বড় শিল্পগ্রুপের ঋণকেন্দ্রীকরণ-ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার গভীর সংকেত
- আপলোড সময় : ১২-১২-২০২৫ ০৮:৩৬:১২ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১২-১২-২০২৫ ০৮:৩৬:১২ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পগ্রুপের প্রতি ঋণকেন্দ্রীকরণ গত কয়েক বছর ধরে এক গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শীর্ষ ৫০ শিল্প গ্রুপের কাছে শুধু ফান্ডেড ঋণই দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। নন-ফান্ডেড ঋণ যুক্ত করলে এ অঙ্ক আরও অনেক বড়। বড় ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি রয়েছে মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকা-যা মোট ফান্ডেড ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও কম। এ বৈষম্যই ব্যাংক খাতে ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৬২ দশমিক ৫৯ শতাংশ এখন বৃহৎ অঙ্কের ঋণ, এর বিপরীতে মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশই বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে আটকে আছে। সার্বিক চিত্র তুলে ধরে যে, ঋণ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ সীমিতসংখ্যক গ্রুপের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। একটি বড় গ্রুপ ব্যর্থ হলে বা ঋণ অনাদায়ী হলে একাধিক ব্যাংক একসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এটিই ‘সংক্রমণ ঝুঁকি’-যা একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একক গ্রুপকে ব্যাংকের মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে এই সীমা বহু ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হয়েছে। বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যাংকের বোর্ডে আধিপত্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার ফলে অনেক ব্যাংক নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন করেছে। একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক দেওয়া, কাগুজে জামানত তৈরি বা সম্পদের মূল্য অতিরিক্ত দেখানোর মতো অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল-যা বর্তমানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি এ সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই পরিস্থিতি কোনো দিন-দুইয়ের সৃষ্টি নয়, বরং দীর্ঘদিনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিথিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ফল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব দেখেও যে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি-এটাই আজকের ‘ঋণ পাহাড়’-এর মূল কারণগুলোর একটি। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে সৃষ্ট বড় ঋণগুলোর প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করা এবং জামানত যাচাই করে আদায় সক্ষমতা নির্ধারণ করা। এছাড়াও ভবিষ্যতে ঋণকেন্দ্রীকরণ রোধে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একক গ্রুপে ঋণের সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ, বোর্ডের ওপর অযাচিত প্রভাব প্রতিরোধ, এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে। একই সঙ্গে বড় ঋণগ্রহীতারা পলাতক বা কারাগারে থাকায় ঋণ আদায়ের প্রচলিত পথ অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, প্রকৃত সম্পদ তালিকা প্রকাশ এবং ভুয়া জামানতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা-এসবই এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকিং খাত সুস্থ না হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি-সবই বাধাগ্রস্ত হবে। ঋণকেন্দ্রীকরণের বর্তমান সংকট তাই শুধু ব্যাংকিং খাতের নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক জনতা ডেস্ক :