেয়।
এ বিষয়ে ঢাকার মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর কেএম সাজ্জাদুল হক শিহাব জানান, আদালত কখনো সাজা দেন আবার কখনো আর্থিক দণ্ডও দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া সাক্ষী ঠিকমতো হাজির না হওয়া এবং আপোশ করার কারণে আসামিরা খালাস পেয়ে গেলে সেটিকে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতা বলা যাবে না। মামলা করা থেকে শেষ পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করলে আরো বাড়বে নিষ্পত্তি ও সাজার পরিমাণ।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
