কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় ‘ফলস স্মাট’ পোকার আক্রমন আমন ধানের ফসলের মাঠে কৃষকের সর্বনাশ ঢেকে এনেছে। দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কৃষকদের কপালে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কায় ভুগছে কৃষি বিভাগও।
এবছর আমনের মৌসুমে ‘ফলস স্মাট’ নামের পোকার আক্রমণের প্রভাব দিশেহারা করে দিচ্ছে পুরো কৃষি বিভাগকে। চলতি মৌসুমে গত বছরের চেয়ে ধানী জমি সংখ্যা বাড়লেও এবার ফলনের লক্ষ্যমাত্রা কমে গেছে প্রায় দেড় হাজার মেট্রিকটন। যার প্রভাব পড়বে সামনের মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহেও। এদিকে ফলস স্মাটের সংক্রমনের ক্ষতি কমিয়ে আনতে অনেক জায়গায় পাকার আগেই ধান কেটে ফেলছেন কৃষকরা। কৃষিবিদরা বলছে, অপরিপক্ক ধানে চাউলের গুনগত মানও কমে যাবে। এই ধান থেকে বীজ সংগ্রও করা যাবে না।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত বছরের তুলনায় এবার ৪৬ হাজার ৮০৩ হেক্টর বেশি জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ বাড়লেও পোকার সংক্রমনের কারনে ফলনের লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ১ হাজার ৪০৭ মেট্রিক টন। এ বছর আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ লাখ ৪০ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। গেলো বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৭ মেট্রিক টন। ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, কুমিল্লায় আমন ধান কাটার মৌসুমে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ছত্রাকজনিত রোগ ‘ফলস স্মাট’ বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘লক্ষীর গু’। এ রোগে ধানের স্বাভাবিক শস্যদানা পরিণত হচ্ছে হলদেটে-জলপাই রঙের গুটিতে। ফলে পুরোপুরি পাকার আগেই কৃষকরা তড়িঘড়ি করে কাঁচাপাকা ধান ঘরে তুলে নিচ্ছে। সময়ের আগে ধান কেটে ফেলায় কমছে ফলন, বাড়ছে উৎপাদন ঝুঁকি।
কুমিল্লার জেলার লালমাই, সদর দক্ষিণ, বরুড়া ও সদরসহ জেলার আমন ফসলের জমিতে একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুম ভাল থাকা সত্ত্বেও রোগবালাই আর পোকার আক্রমণে ফলন ভালো হয়নি। প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাজরা পোকা, ফড়িং, পাতা, মোড়ানো পোকা এবং ফলস স্মাট দমনে সময়মতো কার্যকর পরামর্শও মেলেনি। এদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভুল পরামর্শে বেনামি কোম্পানির অকার্যকর ওষুধ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তারা। কৃষকদের দাবি, ফলস স্মাটের আগে ধানের শীষ যখন বের হচ্ছিলো তখন ছিল মাজরা পোকার আক্রমণ। এ পোকা ধানের গোড়া দিয়ে কাটা ফলে শুকিয়ে গেছে শীষ। এর মাসখানেক পরই পাকা ধানে আক্রমন হয় ফলস স্মাট পোকার। যে কারণে আবাদ বাড়লেও পোকামাকড় ও রোগবালাই আক্রমণে যে ক্ষতিতার এ ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ধান কাটা-মাড়াই শেষে স্পষ্ট হবে বলে মনে করেন কৃষকরা।
লালমাই কাচি এলাকার কৃষক এক জানান, সারা বছর পরিশ্রম করি এই ধানটা ঘরে তোলার জন্য। কিন্তু পাকার মুখে ফলস স্মাট দেখে বুকটা হুহু করে উঠে। কাঁচাপাকা ধান কাটছি লক্ষীর গু আতঙ্কে।
কারণ মাঠে ধান থাকলেই রোগের আক্রমণ বাড়ছে। তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করে ধান কেটে ফেলায় উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এ শঙ্কা ছাড়াও খরচের চাপ, ঋণের বোঝা সব মিলিয়ে এখন রাতেও ঘুম আসে না। বরুড়া উপজেলার ফসলের মাঠে দাঁড়ানো ধান দেখে কৃষকরা ভেবে ছিলো এবার একটু ভালে ফসল ঘরে তুলবে একটু ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু ফলস স্মাট পুরো স্বপ্নটাই নষ্ট করে দিলো। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে গিয়েও কোন প্রতিকার পাননি বলে কৃষকরা অভিযোগ করেন। তারা বলেন এত কষ্ট করে ফসল করেও যদি এভাবে রোগে নষ্ট হয়, তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে? লালমাইয়ের মোতালেব মিয়া নামে এক কৃষক বলা ন, ধান পেকে উঠলেই আনন্দ হওয়ার কথা, আর এখন সেটা ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটা গুচ্ছ ধরে দেখি, কতটা দানা কালো হয়ে গেছে। ব্রি ধান- ৪৯সহ কয়েকটি পুরনো জাতের ধানে ফলস স্মাট শনাক্তের কথা স্বীকার করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের মতে, মানসম্মত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ, বীজ শোধন ও জমির সঠিক পরিচর্যা করলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata