যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা কমলেও দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে ১৮ জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এখনও বিপদসীমার ওপরে নদ-নদীর পানি। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, হাট-বাজার, ফসলি জমি। বন্ধ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এদিকে সিলেটে বন্যার মধ্যেই শুরু হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। অন্যান্য স্থানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আভাস মিললেও উত্তরাঞ্চলে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার এমন পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বন্যার কারণে সিলেটে স্থগিত হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৩০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮২ হাজার ৭৯৫ জন পরীক্ষার্থী। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এখনও জেলার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বন্যা কবলিত। টাঙ্গাইলে পানিবন্দি গোপালপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী, সদর ও নাগরপুর উপজলার ৪৬ হাজার মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, হাট-বাজার, ফসলি জমি।
টাঙ্গাইল পানি উনয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘন্টায় যমুনা ও ঝিনাই নদীর পানি সামান্য কমলেও অন্য সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও জেলার অভ্যন্তরীন ফুলজোড়, ইছামতি, করতোয়া নদীসহ চলবিলের নদ-নদীর পানি বাড়ছে।এতে ৫ উপজেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি। নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। কুড়িগ্রামে চরম দুর্ভোগে লক্ষাধিক বানভাসী মানুষ। ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমারের পানি এখনও বিপৎসীমার উপরে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, উজানের পানি ও বৃষ্টি কমে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে এখনও পাঠদান বন্ধ রয়েছে ৩৪১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। জামালপুরে কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। তবে কমেনি দুর্গতদের দুর্ভোগ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ৮ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বানের পানিতে প্লাবিত হয়ে বন্ধ রয়েছে ৪৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানির সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে পদ্মা নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল আছে। আগামী তিনদিন উভয় নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল সার্বিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী দুই দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে আগামী তিনদিনে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যার পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে আগামী একদিনে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে, ফলে ধরলা ও দুধকুমারের পানির সমতল কিছু পয়েন্টে বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে। আগামী তিনদিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানির সমতল সময় বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আত্রাই নদীর পানি সমতল বাঘাবাড়ী পয়েন্টে হ্রাস পেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিও উন্নতি হতে পারে। একই সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
অপরদিকে গাইবান্ধার সব নদ-নদীতেই কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। ফলে বন্যা কবলিত নিম্নাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা ফিরছে বাড়িতে। তবে নিম্নাঞ্চলের বাড়ি-ঘর থেকে পানি নেমে যেতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড। অন্যদিকে পানি কমলেও বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ এখনো রয়েছে। গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গেল চারদিনের ব্যবধানে জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৭৬ সেন্টিমিটার কমে রোববার দুপুর ১২টায় ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে ঘাঘট নদীর পানি ৪০ সেন্টিমিটার কমে জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার নদী দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালি পয়েন্টে বিপদসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে এবং তিস্তা নদীর বিপৎসীমার ৪১ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে গেল ৫ জুন পর্যন্ত জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সর্বোচ্চ ৮৯ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি সর্বোচ্চ ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের নিম্নাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকা বন্যা কবলিত হয়। চলমান বন্যায় জেলার চার উপজেলার ২৯ ইউনিয়নের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তলিয়ে যায় সাড়ে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমির পাট, আউশ ধান, শাকসবজি ও আমন বীজতলা। সরেজমিনে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী তীরবর্তী এলাকার রাস্তা-ঘাট থেকে পানি নেমে গেছে। পানি ওঠা বেশিরভাগ বাড়ি-ঘর ও উঠান থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। তবে পানি নেমে গেলেও অনেক আঙ্গিনায় কাঁদা দেখা গেছে। ফলে তারা এখন চলাফেরায় ভোগান্তিতে রয়েছেন। তবে একেবারেই নিম্নাঞ্চলের বাড়ি-ঘরগুলোতে পানি রয়েছে। পানি কমলেও তাদের ভোগান্তি কমেনি। বন্যার পানি কমলেও হতাশা আর দুশ্চিন্তায় পড়েছে বন্যাকবলিত এলাকার পরিবারগুলো। চরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক যাদের জীবন-জীবিকা চরম বেকায়দায় পড়েছেন তারা। পানি নেমে গেলেও বন্যার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন দিনমজুর এই পরিবারগুলো। বন্যাকবলিত এসব মানুষের জন্য বরাদ্দ হওয়া ত্রাণও জোটেনি বলে অভিযোগ ছিল এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষের।
গোঘাট এলাকার ভুট্টু মিয়া বলেন, আমার বাড়িতে পাঁচ দিন ধরে বন্যার পানি ছিল। গত দুই-তিন দিন ধরে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পানি কমলো আমাদের দুর্ভোগ কিন্তু কমেনি। তিনি আরও বলেন, বন্যা এসে কর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। আয় নাই অনেক কষ্ট করে দিন যাচ্ছে। পাঁচদিন পানিতে ডুবে থাকলাম কোনো মেম্বার-চেয়ারম্যান খোঁজ নেয়নি। একই এলাকার সাহেরা বেগম বলেন, বেশিরভাগ বাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও আমার বাড়ি থেকে এখনো পানি নেমে যায়নি। পানিতে থাকতে থাকতে পায়ে ঘা ধরেছে। আমরা গরিব মানুষ কোনো ত্রাণ পায়নি।
কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, চারদিন থেকে পানি কমে বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে এখনো চরাঞ্চলের বেশ কিছু বাড়ি ঘরে পানি রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৬৫ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৯ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা বিতরণ করা হয়েছে। এনজিওরাও সহযোগিতা করেছে। গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক বলেন, চলমান বন্যায় সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। গত চারদিন থেকে পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আশা করা যায় আগামী সপ্তাহেই বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

১৮ জেলায় অপরিবর্তিত
উত্তরাঞ্চলে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা
- আপলোড সময় : ১০-০৭-২০২৪ ১২:৪৯:৩২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১০-০৭-২০২৪ ১২:৪৯:৩২ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ